নারীর হেনস্থা রোধে ইসলামের শিক্ষা

নারীর হেনস্থা রোধে ইসলামের শিক্ষা

প্রতিকী ছবি।

পুরুষ ও নারী উভয়েই মহান আল্লাহর অনুপম সৃষ্টি। পৃথিবীর সবকিছুকে আল্লাহ তায়ালা জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করেছেন।তিনি ইরশাদ করেন, ‘প্রত্যেক বস্তুকে আমি জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করেছি, যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ করো’ (সুরা জারিয়াত : ৪৯)। সে সূত্রে মানুষকেও আল্লাহ তায়ালা নর-নারীতে বিভক্ত করে সৃষ্টি করেছেন। যাতে আমরা উপদেশ গ্রহণ করতে পারি। শিক্ষাগ্রহণের দৃষ্টিতে তাকালে যে কেউ দেখতে পাবে যে, পৃথিবীতে নর-নারী কারও অবদান কোনো অংশে কম নয়। প্রত্যেকের কর্ম ভিন্ন হলেও উভয়ের প্রয়োজন শতভাগ সমান। ভিন্ন কর্মে এক দেহের সব অঙ্গের প্রয়োজন যেমন সমান, পৃথিবীতে নর-নারীর প্রয়োজনও তেমনি সমান।

নারী-পুরুষের সমতার কথা উল্লেখ করে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নারীরা তোমাদের পরিচ্ছদ এবং তোমরা নারীদের জন্য পরিচ্ছদ স্বরূপ’ (সুরা বাকারা : ১৮৭)। অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে, ‘পুরুষের ওপর নারীরও তেমন অধিকার রয়েছে যেমন নারীর ওপর পুরুষের অধিকার রয়েছে’ (সুরা বাকারা : ২২৮)। আরও ইরশাদ হয়েছে, ‘পিতা-মাতা এবং আত্মীয়স্বজনের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে পুরুষের যেমন অংশ রয়েছে, নারীরও তেমন অংশ রয়েছে।

কমবেশি যাহোক এ অংশ নির্ধারিত’ (সুরা নিসা : ৭)। সুতরাং নারীর মর্যাদাকে খাটো করে দেখার কোনো সুযোগ না ইসলামে আছে, আর না বিবেক-বুদ্ধিতে আসে। কিন্তু আফসোসের বিষয় হলো, ইসলামের দৃষ্টিতে নারীর প্রয়োজনীয়তা, গুরুত্ব, অধিকার ও মর্যাদা আমাদের সামনে দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট হওয়া সত্ত্বেও সমাজে নারী নির্যাতন ও নিপীড়নের ঘটনা অহরহ ঘটেই চলেছে। ধর্ষণ-নারী নির্যাতন আর জিনা-ব্যভিচার যেন মহামারির রূপ ধারণ করছে।

ইসলামের অনুপম সৌন্দর্য হলো দ্বিপক্ষীয় অধিকারগুলোর ক্ষেত্রে উভয় পক্ষকে আলাদা আলাদা হেদায়েত ও পথনির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। 

 

উভয়কে বলেছে অধিকার নয়, দায়িত্ব সচেতন হও। প্রত্যেকে যখন আপন দায়িত্বে সচেতন হবে তখন অটোমেটিক জুলুম দূর হয়ে যাবে। তাই নারী নির্যাতন রোধেও ইসলাম দ্বিপক্ষীয় কিছু দায়িত্ব-কর্তব্য দিয়েছে। নারী-পুরুষ উভয়ে সচেতন হলে জুলুম বন্ধ হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।

মূল্যবান সম্পদ সংরক্ষণে দুনিয়ার নিয়ম যা ইসলামেও তা। অর্থাৎ গৃহাভ্যন্তরে তালাবদ্ধ রাখা। প্রয়োজনে দারোয়ান রাখা। ইসলামের দৃষ্টিতে একজন নারীর সম্ভ্রম সবচেয়ে দামি। এর সংরক্ষণে ইসলাম হিজাবের বিধান দিয়েছে। প্রয়োজনে অর্থাৎ দূরবর্তী সফরে মাহরাম পুরুষকে সঙ্গে নেবে। হিজাবের এক অর্থ হলো, নারী তার গায়রে মাহরাম পুরুষের সামনে দৈহিক সৌন্দর্য ঢেকে রাখবে। যে পোশাক পরলে দেহের আপাদমস্তক ঢেকে থাকে সে পোশাক পরিধান করা। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তারা যেন নিজেদের আভরণ প্রকাশ না করে তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র, স্বামীর পুত্র, ভ্রাতা, ভ্রাতুষ্পুত্র, ভগ্নীপুত্র, আপন নারীগণ, তাদের মালিকানাধীন দাসী, পুরুষদের মধ্যে যারা যৌন কামনা-রহিত পুরুষ এবং নারীদের গোপন অঙ্গ সম্বন্ধে অজ্ঞ বালক ব্যতীত অন্য কারও কাছে’ (সুরা নুর : ৩১)।

আরও ইরশাদ হয়েছে, ‘হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রী, কন্যা ও মুমিনদের নারীগণকে বলুন, তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দংশ নিজেদের ওপর টেনে দেয়। এতে তাদের চেনা সহজ হবে। ফলে তাদের উত্যক্ত করা হবে না। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু’ (সুরা আহজাব : ৫৯)। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন, ‘আল্লাহ তায়ালা মুমিন নারীদের আদেশ করেছেন, যখন তারা কোনো প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হবে তখন যেন মাথার ওপর থেকে ওড়না বা চাদর টেনে আপন মুখম-ল আবৃত করে। আর (চলাফেরার সুবিধার্থে) শুধু এক চোখ খোলা রাখে।’ (ফাতহুল বারি : ৮/৫৪, ৭৬, ১১৪)

আরও ইরশাদ হয়েছে, ‘তারা যেন গ্রীবা ও বক্ষদেশ মাথার কাপড় দ্বারা আবৃত করে’ (সুরা নুর : ৩১)। হিজাবের আরেক অংশ হলো, নারীরা তাদের কথা ও কর্মের আওয়াজ নিচু রাখবে। ইরশাদ হয়েছে, ‘তারা যেন তাদের গোপন আভরণ প্রকাশের উদ্দেশ্যে সজোরে পদক্ষেপ না করে। হে মুমিনগণ! তোমরা সবাই আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো’ (সুরা নুর : ৩১)। এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, পরপুরুষকে আকৃষ্ট করে এমন সব কাজ থেকে বিরত থাকা ঈমানদার নারীর কর্তব্য। কারণ পরপুরুষকে নূপুরের আওয়াজ শোনানোর উদ্দেশ্যে সজোরে পদবিক্ষেপ যখন নিষেধ করা হয়েছে তখন যেসব কাজ, ভঙ্গি ও আচরণ এর চেয়েও বেশি আকৃষ্ট করে তা নিষিদ্ধ হওয়া তো সহজেই বোধগম্য। মুসলিম নারীদের জন্য এটি আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

পর্দার আরেকটি অংশ হলো দৃষ্টির হেফাজত করা। ইরশাদ হয়েছে, (হে নবী!) মুমিন নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখে ও তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। তারা যেন সাধারণত যা প্রকাশ থাকে তা ছাড়া নিজেদের আভরণ প্রদর্শন না করে (সুরা নুর : ৩১)। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে সহিহ সনদে বর্ণিত আছে যে, ‘সাধারণত যা প্রকাশিত’ অর্থ হচ্ছে কাপড়। (তাফসিরে তাবারি : ১৮/১১৯)

নারীর সম্ভ্রম রক্ষায় নারীদের কর্তব্যের পাশাপাশি পুরুষদেরও কিছু কর্তব্য রয়েছে। যেমন, গায়রে মাহরাম নারীর প্রতি দৃষ্টিপাত না করা। ইরশাদ হয়েছে, (হে নবী) ঈমানদার পুরুষদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। এটাই তাদের জন্য উত্তম (সুরা নুর : ৩০)। গায়রে মাহরাম নারী থেকে কিছু চাওয়ার প্রয়োজন হলে পর্দার অন্তরাল থেকে চাইবে। ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা তাদের (নবী পত্নীদের) কাছে কিছু চাইলে পর্দার আড়াল থেকে চাও। এই বিধান তোমাদের ও তাদের হৃদয়ের জন্য অধিকতর পবিত্রতার কারণ।’ (সুরা আহজাব : ৫৩)

নারীদের কাছে যাতায়াত করা থেকে বিরত থাকা। ইরশাদ হয়েছে, ওকবা ইবনে আমের জুহানি (রা.)-এর সূত্রে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘তোমরা নারীদের কাছে যাওয়া থেকে বিরত থাকো। এক আনসারি সাহাবি আরজ করলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! স্বামী পক্ষীয় আত্মীয় সম্পর্কে আপনি কী বলেন? তিনি বললেন, সে তো মৃত্যু!’ (বুখারি : ৯/২৪২; মুসলিম, হাদিস : ২১৭২)। এই হাদিসে বেগানা নারী-পুরুষের একান্ত অবস্থানকে নিষেধ করা হয়েছে এবং এ প্রসঙ্গে স্বামী পক্ষীয় আত্মীয়স্বজন যেমন দেবর-ভাসুর ইত্যাদির সঙ্গে অধিক সাবধানতা অবলম্বনকে অপরিহার্য করা হয়েছে। নারী নির্যাতন রোধে এ ছিল ইসলামের প্রথম ব্যবস্থা। পারস্পরিক দায়িত্ব কর্তব্য পালনের মাধ্যমে জুলুম থেকে বাঁচা। এটাই হওয়া উচিত। দ্বিতীয় ধাপ হলো আইনের শাসন। ইসলামি আইনে প্রতিটি অপরাধের কার্যকরি শাস্তি আছে। ধর্ষণেরও আছে কার্যকরি শাস্তি।

নারীর সম্ভ্রম নষ্টকারী তথা নারীর প্রতি অবৈধ যৌন নির্যাতনকারীর জন্য ইসলাম সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান দিয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘ব্যভিচারী পুরুষ ও নারী; তাদের উভয়কে একশটি বেত্রাঘাত করো। আল্লাহর বিধান কার্যকর করণে তোমাদের মনে যেন দয়ার উদ্রেক না হয়, যদি তোমরা আল্লাহর প্রতি ও পরকালের প্রতি বিশ্বাসী হয়ে থাকো। আর মুসলমানদের একটি দল যেন তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে’ (সুরা নুর : ২)। হজরত মায়েজ (রা.)-এর ওপর ব্যভিচারের দায়ে প্রস্তরাঘাতে মৃত্যুদ- কার্যকর করা হয় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জামানায়। যা অনেক সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। যদিও একজন সাহাবি হয়েও অনৈতিক অপরাধের দায়ে তাঁর ওপর সর্বোচ্চ শাস্তি কার্যকর করা হয়েছিল, কিন্তু হজরত মায়েজ (রা.)-এর তওবা মহান আল্লাহর দরবারে কবুল হওয়ার ঘোষণা স্বয়ং রাসুলুল্লাহ (সা.) দিয়েছিলেন। এখানেই ইসলামের স্বাতন্ত্র্য যে একজন মর্যাদাপূর্ণ সাহাবি হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে বিচারিক দণ্ড থেকে মুক্তি দেওয়া হয়নি। আর সে কারণেই রাসুল (সা.)-এর যুগ ও খোলাফায়ে রাশেদার যুগ পৃথিবীর ইতিহাসে নারীর অধিকার সুরক্ষায় স্মরণীয় হয়ে থাকবে চিরকাল। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে দ্বীনের সঠিক বোঝ দান করুন।