পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব ও কর্তব্য

পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব ও কর্তব্য

ছবিঃ সংগৃহীত

আজকাল আমাদের সমাজে আমরা প্রায় দেখছি এক অপ্রত্যাশিত প্রবণতা। মা-বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠানোর ঘটনা দিন দিন বাড়ছে।

এই প্রবণতা এমন এক সময়ে দেখা যাচ্ছে, যখন মা-বাবা তাদের জীবন সমর্পণ করেছিলেন সন্তানের জন্য, তাদের সুখ, তাদের ভবিষ্যৎ গড়তে। কিন্তু আজ তারা যখন বৃদ্ধ বয়সে পৌঁছেছেন, তখন তাদের উপযুক্ত যত্ন বা ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বৃদ্ধাশ্রমে তাদের একাকিত্ব, কষ্ট এবং হতাশার গল্প শুনে হৃদয় ফেটে ওঠে। আমরা যদি এক মুহূর্তের জন্য ভেবে দেখি, তাদের একমাত্র আকাঙ্ক্ষা কী ছিল? নিজেদের সন্তানের সান্নিধ্য, সন্তানের ভালোবাসা। কিন্তু তা পাওয়ার জন্য দীর্ঘদিনের অপেক্ষা আর একাকিত্ব তাদের জীবনকে বিষাদময় করে তুলেছে। আমাদের উচিত, এমন একটা সমাজ গড়া, যেখানে মা-বাবাদের সম্মান এবং যত্ন সবার কাছে অগ্রাধিকারের জায়গায় থাকবে।

কোরআনুল কারিমে মহান আল্লাহ বাবা-মার হকের গুরুত্ব বুঝাতে বলেন, ‘তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো, তার সঙ্গে কোনো কিছু শরিক করো না এবং বাবা-মার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করো।’ (আন-নিসা ৩৬)। ‎মা-বাবার দোয়া বা বদদোয়া অত্যন্ত প্রভাবশালী। যদি কোনো মা ন্যায়সঙ্গত কারণে সন্তানের জন্য বদদোয়া করেন, তবে সেই সন্তান নেককার হলেও আল্লাহতায়ালা তা কবুল করতে পারেন। তাই সন্তানের জন্য মায়ের সন্তুষ্টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মা-বাবাকে ভালোবাসা, সম্মান করা এবং তাদের কষ্ট না দেওয়া আমাদের ধর্মীয় দায়িত্ব। কারণ মা-বাবার হৃদয় থেকে উঠে আসা প্রতিটি বাক্যই মহান রবের দরবারে বিশেষ মূল্য রাখে।

মা-বাবার প্রতি সন্তানের দায়িত্বের গুরুত্ব সম্পর্কে একটি হাদিসে উল্লেখ আছে। এক ব্যক্তি নবিকে যখন জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের কী অধিকার রয়েছে?’ নবি তখন উত্তর দিয়েছিলেন, ‘তোমার মা-বাবা তোমার জান্নাত ও জাহান্নাম।’ (ইবনে মাজাহ ৩৬১০)। ‎এখানে মা-বাবার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করাই জান্নাতে প্রবেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। যখনই সন্তান তাদের মা-বাবার সঙ্গে ভালো আচরণ করে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের পথ খুলে দেন, যদি সে কবিরা গুনাহ পরিহার করতে পারে।

‎বিশ্বে অনেক ধরনের ভালোবাসা ও সম্পর্ক আছে, তবে মা-বাবার ভালোবাসা একেবারে নিখাঁদ ও নিঃস্বার্থ। মাতা-পিতার ভালোবাসায় কোনো শর্ত থাকে না, কোনো প্রত্যাশা থাকে না। তারা সন্তানের জন্য ত্যাগ করতে কখনোই পিছুপা হন না, এমনকি প্রয়োজনে নিজের জীবনও উৎসর্গ করতে কুণ্ঠাবোধ করেন না। আল্লাহতায়ালা মা-বাবার হককে এত বেশি মর্যাদা দিয়েছেন যে, কখনো কখনো তাঁর পথে জিহাদ করাকেও মাতা-পিতার সেবার তুলনায় গৌণ হিসেবে বিবেচনা করেছেন।

 

এটি ছিল এক বিরল ত্যাগ, কারণ ওয়াইস করনি (রহ.) নবির সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাতের সুযোগ পেয়েও মা-বাবার সেবা নির্বাচিত করেছিলেন। ফলে আল্লাহ তাঁকে এমন একটি পুরস্কার দেন, যা অনেক সাহাবিও পায়নি। নবি তাঁর দোয়া কবুল হওয়ার সুসংবাদ দিয়েছিলেন, এমনকি উমর (রা.) তাঁকে মদিনায় পাওয়ার পর তাঁর দোয়া চাইতে যান।

লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট