পাকিস্তানের মরণফাঁদ বেলুচিস্তান মহাসড়ক

পাকিস্তানের মরণফাঁদ বেলুচিস্তান মহাসড়ক

সংগৃহীত

দীর্ঘ ১৫ বছর পর কোয়েটা থেকে ডেরা যাচ্ছিলেন ইসমাইল খান। কিন্তু যাত্রাপথে থেকে থেকেই অজানা ভয়ে আঁতকে উঠছিলেন ইসমাইল। কিছুটা উদ্বিগ্ন হয়েই বাসচালককে জিজ্ঞাসা করলেন-‘রাস্তাটা নিরাপদ তো’? 

গত কয়েক মাস ধরেই সংবাদপত্রের শিরোনামে পাকিস্তানের বেলুচিস্তান মহাসড়ক। খুন-ডাকাতি, দুর্ঘটনা ও জঙ্গি হামলার ঘটনায় রীতিমতো তটস্থ থাকতে হয় ইসমাইলের মতো আমজনতার। দিনের বেলা যেনতেনভাবে কেটে গেলেও রাতের কোনো ভরসা নেই পাকিস্তানের মরণফাঁদ হয়ে ওঠা এই বেলুচিস্তান মহাসড়ক! ডন। 

বেলুচিস্তানে সহিংসতার ঘটনা নতুন নয়। তবে সম্প্রতি নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের মাত্রা আরও বাড়ছে। চলতি বছর ৩১ জানুয়ারি নিষিদ্ধ বেলুচ লিবারেশন আর্মির (বিএলএ) অবরোধের ফলে আরসিডি হাইওয়েতে ১৮ জন নিরাপত্তাকর্মী নিহত হন। এরপর ফেব্রুয়ারি ১৯ তারিখে বারখান-ডেরা গাজি খান হাইওয়েতে ভ্রমণকারী সাত পাঞ্জাবিকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। রাতে বাস থামিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্র পরীক্ষা করে তাদের ওপর হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়। 

এর আগে গত আগস্টে একই কায়দায় ২৩ জনকে হত্যা করা হয়। সে সময় বেলুচিস্তানের সশস্ত্রগোষ্ঠী হামলার দায় শিকার না করলেও তাদেরকেই এই হত্যাকাণ্ডে সঙ্গে জড়িত বলে ভাবা হয়েছিল। 

২০২৫ সালে প্রথম দুই মাসেই লিবারেশন আর্মির বশির জাইব দল প্রদেশজুড়ে চারটি ভিন্ন অনুষ্ঠানে তিনটি প্রধান মহাসড়ক অবরোধ করেছিল। সে সময় তারা ঘণ্টা ধরে যাত্রীদের পরিচয় জানতে চেয়েছিল। এছাড়াও গত মাসে বোলানের পার্বত্য অঞ্চলের কোয়েটা-সুক্কুর এন-৬৫ মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে জঙ্গিরা অবরোধ করেছিল। 

সে সময় প্রাদেশিক সংসদীয় সচিব লিয়াকত লেহারির নিরাপত্তা দলের কাছ থেকে তিনটি রাইফেল ছিনিয়ে নিয়েছিল। হাইওয়েতে এমন ডাকাতি এবং দস্যুতা বেড়ে যাওয়ায় যাত্রীদের বিপন্ন করে তুলছে। পাশাপাশি স্থানীয়দের জীবিকার ওপরও মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। 

বেলুচিস্তান সরকারের মুখপাত্র শহিদ রিন্দের মতে, ১ জানুয়ারি থেকে বিভিন্ন কারণে জাতীয় মহাসড়ক ৭৬ বার বন্ধ করা হয়েছে। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হাইওয়েগুলোর মধ্যে একটি হলো করাচি-কোয়েটা রুট। কেননা এটি বেলুচিস্তানের জনগণের জন্য গুরত্বপূর্ণ সড়ক। 

প্রদেশটির অনেকেই চিকিৎসা, ব্যবসা এবং বিদেশ ভ্রমণের জন্য করাচির ওপর নির্ভর করে। কিন্তু গত দুই মাস ধরে নিরাপত্তা হুমকি, রাস্তা অবরোধ এবং বিক্ষোভের কারণে সড়কটি ঘন ঘন বন্ধ রয়েছে। ফলে হাজার হাজার যাত্রী আটকা পড়েছে। 

কোয়েটা-ভিত্তিক সাংবাদিক জয়নুদ্দিন আহমেদ দুঃখ ভারাক্রান্ত মনে বলেন, ‘করাচির একটি হাসপাতালে আমার ছেলের জন্য অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল। কিন্তু রাস্তা বন্ধ থাকায় আমাকে তিনবার তা স্থগিত করতে হয়েছিল। যতবার আমি ভ্রমণের পরিকল্পনা করেছি নতুন নিরাপত্তা সংকট দেখা দিয়েছে যা আমার নিরাপদ ভ্রমণকে অসম্ভব করে তুলেছে।’

ঘন ঘন রাস্তা বন্ধ থাকায় বিমান ভাড়া সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ১৮ হাজার থেকে ৬০ হাজার রুপি বেড়েছে। চাঁদাবাজি ও নিরাপত্তার অনিশ্চয়তা বিপাকে ফেলেছে পরিবহণ চালকদের। অনেকই তাদের ব্যবসা বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছে। 

বেলুচিস্তান ট্রান্সপোর্ট ইউনিয়নের মুখপাত্র নাসির শাহওয়ানির মতে, ‘যাত্রীরা এখন ভ্রমণে অনিচ্ছুক। আগে বেলুচিস্তান এবং করাচির মধ্যে ২০০টিরও বেশি যাত্রীবাহী বাস চলাচল করত। কিন্তু এই সংখ্যাটি কমে এখন ১০০ হয়ে গেছে। বিষয়টি প্রদেশের পরিবহণ সেক্টরে মারাত্মক আঘাত করেছে।’ 

একইভাবে পণ্য, শাকসবজি ও ফলমূল পরিবহণ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। শাহওয়ানি আরও বলেন, ‘বেশিরভাগ পরিবহণকারী তাদের যানবাহনের জন্য ঋণ নেয়। এখন আমরা ব্যাংকের কিস্তি দিতে হিমশিম খাচ্ছি।’ 

শুধু ডাকাতি ও হত্যাকাণ্ডই নয় বেলুচিস্তানে সড়ক দুর্ঘটনাও ব্যাপক হারে বেড়েছে। মেডিকেল ইমারজেন্সি রেসপন্স সেন্টার ১১২২-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রদেশে ১৮৩১টি সড়ক দুর্ঘটনার খবর পাওয়া গেছে। বিচ্ছিন্ন সেসব ঘটনায় ৩৯ জন নিহত এবং ২৪০৯ জন আহত হয়েছেন। 

অক্টোবর ২০১৯ এবং জানুয়ারি ২০২৫-এর মধ্যে, বেলুচিস্তানের মহাসড়কে ৮০ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনায় মোটরসাইকেলে হয়েছে। 

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থা, অবকাঠামো উন্নয়ন, এবং জরুরিভিত্তিতে সরকারি হস্তক্ষেপ না করলে এ সমস্যাগুলোর সমাধান হবে না।