সরকার পতনের জন্য কেবল ছাত্র—জনতা নয়, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বও অংশীদার!

সরকার পতনের জন্য কেবল ছাত্র—জনতা নয়, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বও অংশীদার!

প্রতীকী ছবি।

মুক্তিযুদ্ধের সময়ে কুমিল্লা জেলা তথা দেবিদ্বার উপজেলার কালিকাপুর গ্রামের নামটি খুব আলোচিত ছিল। মুক্তিকামী মানুষের নিকট মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী হিসাবে এক চরম আতঙ্কের নাম ছিল ” কালিকাপুর গ্রামের আফসু রাজাকার”। আবার আফসু রাজাকারকে শিকার করতে গিয়ে নিজেই শিকার হয়েছিলেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বেঙ্গল রেজিমেন্টের শিয়ালকোট রণাঙ্গনের বীর যোদ্ধা, সেনাবাহিনীর পুরষ্কার প্রাপ্ত বক্সার (মুষ্টিযোদ্ধা) ও বীর মুক্তিযোদ্ধা হাবিলদার সোনা মিয়া। একই উপজেলার নবিয়াবাদ গ্রামের কৃতি সন্তান মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে নিজ গ্রাম নবিয়াবাদ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে স্থানীয় যুবকদের হাতে—কলমে যুদ্ধের প্রশিক্ষণও দিয়েছিলেন এই বীর সেনানী। সোনা মিয়া মিলিটারীর প্রসঙ্গ টানার কারণ হলো মুক্তিযুদ্ধের পর স্থানীয় সাধারণ মানুষের সঙ্গে কোন মুক্তিযোদ্ধার দেখা হলে জানতে চাইতেন ”আফসু রাজাকারকে কারা মেরেছে?” গবের্র সঙ্গে প্রায় সকল মুক্তিযোদ্ধাই উত্তর দিতেন ”আমিই তাকে মেরেছি।”

২০২৪ এর বিপ্লব যে সাধারণ মানুষের দীর্ঘ ও নানা কারণে জমানো ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ এটাই বাস্তবতা। আওয়ামী লীগের অনেক নেতা কর্মী এখনো এক ঘোরের মধ্যে দিন পাড় করছেন। তাদের অনেকের এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না দল সরকারে নেই। অন্যদিকে বিপ্লবে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন নিয়ে অনেকেই অনেক রকম ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করছেন আবার কেউ কেউ এই পতনে নিজেদেরকে অগ্রনায়ক হিসাবে বলছেন, যদিও সমন্বয়করাই এর একমাত্র মাস্টার মাইণ্ড হিসাবে নিজেদের দাবী করছেন। তবে সমন্বয়কদের উক্ত দাবী রাজনৈতিক দলগুলো মানতে নারাজ, তারা ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনে আন্দোলনকারী বিরোধী রাজনৈতিক জোটের বিগত বছরগুলোর আন্দোলনের ধারাবাহিক ফসল বলে সভা সমাবেশে বলে চলেছেন। কিন্তু এই অমীমাংশিত বিষয়ে আরো একটি অন্যতম কারণ যোগ করতে চাই তা হলো আওয়ামী লীগ সরকার পতনের সবচেয়ে বড় কারণ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব।

শেষ সময়ে এসে আওয়ামী লীগের দলীয় অন্তর্দ্বন্দ্ব, কেন্দ্রের সাথে তৃণমূলের দূরত্ব বৃদ্ধি, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতিক প্রবর্তন ও কেন্দ্র থেকে তৃণমূল (উপজেলা) পর্যন্ত ব্যাপক আর্থিক দুর্নীতি, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় নেতাদের স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে প্রার্থী হতে সুযোগ দিয়ে কেন্দ্রীয় নেতাদের হঠকারী আশ্বাসে প্রার্থীদের অর্থ আত্মসাতের কারণে তৃণমূল নেতা—কর্মীদের মাঝে বিভাজন সৃষ্টি ও তাদের আর্থিকভাবে পঙ্গু করা, উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী প্রদানে মন্ত্রী—এমপিদের আত্মীয় স্বজনদের প্রার্থী না হতে কেন্দ্রের নির্দেশনা ও পরে মন্ত্রী—এমপি কতৃর্ক নির্দেশনা অমান্য করা। আরো গভীরে আলোচনা করলে বলতে হয় বর্ষীয়ান এ দলটি তার নীতি আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে ক্ষমতায় আসতে আর্থিক মোহে হোক আর জাতীয় সংসদে মাথা গুনতে হোক মার খাওয়া নেতা কর্মীদের দুঃসময়ের ত্যাগের কথা ভুলে ব্যাংক লুটেরা, দুর্নীতিবাজ, পেশী শক্তি ও অরাজনৈতিক শিল্পপতি এবং ব্যবসায়ীদের উপর নির্ভরশীল হয়ে তাদের রাজনীতিতে পুনর্বাসন করা অন্যতম কারণ।

ফলে সরকার পতনের আন্দোলনে দলের বিশ্বাসী ও ত্যাগী কর্মীরা কেন্দ্রের কোন নির্দেশনাই আমলে নেননি, বরং তারা আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে বিরোধী দল হিসাবে কামনা করেছেন। আর কেন্দ্রের তথাকথিত বড় বড় নেতারা শেখ হাসিনার সরলতার সুযোগে নিজ আসনে রাজনৈতিক বলয় সৃষ্টি, নিজেদের পেশী শক্তি বৃদ্ধি ও নিজ দলের বিপক্ষের নেতা কর্মীদের উপর কারনে-অকারণে ব্যবহার, নিজেদের আখের গোছাতে ও দুর্নীতির পথ সুগম করতে শেখ পরিবারকে ব্যবহারের উত্তম ও তেলেসমাতি পন্থার প্রবর্তন করেন। যা আওয়ামী লীগ সরকার পতনের অন্যতম কারণ বলে তৃণমূল নেতৃত্ব মনে করেন।
জুলাই ২০২৪ এর পূর্ব পর্যন্ত দেশের কোন নাগরিক মনে করেননি আওয়ামী লীগ চলমান বিপর্যয়ের মুখোমুখি হবে। কিন্তু যে কোটা প্রথার দাবীকে কেন্দ্র করে একটি সাধারণ আন্দোলন সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ নিয়েছিল তা সাধারণ মানুষ ঠাহর করতে পারলেও তখনো দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বুঝে উঠতে পারেননি। কারণ জনগণের পালস্ বা রাজনৈতিক শিরাঃধমনী বুঝতে রাজনৈতিক ব্যক্তিতের প্রয়োজন, যা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগে ষ্পষ্টতঃ অভাব ছিল।

 

লেখকঃ মীর্জা বাহাদুর, বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক।