পেট ফাঁপা, ক্লান্তি বা কোষ্ঠকাঠিন্য? যে লক্ষণগুলো হতে পারে ক্যান্সারের লক্ষণ
ফাইল ছবি
পেট ফাঁপা, সারাক্ষণ ক্লান্তি কিংবা কোষ্ঠকাঠিন্য দৈনন্দিন জীবনে এমন সমস্যাকে খুব একটা গুরুত্ব দেন না অনেকেই। কখনো খাবারের সমস্যা, কখনো হজমের গোলমাল ভেবে এড়িয়ে যান। কিন্তু এসব উপসর্গ দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলে কিংবা শরীরে নতুন কোনো পরিবর্তন দেখা দিলে সতর্ক হওয়া জরুরি। কারণ, কিছু ক্ষেত্রে নারীদের ডিম্বাশয় বা স্তন ক্যানসারের প্রাথমিক লক্ষণও এমন সাধারণ সমস্যার মতো হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্যানসারের শুরুতেই সব সময় তীব্র ব্যথা বা স্পষ্ট কোনো উপসর্গ দেখা যায় না। ফলে অনেক নারী বুঝতেই পারেন না যে শরীরে অস্বাভাবিক কিছু ঘটছে।
আর এই অবহেলাই কখনো কখনো রোগ শনাক্তে দেরির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
সম্প্রতি হিন্দুস্তান টাইমসের এক প্রতিবেদনে নারীদের ক্যানসারের প্রাথমিক লক্ষণ ও দেরিতে রোগ শনাক্ত হওয়ার কারণ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এ বিষয়ে নিজের মতামত জানিয়েছেন ভারতের এসএসও ক্যানসার হাসপাতালের স্তন ক্যানসারবিষয়ক সার্জিক্যাল অনকোলজিস্ট চিকিৎসক নিহারিকা গারাচ।
কেন প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়ে না ক্যানসার?
ক্যানসারের লক্ষণ সব সময় তীব্র বা স্পষ্ট হয় না।
পেট ফাঁপা, ক্লান্তি, মাসিকের ধরনে পরিবর্তন, তলপেটে অস্বস্তি কিংবা স্তনে ব্যথাহীন চাকা এসব উপসর্গকে অনেক নারী সাধারণ শারীরিক সমস্যা বলে মনে করেন। ফলে চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার প্রয়োজনও অনুভব করেন না। চিকিৎসক নিহারিকা গারাচের মতে, কিছু ক্যানসার গুরুতর সংকট দিয়ে শুরু হয় না বরং এমন কিছু লক্ষণ দিয়ে শুরু হয়, যেগুলোকে সহজেই অন্য কোনো সাধারণ সমস্যা বলে মনে হতে পারে। বিশেষ করে স্তনে ব্যথা নেই বলে চাকা বা পিণ্ডকে উপেক্ষা করা বিপজ্জনক হতে পারে। ব্যথা না থাকলেই যে কোনো সমস্যা নিরীহ, এমন ধারণা ঠিক নয়।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা একটি গবেষণায়, রোগ শনাক্তে অন্তত তিন মাস দেরি হয়েছিল এমন ৩০০ জন ভারতীয় নারীর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। তাদের মধ্যে ৭৭ দশমিক ৭ শতাংশের প্রথম উপসর্গ ছিল স্তনে ব্যথাহীন চাকা। গবেষণায় অংশ নেয়া নারীদের প্রায় ৭০ শতাংশের ক্ষেত্রে রোগ শনাক্তের সময় ক্যানসার স্থানীয়ভাবে অনেকটা ছড়িয়ে পড়েছিল অথবা শরীরের অন্য অংশে ছড়িয়েছিল।
ডিম্বাশয়ের ক্যানসার লক্ষণ
নারীদের বিভিন্ন ধরনের ক্যানসারের মধ্যে ডিম্বাশয়ের ক্যানসার প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা কঠিন হতে পারে। এর অন্যতম কারণ, রোগটির প্রাথমিক উপসর্গ অনেক সাধারণ শারীরিক সমস্যার সঙ্গে মিলে যায়। যেসব লক্ষণের দিকে খেয়াল রাখা জরুরি—
- বারবার পেট ফাঁপা : পেট ফাঁপা বা পেট ভারী লাগার সমস্যা ঘন ঘন হলে এবং তা না কমলে গুরুত্ব দিন।
- পেটে বা তলপেটে অস্বস্তি : কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই পেট বা শ্রোণি অঞ্চলে অস্বস্তি হতে পারে।
- কোষ্ঠকাঠিন্য : দীর্ঘস্থায়ী বা নতুন ধরনের মলত্যাগের সমস্যা অন্য উপসর্গের সঙ্গে দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
- প্রস্রাবের পরিবর্তন : ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ বা প্রস্রাবসংক্রান্ত নতুন সমস্যা দেখা দিতে পারে।
- অস্বাভাবিক ক্লান্তি : পর্যাপ্ত বিশ্রামের পরও ক্লান্তি না কমলে বিষয়টি খেয়াল করা প্রয়োজন।
তবে এসব উপসর্গ থাকলেই ডিম্বাশয়ের ক্যানসার হয়েছে, এমন নয়। হজমের সমস্যা, খাদ্যাভ্যাস, হরমোনের পরিবর্তনসহ নানা কারণেও এমন হতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, উপসর্গগুলো নতুন কি না, বারবার হচ্ছে কি না এবং সময়ের সঙ্গে বাড়ছে কি না।
ডিম্বাশয়ের ক্যানসার শনাক্তে নিয়মিত স্ক্রিনিং কেন করা হয় না?
ডিম্বাশয়ের ক্যানসার নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গড় ঝুঁকির এবং কোনো উপসর্গ নেই এমন নারীদের জন্য বর্তমানে নিয়মিত স্ক্রিনিং পরীক্ষা সুপারিশ করা হয় না। চিকিৎসক গারাচের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বড় পরিসরের গবেষণায় সিএ-১২৫ (CA-125) রক্ত পরীক্ষা কিংবা ট্রান্সভ্যাজাইনাল আলট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে নিয়মিত স্ক্রিনিং করলে মৃত্যুহার কমে এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
তাই সবার জন্য নিয়মিত পরীক্ষা করার পরিবর্তে ব্যক্তিগত ঝুঁকি, পারিবারিক ইতিহাস এবং উপসর্গ বিবেচনায় চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। তবে উপসর্গ দেখা দিলে স্ক্রিনিংয়ের জন্য অপেক্ষা না করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা মূল্যায়ন করানো উচিত।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন
সন্তান লালন-পালন, পরিবারের দায়িত্ব, চাকরি কিংবা ঘরের কাজ সামলাতে গিয়ে অনেক নারী নিজের শারীরিক সমস্যাকে গুরুত্ব দিতে পারেন না। কিন্তু শরীরে দীর্ঘদিন ধরে চলা পরিবর্তনকে অবহেলা করা উচিত নয়। পেট ফাঁপা, তলপেটে অস্বস্তি, প্রস্রাবের অভ্যাসে পরিবর্তন বা কোষ্ঠকাঠিন্য বারবার হলে কিংবা না কমলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। স্তনে নতুন কোনো চাকা, স্তনবৃন্তে পরিবর্তন, ত্বকে অস্বাভাবিকতা বা অকারণে নিঃসরণ দেখা দিলেও দ্রুত পরীক্ষা করানো প্রয়োজন।
বিশেষ করে স্তনে নতুন চাকা দেখা দিলে ব্যথা হওয়ার অপেক্ষা করবেন না। একইভাবে, এসব উপসর্গের কোনোটি দেখা দিলেই আতঙ্কিত হওয়ারও প্রয়োজন নেই। চিকিৎসকের মূল্যায়নই সম্ভাব্য কারণ নির্ণয়ের সঠিক উপায়।
চিকিৎসক নিহারিকা গারাচের পরামর্শের মূল কথা হলো, নিজের শরীরের স্বাভাবিক অবস্থা সম্পর্কে সচেতন থাকা। কোনো পরিবর্তন অস্বাভাবিক মনে হলে সেটিকে শুধু দৈনন্দিন সমস্যা ভেবে এড়িয়ে না গিয়ে চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। কারণ, ক্যানসার শনাক্তের ক্ষেত্রে নিজের শরীরের পরিবর্তনকে গুরুত্ব দেয়াও গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ।