ক্ষুদ্র পোশাক কারখানায় বরগুনার উপকূলে নতুন সম্ভাবনা
ছবি: সংগৃহীত
উপকূলীয় জেলা বরগুনার বেতাগীতে গড়ে ওঠা ক্ষুদ্র পোশাক কারখানা খুলে দিয়েছে কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার নতুন দ্বার। স্থানীয় উদ্যোক্তার নিজস্ব উদ্যোগ ও পুঁজিতে প্রতিষ্ঠিত এ কারখানায় কাজের সুযোগ পাচ্ছেন গ্রামীণ নারী ও তরুণেরা। এতে একদিকে নারীদের স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে স্থানীয় বাজার ও গ্রামীণ অর্থনীতিও চাঙা হচ্ছে।
কৃষিনির্ভর এ জনপদে উল্লেখযোগ্য শিল্পাঞ্চল না থাকায় কাজের সন্ধানে একসময় রাজধানী ঢাকা, সাভার, গাজীপুর কিংবা চট্টগ্রামের মতো শিল্পাঞ্চলে পাড়ি জমাতেন স্থানীয়রা। তবে সেই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে। উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে বুড়ামজুমদার ইউনিয়নের কাজীর হাটের তুলতলা এলাকায় গড়ে উঠেছে ‘গ্রিন লিভ ফ্যাশন’ নামের ক্ষুদ্র পোশাক কারখানা। স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে কারখানাটি এখন অনেকের কাছে আয়ের নতুন উৎস হয়ে উঠেছে।
স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ২০টি সেলাই মেশিন দিয়ে কারখানাটির যাত্রা শুরু হলেও চলতি বছর থেকে এর ইতিবাচক প্রভাব আরও স্পষ্ট হয়েছে। বিশেষ করে স্থানীয় নারী ও তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হওয়ায় পরিবারগুলোতে ফিরছে আর্থিক সচ্ছলতার সম্ভাবনা।
কারখানা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এখানে বর্তমানে ২৫ জন পোশাকশ্রমিক কাজ করছেন। তাদের বড় একটি অংশ নারী। তাদের মধ্যে রয়েছেন বিধবা, তালাকপ্রাপ্ত ও প্রতিবন্ধী নারীও। একসময় ঘরে বসে থাকা এসব নারী এখন সেলাই, কাটিং ও প্যাকিংয়ের কাজ শিখে নিয়মিত আয় করছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, ক্ষুদ্র এ কারখানাকে ঘিরে কর্মীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে নতুন উদ্দীপনা। বাড়ির কাছেই কাজের সুযোগ পাওয়ায় তাদের আর দূরের শিল্পাঞ্চলে গিয়ে চাকরি খুঁজতে হচ্ছে না। নিয়মিত আয় পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয় মেটানোর পাশাপাশি তাদের আর্থিক স্বাবলম্বিতা অর্জনে সহায়তা করছে।
কারখানায় কর্মরত রোকসানা আক্তার বলেন, গ্রামীণ অনেক নারী পারিবারিক ও নানা সীমাবদ্ধতার কারণে ঢাকা, গাজীপুর কিংবা চট্টগ্রামের মতো শিল্পাঞ্চলে গিয়ে কাজ করতে পারেন না। এখন বাড়ির কাছেই কাজের সুযোগ পাওয়ায় তারা স্বাচ্ছন্দ্যে আয় করতে পারছেন।
শুধু কর্মসংস্থানই নয়, কারখানাটির প্রভাবে স্থানীয় বাজারেও বাড়ছে কেনাবেচা। পোশাক তৈরির কাঁচামাল, সুতা ও বোতাম আপাতত ঢাকা থেকে সরবরাহ করা হলেও শ্রমিকদের দৈনন্দিন কেনাকাটায় এলাকার মুদি দোকানসহ বিভিন্ন ব্যাবসাপ্রতিষ্ঠানে লেনদেন বাড়ছে।
কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব), বেতাগী উপজেলা শাখার সভাপতি সহকারী অধ্যাপক আবুল বাসার খান বলেন, উৎপাদিত পোশাক বড় শহর কিংবা বাজারে বিপণনের জন্য উন্নত ব্যবস্থা না থাকায় বড় পরিসরে ব্যাবসা গড়ে তোলা কঠিন। তবে কম খরচে পোশাক উৎপাদন করে স্থানীয় চাহিদা অনুযায়ী সাশ্রয়ী মূল্যে সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে। এতে কম আয়ের মানুষ সহজেই তাদের প্রয়োজনীয় পোশাক কিনতে পারছেন।
বেতাগী পৌর শহর ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আ. আজীজ হাওলাদার বলেন, ঈদ, পূজা, বড়দিনসহ বিভিন্ন উৎসবকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বাজারে এ কারখানায় তৈরি পোশাকের চাহিদা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে স্থানীয় ব্যাবসা-বাণিজ্য আরও সম্প্রসারিত হতে পারে।
কারখানায় কর্মরত শ্রমিক করুণা গ্রামের বাসিন্দা তানিয়া বেগম বলেন, এই ক্ষুদ্র কারখানাটি আমার মতো অসহায় গ্রামীণ নারীর কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিয়েছে। এখন বাড়ির কাছেই কাজ করে অর্থ উপার্জন করতে পারছি। এতে পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা বাড়ছে, পাশাপাশি নিজেরও ভালো লাগছে।
একই কারখানায় কর্মরত স্থানীয় যুবক এইচ এম মনিরুল ইসলাম মনে করেন, তরুণদের জন্য এ উদ্যোগ আয়ের নতুন উৎস হয়ে উঠেছে। বড় শহরের গার্মেন্টসে কাজের জন্য না গিয়ে নিজ এলাকায় কর্মসংস্থানের সুযোগ পাওয়ায় গ্রামীণ যুবকদের শহরমুখী হওয়ার প্রবণতাও কমতে পারে।
ক্ষুদ্র এ পোশাক কারখানার উদ্যোক্তা মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক থেকে সহজ শর্তে ঋণ ও কারিগরি সহায়তা পাওয়া গেলে কারখানাটিকে আরও বড় পরিসরে সম্প্রসারণ করা সম্ভব। ভবিষ্যতে উৎপাদন বাড়িয়ে আরও মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর।
বরগুনা উদ্যোক্তা অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সহিদুল ইসলাম স্বপ্ন বলেন, ক্ষুদ্র পোশাকশিল্পের বিকাশে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ, আধুনিক সেলাই ও ডিজাইন বিষয়ে প্রশিক্ষণ, স্বল্প সুদে ঋণ এবং যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এসব সহায়তা পাওয়া গেলে স্থানীয় উদ্যোক্তারা উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি বৃহত্তর বাজারেও প্রবেশ করতে পারবেন।
এ বিষয়ে বেতাগী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুহ. সাদ্দাম হোসেন বলেন, ঘরের কাজ সামলে গ্রামীণ নারীরা বাড়ির কাছেই সম্মানজনক আয়ের সুযোগ পেলে তাদের সামাজিক মর্যাদা বাড়বে। একই সঙ্গে কাজের সন্ধানে মানুষের শহরমুখী হওয়ার প্রবণতা কমবে। এতে তৃণমূল পর্যায়ে টেকসই উন্নয়নের পথ সুগম হবে।