তৃণমূল ভাঙবেন নাকি বাইরে রাখবেন, বড় দ্বিধায় শুভেন্দু

তৃণমূল ভাঙবেন নাকি বাইরে রাখবেন, বড় দ্বিধায় শুভেন্দু

সংগৃহীত ছবি

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে বিশাল জয়ের পর এখন এক বড়সড় উভয়সংকটের মুখে পড়েছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। তৃণমূল কংগ্রেসের বিক্ষুব্ধ ও দলবদলকারী নেতাদের দলে টেনে নেওয়া হবে, নাকি তাদের বাইরেই বসিয়ে রাখা হবে—তা নিয়ে তীব্র দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছে গেরুয়া শিবির। 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিজেপির জন্য এই দুটি পথই বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। যদি তারা তৃণমূলের নেতাদের দলে জায়গা দেয়, তবে মমতাদির দলের বিরুদ্ধে বছরের পর বছর ধরে মার খাওয়া এবং লড়াই করা মাঠপর্যায়ের আদি বিজেপি কর্মীরা ক্ষুব্ধ ও দলবিমুখ হতে পারেন। আবার অন্যদিকে, যদি এই নেতাদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়, তবে রাজ্য রাজনীতিতে তৃণমূলের যে দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক ভিত ও প্রভাব রয়েছে, তা পুরোপুরি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার একটি বড় সুযোগ হাতছাড়া হতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে দলবদলকারীদের বিষয়ে কড়া অবস্থান নিয়েছে বিজেপির রাজ্য নেতৃত্ব। রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে, বিজেপি কোনো ‘ধর্মশালা’ নয়। যারা বিজেপির কর্মীদের ওপর অত্যাচার করেছে বা হত্যা করেছে, তাদের কোনোভাবেই দলে জায়গা দেওয়া হবে না। তার মতে, পশ্চিমবঙ্গের মানুষ তৃণমূল কংগ্রেসের অপশাসনের বিরুদ্ধে ভোট দিয়ে বিজেপিকে জিতিয়েছে। তাই এখন যদি তৃণমূলের নেতাদের দলে নেওয়া হয়, তবে তা জনগণের রায়ের প্রতি একধরনের বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে গণ্য হবে।

তবে এই অনমনীয় অবস্থানের পাশাপাশি বাস্তব পরিস্থিতি কিন্তু অন্য কথা বলছে। আগামী বছর পশ্চিমবঙ্গে পঞ্চায়েত এবং পৌরসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আর এই স্থানীয় নির্বাচনে জয়লাভ করতে হলে তৃণমূলের এই দলবদলকারী নেতাদের মাঠপর্যায়ের সাংগঠনিক দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা বিজেপির জন্য অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে। ফলে তাত্ত্বিক অবস্থান যা-ই হোক না কেন, ভোটের রাজনীতির স্বার্থে বিজেপিকে হয়তো এই নেতাদের ব্যাপারে কিছুটা নরম বা উদার হতে হতে পারে।

এদিকে বিধানসভা নির্বাচনে এই ভরাডুবির পর তৃণমূল কংগ্রেসের ভেতরে এখন বড় ধরনের ভাঙনের সুর শোনা যাচ্ছে। দিল্লি ও কলকাতার রাজনৈতিক অলিন্দে জোর গুঞ্জন চলছে যে, তৃণমূলের একাধিক রাজ্যসভা সাংসদ খুব শিগগিরই দল ছাড়তে পারেন। বর্তমানে লোকসভায় তৃণমূলের ২৯ জন এবং রাজ্যসভায় ১০ জন সাংসদ রয়েছেন। ধারণা করা হচ্ছে, এই ১০ জন রাজ্যসভা সাংসদের মধ্যে অন্তত ৮ জনই বিজেপিতে যোগ দিতে পারেন, যা সাম্প্রতিক সময়ে আম আদমি পার্টির (আপ) ভাঙনের খসড়াকেই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। এ ছাড়া তৃণমূলের অনেক বিধায়ক ও শীর্ষ নেতা সম্প্রতি দলের ডাকা গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকগুলোতে অনুপস্থিত থাকায় দলটির ভেতরে এক চরম অসন্তোষ ও অন্তর্ঘাত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। নিজের চেনা দুর্গ ভবানীপুরে তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরাজয়ের পর দলের ভেতরে তার নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন অনেকেই। 

উল্লেখ্য, তৃণমূল থেকে বিজেপিতে আসা শুভেন্দু অধিকারীর কাছেই হারতে হয়েছে মমতাদিকে, যিনি উগ্র হিন্দুত্ববাদ এবং অনুপ্রবেশবিরোধী কড়া প্রচার চালিয়ে পুরো রাজ্যে বিজেপির জয়ের কাণ্ডারি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। একইসঙ্গে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা বা আইনি ব্যবস্থার ভয়েও অনেক তৃণমূল নেতা এখন বিজেপির ছায়াতলে আশ্রয় নেওয়ার পথ খুঁজছেন।

নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফলে দেখা গেছে, তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে দীর্ঘ ও তীব্র রাজনৈতিক লড়াইয়ের পর ২৯৪টি আসনের মধ্যে ২০৭টি আসনে বিশাল জয় নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে সরকার গঠন করেছে বিজেপি। বিপরীতে তৃণমূল মাত্র ৮০টি আসনে সংকুচিত হয়ে পড়েছে এবং শুভেন্দু অধিকারী রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। এই বিপর্যয়ের পর ক্ষুব্ধ ও বিদ্রোহী কণ্ঠস্বরগুলোকে স্তিমিত করে দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখাই এখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আর এই টালমাটাল পরিস্থিতিতে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এখনই তাড়াহুড়ো না করে ‘ধীরে চলো’ এবং ‘পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ’ করার কৌশল বেছে নিয়েছে।

সূত্র: এনডিটিভি