ইসলামে মায়ের মর্যাদা

ইসলামে মায়ের মর্যাদা

প্রতিকী ছবি

‘মা’ স্নেহ-মমতা, আত্মত্যাগ, ধৈর্য, সহানুভূতি, বিশ্বস্ততার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। মায়ের কোল মানবজাতির প্রথম শিক্ষালয়। ইসলাম মায়ের মহত্ত্ব, সেবা এবং তার আনুগত্য ও আদেশ মানার যে শিক্ষা দিয়েছে তা তুলনাহীন।

সন্তানের প্রতি মায়ের মমত্ববোধ বোঝাতে গিয়ে রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘যদি মায়েরা শিশুদের দুধ না পান করাতেন, বৃদ্ধ ও বয়োজ্যেষ্ঠরা আল্লাহর সামনে ইবাদতে রত না থাকতেন, আর নিষ্পাপ পশুরা মাঠে চরে না বেড়াতো, তাহলে নিঃসন্দেহে তোমাদের ওপর কঠোর শাস্তি নেমে আসতো।’ মা এই পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান ও মহান সম্পদ। তার স্নেহ-মমতা, ভালোবাসা এবং নিঃস্বার্থতা ও বিশ্বস্ত হৃদয় কোনও পরিচয়ের মুখাপেক্ষী নয়।

এটি একটি ঐতিহাসিক সত্য যে, প্রতিটি ধর্ম এবং প্রতিটি সভ্যতা মায়ের মহত্ত্বকে স্বীকৃতি দিয়েছে। তবে সর্বশ্রেষ্ঠ মানব ও সর্বশেষ নবী হজরত মোহাম্মদ মোস্তফা (সা.) মা-কে সম্মানের সর্বোচ্চ আসনে উন্নীত করেছেন। ইরশাদ করেছেন, ‘মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত।’

রাসুলের সাহাবি হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি রাসুল (সা.)-এর খিদমতে হাজির হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমার সদ্ব্যবহারের সবচেয়ে বেশি হকদার কে? রাসুল (সা.) ইরশাদ করলেন, ‘তোমার মা।’ তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, তারপর কে? রাসুল (সা.) বললেন, ‘তোমার মা।’ তিনি আবারও প্রশ্ন করলেন, তারপর কে? রাসুল (সা.) পুনরায় বললেন, ‘তোমার মা।’ চতুর্থবার জিজ্ঞেস করলে রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘তোমার বাবা।’ (বুখারি শরিফ)

হজরত মুগিরা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের জন্য মায়ের অবাধ্যতা করা এবং কন্যা সন্তানদের জীবন্ত কবর দেওয়াকে হারাম করেছেন।’ (বুখারি শরিফ)

মায়ের সঙ্গে সদ্ব্যবহারের বিষয়ে রাসুল (সা.) যে তিনবার জোর দিয়ে ‘তোমার মা’ কথাটি বলেছেন, এ বিষয়ে উলামায়ে কেরামের ব্যাখ্যা হলো—এই তিনবার মায়ের নাম নেওয়া মূলত মায়ের তিনটি বড় অবদানের প্রতি ইঙ্গিত করে, যেগুলোর উল্লেখ কোরআনেও এসেছে। এক. মা গর্ভধারণ ও সন্তান জন্মদানের কষ্ট সহ্য করেন। দুই. সন্তানকে দুধ পান করান। তিন. এবং দীর্ঘ সময় ধরে সন্তানের সার্বিক যত্ন-আত্তি করেন; নিজের আরাম-আয়েশকে ত্যাগ করে সন্তানের স্বস্তি ও শান্তিকে অগ্রাধিকার দেন। এইসব কারণে মায়ের মর্যাদা ইসলামে পিতার তুলনায় তিন গুণ বেশি গণ্য করা হয়েছে। এটি শুধু আবেগ নয়; বরং বাস্তব ও কোরআন-হাদিসভিত্তিক উপলব্ধি।

পবিত্র কোরআন ও হাদিসে যে বিষয়টি উঠে এসেছে, তা কতটা চমৎকারভাবে একে অপরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কোরআন মাজিদ যেখানে মায়ের তিনটি বড় অনুগ্রহের কথা উল্লেখ করেছে এবং বাবার কথা একবার বলেছে, সেখানে রাসুল (সা.) মায়ের সেবা তিনবার এবং বাবার সেবা একবার করার নির্দেশ দিয়ে সেই শিক্ষার প্রতিধ্বনি করেছেন। কোরআন যখন মা-বাবার প্রতি সন্তানের স্বাভাবিক দায়িত্ববোধ জাগ্রত করেছে, তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) সন্তানের হৃদয়ে তাদের সেবা ও আনুগত্যের স্পৃহা জাগিয়ে তুলেছেন। এই সুন্দর সমন্বয় ইসলামের শিক্ষার গভীরতা ও ইসলামে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন।

উম্মুল মুমিনীন হজরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘আমি জান্নাতে প্রবেশ করলাম, তখন সেখানে পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত শুনতে পেলাম। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কে কোরআন তিলাওয়াত করছে? ফেরেশতারা উত্তর দিলো, এটি হজরত হারিসা ইবনে নু’মান (রা.)।’ এই কথা বলার পর রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘এটাই হচ্ছে ইহসান (সততা ও ভালো আচরণের প্রতিদান), এটাই হচ্ছে ইহসান (মায়ের সেবা ও সদ্ব্যবহারের ফল)।’ হজরত হারিসা ইবনে নু’মান (রা.) মায়ের প্রতি অত্যন্ত আন্তরিক সেবা ও সদ্ব্যবহারের জন্য সাহাবায়ে কেরামের মাঝে বিশেষভাবে প্রসিদ্ধ ছিলেন।

বর্ণিত আছে, একদিন হযরত মুসা (আ.) আল্লাহ তায়ালার কাছে জিজ্ঞেস করলেন, হে প্রভু, জান্নাতে আমার সাথী বা প্রতিবেশী কে হবে? আল্লাহ তায়ালা উত্তরে বললেন, ‘হে মুসা, সে একজন কসাই, যে অমুক গ্রামে বাস করে। এ কথা শুনে হজরত মুসা (আ.) সেই কসাইকে খুঁজতে বের হলেন, যাতে জানতে পারেন—কোন এমন বিশেষ কাজ বা আমল আছে, যার কারণে আল্লাহ তাকে এত মর্যাদা দিয়েছেন যে, একজন নবীর প্রতিবেশী বানিয়েছেন।

হজরত মুসা (আ.) কসাইয়ের খোঁজ পেলেন। কসাই লোকটি মুসা (আ.)-কে দেখে খুব সম্মানসহকারে নিজের ঘরে নিয়ে এলো। সেখানে হজরত মুসা (আ.) দেখলেন, কসাই লোকটি তার বৃদ্ধা মায়ের সেবা করছে অত্যন্ত ভক্তি, মমতা ও যত্নের সঙ্গে। লোকটি মায়ের মুখ পরিষ্কার করলো, তাকে সম্মানের সঙ্গে বসালো এবং নিজের হাতে খাবার খাওয়ালো। খাবার শেষে মা তাকে দোয়া দিলেন, ‘আল্লাহ তোমাকে জান্নাতে মুসা (আ.)-এর প্রতিবেশী বানাক।’ হজরত মুসা (আ.) তখন বুঝতে পারলেন যে, এই ব্যক্তি না কোনও বড় আলেম, না সুফি, না গাজী, না কোনও মুজাহিদ।

তবু সে জান্নাতে এমন উচ্চ মর্যাদা লাভ করেছে শুধু মায়ের খেদমত, আনুগত্য ও তার সঙ্গে সদ্ব্যবহারের বরকতে। আসলে এই ঘটনা আমাদের শেখায়, মায়ের প্রতি ভালোবাসা ও সেবাই এমন একটি আমল, যা মানুষকে নবীদের পাশে পৌঁছে দিতে পারে।

পবিত্র কোরআন ও হাদিসে মায়ের প্রতি সম্মান ও মর্যাদার অসংখ্য ঘটনা ও ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ আমাদের সকলকে মায়ের প্রতি উত্তম ও সদ্ব্যবহারের তাওফিক দান করেন। আমীন।