অর্থ বুঝে নামাজ পড়ার উপকার

অর্থ বুঝে নামাজ পড়ার উপকার

ছবি: সংগৃহীত

নামাজে কেরাত-তাসবিহ-দোয়া ইত্যাদির অর্থ বুঝে পড়ার উপকারিতা ও ফজিলত অনেক। নামাজে আমরা যা বলি, তার অর্থ যদি জানা থাকে, তাহলে অন্য চিন্তা মাথায় আসার সুযোগ পাবে না। অন্তর নরম হবে। আল্লাহর সামনে বিনয় বেড়ে যাবে। স্বাভাবিকভাবেই অর্থ বোঝার কারণে আল্লাহর ভয় ও ভালোবাসা অন্তরকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে। ফলে নামাজ পূর্ণতা পাবে। 

আল্লাহর রাসুল ও তাঁর সাহাবিরা অর্থ বোঝার কারণেই নামাজে অনেকসময় আল্লাহর ভয়ে কান্না করতেন। রাসুলুল্লাহ (স.) যখন কেরাত পড়তেন তখন তাঁর বক্ষস্থলে হাঁড়িতে পানি ফোটার মতো (অথবা যাঁতা ঘোরার মতো) কান্নার শব্দ পাওয়া যেত। (নাসায়ি, বায়হাকি: ২/২৫১, আহমদ: ৪/২৫, ২৬, ইবনে খুজাইমা, ইবনে হিববান, আবু দাউদ: ৭৯৯)

হজরত আবু বকর (রা.)-এর ব্যাপারি বর্ণিত আছে, তিনি কিরাত পড়লে কান্নার ফলে লোকদেরকে তা শুনাতে পারতেন না। (বুখারি: ৬৭৯) তার মানে এই নয় যে, ইচ্ছা করেই তাঁরা উচ্চস্বরে কান্না করতেন। বরং মহান আল্লাহর ভয়ে যে চাপা কান্না সংবরণ করতে পারা যায় না তা-ই তাঁদের থেকে প্রকাশ পেত। মূলত এরকম নামাজের মাধ্যমে মহান আল্লাহর সঙ্গে বান্দার সম্পর্ক তৈরি হয়। এমন নামাজই প্রেমাষ্পদের সঙ্গে কথোপকথনের সবচেয়ে বড় মাধ্যম। কিন্তু অর্থ না বুঝে নামাজ পড়লে স্বাভাবিকভাবে বুঝে পড়ার মতো আল্লাহর ভয়, খুশুখুজু ইত্যাদি সুন্দর হয় না।

নামাজে দাঁড়িয়ে প্রথমে আমরা ‘আল্লাহু আকবার’ বলি। যার অর্থ আল্লাহ মহান! তারপর সানা পড়ি- ‘সুবহানাকা আল্লাহুম্মা ওয়া বিহামদিকা ওয়া তাবারাকাসমুকা ওয়া তাআলা জাদ্দুকা ওয়া লা ইলাহা গাইরুকা’। অর্থ: ‘হে আল্লাহ! তুমি পাক-পবিত্র, তোমার জন্য সমস্ত প্রশংসা, তোমার নাম বরকতময়, তোমার গৌরব অতি উচ্চ, তুমি ছাড়া অন্যকোনো উপাস্য নেই।’ তারপর আমরা শয়তানের প্রতারণা থেকে আশ্রয় চেয়ে বলি, ‘আউজু বিল্লাহি মিনাশ শায়তানির রাজিম।’ অর্থ: বিতাড়িত শয়তান থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। এরপর বলি, ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।’ অর্থ: ‘পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে আরম্ভ করছি।’ এরপর আমরা সুরা ফাতেহা দিয়ে নামাজ শুরু করি।

সুরা ফাতেহায় আমরা যখন বলি, ‘আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামিন (সকল প্রশংসা বিশ্বজগতের মালিক আল্লাহর জন্যই)।’ তখন আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হামিদা নি, আবদি (আমার বান্দা আমার প্রশংসা করল)।’ অতঃপর আমরা যখন বলি—‘আর রাহমানির রাহিম (তিনি পরম করুণাময় অতি দয়ালু)’ তখন আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আছনা আলাইয়া আবদি (আমার বান্দা আমার বিশেষ প্রশংসা করল)।’ এরপর যখন আমরা বলি, ‘মালিকি ইয়াওমিদ্দিন (তিনি বিচারদিনের মালিক)।’ তখন আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘মাজ্জাদানি আবদি (আমার বান্দা আমাকে সম্মানিত করল)।’ এরপর আমরা যখন বলি, ‘ইয়্যাকা না’বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাস্তাঈন (শুধু আপনারই ইবাদত করি আর শুধু আপনার কাছেই সাহায্য চাই)।’ তখন আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হাজা বাইনি ওয়া বাইনা আবদি (এই ফয়সালাই হলো আমার ও আমার বান্দার মধ্যে—বান্দা আমার ইবাদত ও আনুগত্য করবে, আমি তাকে সাহায্য-সহযোগিতা করব)।’ এরপর আমরা যখন বলি, ‘ইহদিনাছ ছিরাতল মুসতাকিম, ছিরাতল্লাজিনা আনআমতা আলাইহিম, গায়রিল মাগদুবি আলাইহিম ওয়ালাদ্দল্লিন! (আমাদের সঠিক পথ দেখান, তাদের পথ যাদের আপনি নিয়ামত দিয়েছেন; তাদের পথ নয় যারা পথভ্রষ্ট; আর না যারা অভিশপ্ত)।’ তখন আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘লিআবদি মা ছাআল (আমার বান্দা যা চায়, তার জন্য তা-ই)।’ (সহিহ মুসলিম: ৩৯৫)

উল্লেখিত বিষয়গুলো লক্ষ করুন, নামাজ সুন্দর হওয়ার জন্য অর্থ বোঝা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। সুরা ফাতেহার পর আমরা অন্য একটি সুরা মেলাই। সেই সুরার অর্থও জানা থাকা উচিত। সেজন্য নামাজে সাধারণত যেসব সুরা পড়ি, সেগুলোর অর্থ যেন জেনে নিই। এরপর আমরা রুকুতে আল্লাহর প্রশংসা করে বলি: ‘সুবহানা রাব্বিয়াল আজিম।’ অর্থ: ‘আমার মহান রবের পবিত্রতা ও প্রশংসা বর্ণনা করছি।’ রুকু থেকে উঠে বলি, ‘সামি আল্লাহ হুলিমান হামিদা।’ অর্থ: ‘আল্লাহ সেই ব্যক্তির কথা শোনেন, যে তাঁর প্রশংসা করে।’ তারপরই আমরা আবার আল্লাহর প্রশংসা করে বলি, ‘রাব্বানা ওয়া লাকাল হামদ’, অর্থ: ‘হে আল্লাহ! যাবতীয় প্রশংসা কেবল তোমারই।’ তারপর আমরা সেজদায় গিয়ে বলি: সুবহানা রাব্বিয়াল আ’লা, অর্থ: ‘আমার মহান রবের পবিত্রতা বর্ণনা করছি। এভাবে নামাজ শেষে, মধ্য (দুই রাকাত, চার রাকাত ভিত্তিতে) বৈঠক আর শেষ বৈঠকে তাশাহুদে, আল্লাহর প্রশংসা করি।’

তাশাহুদে যা পড়ি তার অর্থ: ‘সকল তাজিম ও সম্মান আল্লাহর জন্য, সকল সালাত আল্লাহর জন্য এবং সকল ভালো কথা ও কর্মও আল্লাহর জন্য। হে নবী! আপনার প্রতি শান্তি, আল্লাহর রহমত ও তাঁর বরকত বর্ষিত হোক। আমাদের ওপরে এবং আল্লাহর নেক বান্দাদের ওপরে শান্তি বর্ষিত হোক। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি মুহাম্মদ আল্লাহর বান্দা এবং তাঁর রাসুল।’

দরুদে যা পড়ি তার অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আপনি নবী মুহাম্মদ (স.) ও তাঁর বংশধরদের ওপর রহমত বর্ষণ করুন, যেমনিভাবে আপনি ইবরাহিম (আ.) ও তাঁর বংশধরদের ওপর রহমত বর্ষণ করেছিলেন। নিশ্চয়ই আপনি প্রশংসিত সম্মানিত।’

দোয়া মাসুরায় যা পড়ি তার অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আমি নিজের ওপর অত্যধিক জুলুম করেছি, গুনাহ করেছি এবং তুমি ব্যতীত পাপ ক্ষমা করার কেউ নেই। সুতরাং তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও। ক্ষমা একমাত্র তোমার পক্ষ থেকে হয়ে থাকে। আমার প্রতি রহম কর। নিশ্চয়ই তুমি ক্ষমাশীল দয়ালু।’ দুই কাঁধে সালাম দিয়ে আমরা নামাজ শেষ করি।

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে অর্থ বুঝে নামাজ পড়ার তাওফিক দান করুন। নামাজের প্রকৃত উদ্দেশ্য যেন হাসিল হয়, সেজন্য সুন্নত মেনে নামাজের প্রত্যেকটি কাজ যথানিয়মে করার তাওফিক দান করুন। আমিন।