হলুদ সাংবাদিকতা বনাম শিক্ষক-সাংবাদিকতা: পেশার মর্যাদা রক্ষায় কোন পথ?
জাকিরুল ইসলাম
গণমাধ্যমকে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয়, যার মূল প্রাণশক্তি হলেন সাংবাদিকেরা। এই স্তম্ভের প্রধান দায়িত্ব হলো জনস্বার্থে বস্তুনিষ্ঠ তথ্য পরিবেশন, সমাজের অসঙ্গতি তুলে ধরা এবং ক্ষমতাকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বর্তমানে বাংলাদেশের সাংবাদিকতা জগতে এক গভীর সংকট দেখা দিয়েছে। একদিকে যেমন মূলধারার কর্মীদের জন্য ন্যায্য বেতনের অভাব, অন্যদিকে তেমনই মফস্বল পর্যায়ে অযোগ্য, ধান্দাবাজ ও তথাকথিত 'হলুদ' সাংবাদিকদের দৌরাত্ম্য পেশাটির বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এই পরিস্থিতিতে, সম্প্রতি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের সাংবাদিকতা ও ওকালতিতে যুক্ত হওয়ার ওপর যে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে, তা কেবল শিক্ষকদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ওপর আঘাত নয়, বরং সামগ্রিকভাবে সাংবাদিকতার জন্য এক অমঙ্গলের বার্তা।
সংকটের মূলে বেতন-বৈষম্য ও পেশার অবমূল্যায়ন:
সাংবাদিকতার বর্তমান দুর্দশার প্রধান কারণ হলো আর্থিক অনিশ্চয়তা। ওয়েজ বোর্ডের বিধান কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ, হাতেগোনা কিছু প্রতিষ্ঠান ছাড়া বেশিরভাগ মিডিয়া হাউজই কর্মীদের, বিশেষত মফস্বল সাংবাদিকদের, নামমাত্র বা কোনো বেতনই দেয় না। এই আর্থিক দুরবস্থা স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী তরুণদেরও অনৈতিক পথে যেতে বাধ্য করছে। অন্যদিকে, মফস্বলে এক শ্রেণির অশিক্ষিত, অযোগ্য ও চাঁদাবাজ প্রকৃতির মানুষ কেবল একটি প্রেস কার্ডের লোভে সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে, যা বৈধ আয়ের লাইসেন্স না হয়ে অবৈধ ধান্দাবাজির 'লাইসেন্স' হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এদের অপকর্মে প্রকৃত ও পেশাদার সাংবাদিকেরা প্রতিনিয়ত বিব্রত হচ্ছেন।
শিক্ষক সাংবাদিকতা কেন অপরিহার্য?
এই ভয়াবহ প্রেক্ষাপটে, উচ্চশিক্ষিত ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন শিক্ষকদের সাংবাদিকতায় অংশ নেওয়া সাংবাদিকতার মানদণ্ড রক্ষায় 'সেফটি ভালভ'-এর (Safety Valve) কাজ করছে।
১. বস্তুনিষ্ঠতা ও নৈতিকতার ভিত্তি: এমপিওভুক্ত শিক্ষকেরা আর্থিকভাবে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ। শিক্ষকতা তাঁদের মূল পেশা এবং আয়ের উৎস হওয়ায়, তাঁরা সাংবাদিকতাকে অবৈধ উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে দেখেন না। বরং তাঁরা শখের বশে, সমাজসেবার মানসিকতা নিয়ে এবং তাঁদের উন্নত ব্যক্তিত্ব ও নৈতিকতার মানদণ্ড বজায় রেখে সাংবাদিকতা করেন। এতে করে প্রকাশিত সংবাদে বস্তুনিষ্ঠতা ও নির্ভরযোগ্যতা বজায় থাকে।
২. মানসম্পন্ন তথ্য ও বিশ্লেষণ: শিক্ষকেরা সুশিক্ষিত হওয়ায় তাঁদের সমাজ, প্রশাসন ও আইনের প্রতি সঠিক ধারণা থাকে। তাঁরা সমাজের গভীরতর অসঙ্গতি, শিক্ষা ব্যবস্থার দুর্নীতি এবং অন্যান্য অনিয়মকে সঠিক বিশ্লেষণ ও উচ্চ মানসম্পন্ন যুক্তির মাধ্যমে জনসমক্ষে আনতে সক্ষম হন।
৩. হলুদ সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে ঢাল: শিক্ষকদের যুক্ততা মফস্বলের চাঁদাবাজ ও হলুদ সাংবাদিকদের দৌরাত্ম্য কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখে। যখন স্থানীয় পর্যায়ে একজন শিক্ষিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব সাংবাদিকতা করেন, তখন তা ব্ল্যাকমেইলিং সাংবাদিকতাকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেয় এবং সাংবাদিকতার জগতে একটি সুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি হয়।
৪. ব্যক্তি-মর্যাদা রক্ষা: ধান্দাবাজ সাংবাদিকরা প্রায়শই সরকারি কর্মকর্তা ও সম্মানিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মানহানিকর রিপোর্ট প্রকাশের হুমকি দিয়ে চাঁদাবাজি করে। শিক্ষকদের মতো ব্যক্তিত্বসম্পন্ন সাংবাদিকেরা এই ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীন ও ক্ষতিকর সাংবাদিকতা পরিহার করেন, যার ফলে সমাজের উচ্চ মর্যাদাশীল ব্যক্তিদের সম্মান ও ব্যক্তিত্ব সুরক্ষিত থাকে।
প্রজ্ঞাপনের সম্ভাব্য ক্ষতিকর প্রভাব (ভবিষ্যৎ সতর্কতা):
যদি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের সাংবাদিকতা থেকে সম্পূর্ণভাবে বিরত রাখা হয়, তবে তার ফল হবে সুদূরপ্রসারী এবং অত্যন্ত ভয়াবহ।
"এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের সাংবাদিকতা থেকে সরিয়ে দিলে এই ক্ষেত্রটি সম্পূর্ণভাবে অশিক্ষিত, চাঁদাবাজ ও ধান্দাবাজদের পকেটে চলে যাবে। তখন সাংবাদিকতা পরিণত হবে লাইসেন্সকৃত অপরাধের হাতিয়ারে।"
ফলে, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি আরও মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে, অসংখ্য নিরপরাধ মানুষ ব্ল্যাকমেইলের শিকার হয়ে আর্থিকভাবে ও সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন এবং রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভের উপর জনগণের অবশিষ্ট বিশ্বাসটুকুও চিরতরে হারিয়ে যাবে।
সুপারিশ:
দেশের সার্বিক কল্যাণ এবং সাংবাদিকতার জগতের বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষার্থে, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের সাংবাদিকতা করার সুযোগ অবশ্যই উন্মুক্ত রাখা যৌক্তিক ও অপরিহার্য। সরকারের উচিত নতুন নীতিমালার এই অংশটি অবিলম্বে পুনর্বিবেচনা করা। বরং, সরকার এবং মিডিয়া হাউজগুলোর মূল মনোযোগ দেওয়া উচিত—
১. ওয়েজ বোর্ড বাস্তবায়নে কঠোর হওয়া: সাংবাদিকদের জন্য ন্যায্য বেতন-ভাতার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
২. শিক্ষাগত যোগ্যতা ও নৈতিক মানদণ্ড নির্ধারণ: সাংবাদিকতার পেশায় যুক্ত হওয়ার জন্য সুস্পষ্ট ও উচ্চ শিক্ষাগত এবং নৈতিক মানদণ্ড বাধ্যতামূলক করা।
৩. শিক্ষকদের কর্মঘণ্টা পরিবীক্ষণ: শিক্ষকেরা যেন নিজ পেশার নির্ধারিত সময়ে কোনো প্রকার ফাঁকি না দেন, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নিশ্চিত করতে হবে।
শিক্ষিত শিক্ষকেরা যখন তাঁদের নির্ধারিত পেশাগত দায়িত্ব পালনের পরে অতিরিক্ত সময়ে সাংবাদিকতা করেন, তখন এটি পেশার মর্যাদা বাড়ায়। সৎ, শিক্ষিত এবং ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষের অংশগ্রহণ ছাড়া রাষ্ট্রের এই গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভটি ধসে পড়বে, যার চূড়ান্ত ক্ষতি হবে দেশ ও জনগণের। তাই, শিক্ষক সাংবাদিকতা বন্ধ না করে, এর মানোন্নয়নে প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করাই হবে দূরদর্শী পদক্ষেপ।
লেখক: শিক্ষক, কুষ্টিয়া জিলা স্কুল।