ঈদুল আজহা কোরবানি ও হজ

ঈদুল আজহা কোরবানি ও হজ

মক্কায় সমবেত হয়েছেন হজ্জ পালনকারীরা

ঈদুল ফিতরের মতো ঈদুল আজহাও একই আনন্দে আবর্তিত। বরং ঈদুল আজহার কর্মসূচি আরো ব্যাপক। ঈদুল আজহার সাথে জড়িত আছে কোরবানি ও হজ। এই তিনটি তিন আর্থিক অবস্থার মানুষের সাথে সম্পৃক্ত।
যাদের একেবারে আর্থিক সামর্থ্য নেই তারা দুই রাকায়াত ঈদের নামাজ পড়ে তাদের আনন্দে শরিক হবেন। যাদের কোরবানি করার সামর্থ্য আছে তারা অবশ্যই কোরবানি দেবেন। আর যাদের হজ পালনের সামর্থ্য অর্জিত হয় তারা হজব্রত পালন করবেন।
সাদামাটাভাবে আমরা ঈদুল আজহা এভাবেই পালন করতে পারি।
এই আনন্দ দিনের দ্বিতীয় পর্যায় হচ্ছে কোরবানি। কোরবানি কিভাবে দিতে হবে? আমরা কি শুধু পশুর গোশত খাওয়ার জন্য কোরবানি দেবো? আমরা কি পশু কোরবানি দিতে পেরেই আনন্দিত বা তৃপ্ত? কিন্তু আল্লাহ বলেছেনÑ আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না ওদের গোশত এবং রক্ত বরং আল্লাহর কাছে পৌঁছায় তাকওয়া। (সূরা হজ-৩৭)
আরবি কুরব শব্দ থেকে কোরবানি উদ্ভূত। এর অর্থ হচ্ছে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করা। আমরা কিভাবে তাঁর নৈকট্য অর্জন করব?
কোরবানি দেয়ার সামর্থ্যবান ব্যক্তিই কোরবানি দেবেন। এটা তার জন্য ওয়াজিব। এই ওয়াজিব পালন করতে গিয়ে কী কী নিয়ম পালন করবেন তিনি?
আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতে হলে অবশ্যই তাকওয়ার মাধ্যমে অগ্রসর হতে হবে। তাকওয়ার শর্তগুলো নিম্নরূপ হতে পারে
১. একদম নিবেদিতপ্রাণ হয়ে পশু কোরবানি দিতে হবে। এতে অর্থের বাহাদুরি চলবে না। লোকের বাহবা অর্জনের প্রচেষ্টা চলবে না। কিংবা লোকলজ্জায় পড়ে কোরবানি দেয়া চলবে না।
২. কোরবানির গোশত নিজের ইচ্ছেমতো রাখা যাবে না। আল্লাহর নির্দেশিত নিয়ম হচ্ছে কোরবানিদাতা কোরবানির গোশত সমান তিন ভাগ করবে। এক ভাগ নিজের পরিবার-পরিজনের জন্য রাখবে, এক ভাগ দরিদ্র আত্মীয়স্বজনের কাছে পৌঁছাতে হবে। বাকি এক ভাগ দরিদ্র যাদের আত্মীয়স্বজনও নেই তাদের মাঝে বণ্টন করতে হবে। এর ব্যত্যয় হলে  কোরবানি কবুল হবে না।
৩. কোরবানি অবশ্যই আল্লাহর নামে দিতে হবে। মানুষ এভাবেই তাকওয়ার পবিত্রতায় শামিল হতে পারবে।
যার কোরবানি দেয়ার সামর্থ্য নেই দুই রাকায়াত ঈদের নামাজ পবিত্র নিয়তে আদায় করতে পারলেই তার তাকওয়া অর্জিত হয়ে যাবে।
পরিবার-পরিজনের মন খারাপের ভয়ে কিংবা সমাজে হেয়প্রতিপন্ন হওয়ার ভয়ে কেউ যদি কোরবানি দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়Ñ তার প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্ট হন না। আল্লাহ তো তার জন্য ঈদের নামাজেই আনন্দ-সওয়াব নির্ধারিত করে দিয়েছেন। তবে কেন কোরবানির চিন্তা।’
তাই তার জন্য কঠোর নির্দেশ হচ্ছেÑ
১. কোরবানির সিদ্ধান্ত নিলে অবশ্যই তাকে কোরবানি দিতে হবে।
২. কোরবানির পশু হারিয়ে গেলে আবার পশু কিনে কোরবানি দিতে হবে।
৩. প্রথম পশু ফিরে পেলে একই সাথে উভয় পশু কোরবানি দিতে হবে। নইলে তার কোরবানি গৃহীত হবে না।
এ বিধান এ জন্য যে, যিনি কোরবানি দিচ্ছেন স্রেফ সামাজিকতার জন্য আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে নয়। এ জন্য সূরা হজের ৩৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহতায়ালা তাকওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট করে দিয়েছেন।
কোরবানি দেয়ার সামর্থ্য যত বার থাকবে তত বারই প্রতি ঈদে কোরবানি দিতে হবে। কোরবানি সম্পর্কে আল্লাহতায়ালা স্পষ্ট করে বলেছেন ‘আমি প্রত্যেক উম্মতের (নবীর উম্মত) জন্য কোরবানি ফরজ করেছি যাতে চতুষ্পদ জন্তু জবেহ করার সময় তারা আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে। (হজ-৩৪)
কোরবানি শুরু হয় মানব জাতির ঊষালগ্ন থেকে। আদম সন্তান হাবিল ও কাবিল সর্বপ্রথম কোরবানি দেয়। উভয় ভাইয়ের বিবাহ সম্পর্কিত বিরোধ নিরসনের লক্ষ্যে কোরবানির নির্দেশ হয়। যার কোরবানি কবুল হবে সে হবে বিজয়ী। এই নির্দেশ পালনার্থে উভয়ে কোরবানি দিলেন। কিন্তু কাবিলের কোরবানি কবুল হলো না। কবুল হলো হাবিলের কোরবানি। কারণ হাবিল ছিলেন ন্যায়ের পক্ষে।
আদিকালে কোরবানি কবুল হলে আকাশ থেকে অগ্নিশিখা এসে কবুলকৃত কোরবানি দগ্ধ করে ছাই করে দিত। ফলে তৎকালে কোরবানি কবুল হওয়া না হওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যেত। (মারেফুল কুরআন)
হজরত নূহ আ: পর্যন্ত এই নিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায়। (দারিয়াতুল মা’আরিফ) প্রাচীনকালে আরবে আতিয়া ও ফারা নামক এক বিশেষ ধরনের কোরবানির কথা জানা যায়।
কোরবানির নতুন প্রথা চালু হয় হজরত ইবরাহিম আ:-এর আমল থেকে। তার সময়কাল থেকে কোরবানির গোশত আর পুড়িয়ে ফেলা হয় না। দুস্থ লোকদের মধ্যে তা বিলিয়ে দেয়ার নিয়ম চালু হলো।
হজরত ইবরাহিম আ:-এর কোরবানি ছিল তাকওয়ার এক অগ্নিপরীক্ষা। তিনি প্রথমে স্বপ্নে আদিষ্ট হলেন কোরবানি দিতে। তিনি পশু কোরবানি দিলেন। আবারো একই আদেশ। তিনি আবারো পশু কোরবানি দিলেন। এরপর আদেশ এলো সবচেয়ে প্রিয় বস্তু কোরবানি দিতে। তিনি আল্লাহর আদেশ বুঝতে পেরে হজরত হাজেরা ও ইসমাইলকে স্বপ্নের কথা বললেন বললেন ইসমাইলই তো এখন আমার সবচেয়ে প্রিয়।
তারা উভয়ে সানন্দে রাজি হলেন। শয়তান উভয়কে কুবুদ্ধি দিয়ে ব্যর্থ হলো। ইবরাহিম আ:-এর কাছেও সে হেরে গেল। নবী ইবরাহিম পুত্রকে মিনায় নিয়ে গেলেন। কোরবানির উদ্দেশ্যে পুত্রকে সেখানে কাত করে শোয়ালেন। তখন ওহি নাজিল হলো 
হে ইবরাহিম তুমি তো স্বপ্নাদেশ সত্যি সত্যিই পালন করলে। এভাবে আমি নেককার বান্দাদের প্রতিদান দিয়ে থাকি। (সূরা সাফফাত-১০৫)
এই আয়াত নাজিল হওয়ার সাথে সাথে সেখানে একটি স্বর্গীয় দুম্বা হাজির করা হলো। আল্লাহর নির্দেশে হজরত ইবরাহিম আ: সেই দুম্বাটি কোরবানি দিলেন।
এই পবিত্র তাকওয়ার স্মৃতিকে চির জাগরূক রাখার লক্ষ্যে নবম হিজরি সালে কোরবানির ওহি নাজিল হয়। এই একই সময়ে হজের নির্দেশও নাজিল হয়।
ঈদুল আজহা, কোরবানি ও হজ একই সময়ে পালিত হয়। হজের অর্থ হচ্ছে দৃঢ় সঙ্কল্প করা। তবে এখানে শরিয়তি পরিভাষায় হজের অর্থ হচ্ছে পবিত্র কাবায় আল্লাহ ও রাসূলের নির্দেশিত অবস্থান ও অনুষ্ঠান পালন করা। হজের আরেকটি অর্থ হচ্ছে পবিত্র স্থান দর্শনের সঙ্কল্প করা। এই পবিত্র স্থানগুলো হচ্ছে কাবা শরিফ, মিনা, আরাফাত ও মুজদালিফা। এরই পাশাপাশি মদিনায় রাসূলুল্লাহ সা:-এর রওজা জিয়ারত।
হজ হচ্ছে ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের পঞ্চম স্তম্ভ। হজ পালন সামর্থ্যবানদের জন্য অবশ্য পালনীয়। হজ শুধু একবারই ফরজ। বাকিগুলো নফল। সামর্থ্যবান ব্যক্তিরা হজ পালন না করলে গুনাহগার হবেন। হজ সম্পর্কে আল্লাহতায়ালা বলেছেনÑ মানুষের মধ্যে যাদের সেখানে (কাবা শরিফ) যাওয়ার সামর্থ্য আছে আল্লাহর উদ্দেশে ওই গৃহের হজ করা তাদের অবশ্য কর্তব্য এবং কেউ তা প্রত্যাখ্যান (উপেক্ষা বা অবজ্ঞা) করলে তারা জেনে রাখুক আল্লাহ বিশ্বজগতের মুখাপেক্ষী নন। (সূরা ইমরান-৯৭)
হজ সম্পর্কে সূরা হজের ২৭-২৮ নং আয়াতে আল্লাহতায়ালা বলছেন মানুষের কাছে হজের ঘোষণা করে দাও, তারা তোমার কাছে আসবে পদব্রজে ও সর্বপ্রকার ক্ষীণকায় (দুর্বল উট হলেও) উটের পিঠে, এরা আসবে দূর-দূরান্তের পথ অতিক্রম করে যাতে তারা তাদের কল্যাণময় স্থানগুলোতে হাজির হতে পারে।’
এরপর একই সূরার ২৯ নম্বর আয়াতে নাজিল হয়েছে অতঃপর তারা যেন তাদের অপরিচ্ছন্নতা দূর করে এবং তাদের মানত পূর্ণ করে এবং তাওয়াফ করে প্রাচীন গৃহের।
এই আয়াতগুলোতেই বোঝা যাচ্ছে হজের গুরুত্ব কতটুকু।
এই হজ কিভাবে পালন করবেন? ৮ জিলহজ থেকে ১২ জিলহজ পর্যন্ত বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে হজ সমাপন করতে হয়।
সংক্ষিপ্তভাবে হজের করণীয় কাজ হচ্ছে (১) ৮ জিলহজ মিনায় অবস্থান। (২) ৯ জিলহজ আরাফাতে অবস্থান, তালবিয়া, জিকির, দোয়া, তাওবা, ইস্তেগফার, আরাফাতের খুৎবা শ্রবণ, জোহর ও আসরের নামাজ একত্রে আদায়। (৩) মাগরিবের সময় মুজদালিফায় গমন, মাগরিব ও এশার নামাজ একত্রে আদায়। (৪) ফজরের পর মুজদালিফা থেকে মিনায় গমন, দ্বিপ্রহরে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় জুমরায় সাতটি করে মোট ২১টি পাথর নিক্ষেপ অতঃপর তামাত্তু ও ইফরাদ হজযাত্রীদের কোরবানি আদায় ও সাতবার কাবাঘর তাওয়াফ, মাকামে ইবরাহিমে দুই রাকায়াত সালাত আদায়, সাফা ও মারওয়ায় সাতবার দৌড়ের পর ইফরাদ ও তামাত্তুর পদ্ধতিতে হাজিদের মাথামুন্ডন করে ইহরাম খোলা। (৫) ১১ ও ১২ তারিখ মিনায় অবস্থান ও আগের নিয়মে পাথর নিক্ষেপ করা। ১২ তারিখ আসর পর্যন্ত মিনায় অবস্থান করলে ১৩ তারিখ আবার তিনটি স্থানে ২১টি কঙ্কর (পাথর) নিক্ষেপ করতে হবে। (৬) অতঃপর দেশে ফিরে আসার আগে আবার সাতবার কাবা তাওয়াফ করা।
হজের এই সম্মিলন মুসলিম বিশ্বের এক মহামিলনের ভূমিকা পালন করে। এখানে এসে জাতি-গোত্র, সাদা-কালো সবাই একাকার হয়ে যায় এখানে কোনো ভেদাভেদ থাকে না। জামাতে মসজিদে নামাজ আদায়, জুমায় নামাজ আদায়, ঈদে নামাজ আদায়ের মিলন ধাপগুলো অতিক্রম করে এই মহামিলনে শরিক হয়ে মুসলিম  জাতি ঘোষণা দিতে পারে এই মহামিলনের। হ

ad