নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি ও পুরোনো ধান্দা: প্রাথমিক শিক্ষা কি আমলাদের পরীক্ষাগার?
জাকিরুল ইসলাম
প্রাথমিক শিক্ষা aকোনো পরীক্ষাগার নয়। এখানে ভুলের সুযোগ নেই, কারণ ভুলের খেসারত দেয় শিশুরা। তবু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষাই বারবার নীতি-নির্ধারকদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার সবচেয়ে নিরাপদ ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতির নামে সেই পুরোনো ধান্দাই আবার মাথা তুলছে।
শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তি প্রাথমিক স্তর। এই ভিত্তি দুর্বল হলে ওপরের সব স্তরই টলমল করে। অথচ এই সবচেয়ে সংবেদনশীল স্তরেই দেখা যায় সবচেয়ে বেশি হঠকারী সিদ্ধান্ত, সবচেয়ে বেশি প্রকল্প আর সবচেয়ে কম বাস্তববোধ। প্রশ্ন জাগে, প্রাথমিক শিক্ষা কি শিশুদের শেখার জায়গা, নাকি আমলাদের প্রকল্প পরীক্ষার মাঠ?
নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতির প্রস্তাবটি সেই সন্দেহ আরও ঘনীভূত করেছে। মাত্র এক বছরের জন্য একটি বড় পরিবর্তন। এরপর আবার নতুন কারিকুলাম। বাস্তবতায় এর মানে কী? শিক্ষকদের নতুন করে প্রশিক্ষণ, শ্রেণিকক্ষে বিশৃঙ্খলা, অভিভাবকদের দুশ্চিন্তা আর শিক্ষার্থীদের বিভ্রান্তি। লাভ কোথায়? শিক্ষার উন্নয়নে নয়, বরং প্রকল্পের কাগজে।
এ দেশে শিক্ষা সংস্কার বলতে অনেকের চোখে প্রথমেই ভেসে ওঠে বিদেশ সফর। উন্নত দেশের শ্রেণিকক্ষ, চকচকে অবকাঠামো, কম শিক্ষার্থী, বেশি সুযোগ-সুবিধা। সেখান থেকে ফিরে এসে সেই মডেল হুবহু বসিয়ে দেওয়ার চেষ্টা। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতা ভিন্ন। এখানে শিক্ষক সংকট, নিম্নমানের কম বেতনের শিক্ষক, অবকাঠামোর সংকট, অতিরিক্ত শ্রেণি, সীমিত উপকরণ আর অভিভাবকদের আর্থিক চাপ। এই বাস্তবতা উপেক্ষা করে আনা যেকোনো মূল্যায়ন পদ্ধতি শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের জন্য ক্ষতিকরই হয়।
এর আগে নতুন কারিকুলামের নামে প্রাথমিক থেকে কার্যত পরীক্ষা তুলে দেওয়া হয়েছিল। বলা হয়েছিল, এতে শিক্ষার্থীরা আনন্দ পাবে। বাস্তবে হয়েছে উল্টো। পড়াশোনার শৃঙ্খলা ভেঙেছে, অভিভাবকের খরচ বেড়েছে, শিক্ষকরা দিশেহারা হয়েছেন। জনসমালোচনার মুখে এবং ওই সরকার পতনের পর সেই পথ থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ। মানুষ ভেবেছিল, শিক্ষা নিয়ে অন্তত কিছু শিক্ষা নেওয়া হয়েছে।
কিন্তু নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতির উদ্যোগ দেখে মনে হয়, শিক্ষা নয়, প্রকল্পই আসল। এক বছরের জন্য নতুন নির্দেশিকা, নতুন প্রশিক্ষণ, নতুন বাজেট। কয়েক শ কোটি টাকার আয়োজন। অথচ জাতীয় নির্বাচন, রোজা মিলিয়ে এমনিতেই পাঠদান ব্যাহত হবে। ছয় মাস যেতে না যেতেই আবার সব বাতিল। তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়, এই তাড়াহুড়ার পেছনে আসল তাগিদ কী?
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ায় শিক্ষকরা কার্যত দর্শক। যারা প্রতিদিন শ্রেণিকক্ষে শিশুদের সঙ্গে কাজ করেন, তাদের মতামত নীতি নির্ধারণে গুরুত্ব পায় না। বরং যাদের পাঠদানের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক নেই, তারাই ঠিক করে দেন শ্রেণিকক্ষে কী হবে। এরপর ব্যর্থ হলে দায় পড়ে শিক্ষকদের ঘাড়ে।
অভিভাবকেরা স্পষ্ট ভাষায় বলছেন, তারা আর সন্তানদের গিনিপিগ বানাতে চান না। শিক্ষকরা ক্ষুব্ধ, কারণ বাস্তবতা না বুঝে চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত তারাই বাস্তবায়ন করতে বাধ্য হন। শিক্ষাবিদদের বড় অংশও বলছেন, নির্বাচনকালীন সময়ে এ ধরনের পরিবর্তন চরম হঠকারিতা।
প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে নীতি প্রণয়নের সময় একটি বিষয়ই সবচেয়ে জরুরি, বাস্তবতা। আর সেই বাস্তবতা সবচেয়ে ভালো জানেন মাঠের শিক্ষকরা। শিক্ষক নেতৃত্ব ছাড়া কোনো শিক্ষা সংস্কার টেকসই হয় না। শুধু আমলা নির্ভর নীতি মানেই কাগুজে সাফল্য আর বাস্তব ব্যর্থতা।
বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা আজ স্থিরতা চায়, ধারাবাহিকতা চায়। বারবার নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতির নামে পরীক্ষা-নিরীক্ষা নয়। শিশুদের নিয়ে খেলা বন্ধ না হলে ইতিহাস খুব নির্মমভাবে প্রশ্ন করবে, আমরা কি শিক্ষা গড়েছি, নাকি প্রকল্পের আড়ালে ধান্দা চালিয়েছি?
এই প্রশ্নের উত্তর এখনই দরকার। না হলে প্রাথমিক শিক্ষা সত্যিই আমলাদের পরীক্ষাগার হয়েই থেকে যাবে।
লেখক: শিক্ষক, কুষ্টিয়া জিলা স্কুল।