আপু না স্যার— সম্বোধন বিভ্রাট
সংগ্রহীত ছবি
সম্বোধন নিয়ে জটিলতার ঘটনা বঙ্গমুল্লুকে একেবারে কম নয়। বরং, এটি আমাদের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের নিত্যসঙ্গী। একটি উপজেলার ইউএনও একজন নারী। তাঁকে ‘আপু’ ডাকায় তিনি ক্ষুব্ধ হয়েছেন।
‘আপু’ শব্দটি শুনতে মিষ্টি, ঘরোয়া, স্নেহময়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একজন সরকারি কর্মকর্তাকে ‘আপু’ বলে সম্বোধন করা যায় কি? হয়তো ‘স্যার’ ডাকলে তিনি বেশি স্বস্তি পেতেন। কিন্তু একজন নারীকে ‘স্যার’ বলা আদৌ সম্মানজনক কি না, সে প্রশ্নও অনিবার্য।
গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের অফিস-আদালত ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এক অদ্ভুত রীতি গড়ে উঠেছে, নারী বসকেও সবাই ‘স্যার’ বলে সম্বোধন করে।
কিন্তু এটি কি প্রকৃত সম্মান, নাকি আমাদের সামাজিক কাঠামোর গভীর কোনো অসংগতির প্রতিফলন? অনেকে যুক্তি দেন, ব্যক্তি নয়, চেয়ারকে ‘স্যার’ বলা হচ্ছে!
আমাদের সময় আমরা স্কুল-কলেজে নারী শিক্ষকদের ‘আপা’ বলে ডাকতাম, বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ম্যাডাম’। ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অবশ্য ‘মিস’ বা ‘ম্যাম’ চালু ছিল। কিন্তু কখনো কোনো আপা বা ম্যাডামকে ‘স্যার’ বলব, এমন চিন্তা মাথায় আসেনি। সময়ের ব্যবধানে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ‘আপা’ সম্বোধনটি হয়তো গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে, কিন্তু তার জায়গায় ‘স্যার’ বসানো কি স্বাভাবিক বিবর্তন?
সম্বোধনের জটিলতা ব্যক্তিগত পর্যায়েও অনর্থ ঘটায়।
কাকে কখন কী বলে সম্বোধন করতে হবে, এটা অনেক সময়েই আমরা বুঝে উঠতে পারি না। বাংলা ভাষার ব্যাকরণ ও সামাজিক স্তরবিন্যাস এখানে পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তোলে। আপনি, তুমি, তুই—ইংরেজিতে এর কোনো সমান্তরাল নেই। সেখানে ‘ইউ’ দিয়েই সব কাজ সারা যায়। বাংলা ভাষায় সে সুযোগ নেই।
এই বিভ্রাট যে কতটা বিব্রতকর হতে পারে, তার অম্ল-মধুর অভিজ্ঞতা আছে আমার। একবার ‘তুই’ বলে সম্বোধন করায় এক ছোট ভাই ভয়ানক রেগে গিয়েছিল। প্রথমে বুঝতেই পারিনি। পরে সুযোগ বুঝে সে সোশ্যাল মিডিয়ায় আমার ঘাড় মটকাতে যাচ্ছিলো। ইজ্জত বাঁচাতে তখন একে-ওকে ধরে কোনোমতে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছিলাম।
বিপরীতধর্মী ঘটনাও আছে। বহুদিন পর এক ছোট ভাইয়ের সঙ্গে দেখা। আবেগে সে জড়িয়ে ধরল, কোলাকুলি করলো। স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ায় বললাম, “ভাই আমার, কেমন আছো? অনেকদিন পর দেখা! চেহারা আগের চেয়ে আরো ভালো হয়েছে।” ভেবেছিলাম, সে খুশি হবে। কিন্তু তার মুখ ভার। কিছুক্ষণ পর বললো, “ভাইয়া, আপনি আমাকে চিনতে পারেননি। চেনার ভান করছেন।” কারণ? বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আমি তাকে ‘তুই’ করে বলতাম! তখন গা বাঁচাতে বলতে হলো, “বড় হয়ে গেছিস, তাই আর তুই বললাম না।” সরি-টরি দিয়ে কোনোমতে রক্ষা।
পশ্চিমে সম্বোধনের বিষয়টি তুলনামূলকভাবে সহজ। পরিচিতদের প্রথম নামে ডাকা হয়। অপরিচিত হলে বা আনুষ্ঠানিক ক্ষেত্রে শেষ নামে Mr., Mrs., Miss, Dr. যুক্ত হয়। আদালত বা সামরিক বাহিনীতে নির্দিষ্ট ডেকোরাম থাকলেও ব্যক্তিজীবন ও প্রশাসনে নাম ধরে ডাকাটাই রেওয়াজ। সেকারণে বিলেতের প্রধানমন্ত্রীকে নাম ধরে ডাকলে তিনি গোস্বা করেন না। কিন্তু বাংলাদেশে যদি কালীগঞ্জের ইউএনওকে ‘মিস ...’ বলা হয়, তা কি তিনি স্বাভাবিকভাবে নেবেন? কিংবা কোনো সচিবকে নাম ধরে ডাকলে? মোটেই নয়। আমাদের আমলাতন্ত্র ‘স্যার’ শুনতেই অভ্যস্ত।
ব্রিটেনে বা ইউরোপে কোনো নারীকে ‘স্যার’ বলা হলে তিনি অপমানিত বোধ করবেন। সেখানে পুরুষ ‘স্যার’, নারী ‘ম্যাডাম’ বা ‘ম্যাম’। আন্তর্জাতিক পরিসরে কোনো নারীকে ‘স্যার’ বলা ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক—দুই দিক থেকেই ভুল। এতে আপনি হয় ভাষা বোঝেন না, নয়তো সংস্কৃতি, এই ধারণাই তৈরি হবে। বাংলাদেশে নারীকে ‘স্যার’ বলার রীতি মূলত স্বৈরতান্ত্রিক প্রশাসনিক সংস্কৃতির ফসল এবং সংকীর্ণ মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, একজন নারীকে পুরুষের উপাধিতে ডাকলে তার ব্যক্তিত্বে আঘাত লাগার কথা, অথচ তা নিয়ে আমাদের নারীরা ভাবেই না।
আসলে নারীকে ‘স্যার’ বলা পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার একটি বিকৃত পন্থা। ক্ষমতাকে আমরা এখনো পুরুষালি ধারণা হিসেবেই দেখি। তাই কোনো নারী ক্ষমতার আসনে বসলে তাকে পুরুষের ভাষায় স্বীকৃতি দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। যেন অবচেতনভাবে বলি, ক্ষমতা মানেই পুরুষ, আর সম্মান পেতে হলে নারীকে সেই ভাষাই ধার করতে হবে।
কিন্তু ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়। ভাষা মানসিকতা তৈরি করে, সংস্কৃতি বহন করে। নারীদের ‘স্যার’ বলা একদিকে ভাষাগতভাবে ভুল, অন্যদিকে এটি নারীর স্বতন্ত্র পরিচয় ও মর্যাদাকে অস্বীকার করার সূক্ষ্ম প্রক্রিয়া। সম্মান দিতে যদি একজন নারীকে পুরুষের উপাধি ধার করতে হয়, তবে সেই সম্মান কতটা পূর্ণ? এতে বরং এ ধারণাটিই আরও শক্তিশালী হয় যে, নেতৃত্ব এবং কর্তৃত্ব সহজাতভাবে পুরুষালি বৈশিষ্ট্য। যুক্তরাষ্ট্রের সমস্ত আইন প্রণেতাদের যদি ‘কংগ্রেসম্যান’ বলে ডাকা হয়, তাহলে কংগ্রেসের নারী সদস্যরা নিশ্চয়ই সমান মর্যাদা অনুভব করবেন না, বরং পুরুষতান্ত্রিকতার উচ্ছিষ্ট ভোগে লজ্জায় পড়বেন বলেই আমি বিশ্বাস করি। নারীর ক্ষমতায়ন ও মর্যাদা সমুন্নত কারার লক্ষ্য UN Women-এর নির্দেশিকায় সে কারণে পুরুষালি শব্দ নয়, লিঙ্গনিরপেক্ষ ও সম্মানজনক সম্বোধন ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ইংরেজি ভাষার ব্যবহারে, আগে পুরুষবাচক বিশেষ্য ও সর্বনামকে সাধারণ বা সার্বজনিক অর্থে ব্যবহার করা হতো। এই চর্চা ১৯৭০ সালের দিকে নারীবাদীদের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। পরবর্তীতে নারীবাদী ভাষাবিদরা সফলতার সাথে সকল লিঙ্গ ও লিঙ্গপরিচয়ের মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করতে সক্ষম এমন লিঙ্গনিরপেক্ষ ভাষার ব্যবহারকে সামনে এগিয়ে নিয়ে আসে। ফলশ্রুতিতে আমরা Chairperson, Businessperson, Humankind-এর মতো অনেক লিঙ্গনিরপেক্ষ শব্দের ব্যবহার বাড়তে দেখি।
আমার মনে হয়, নতুন করে ভাববার সময় এসেছে। হয়তো একজন ‘আপু’ আমাদের সেই ভাবনার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। অন্তত মেয়েদের ‘স্যার’ বলে ডাকার এই হাস্যকর ও অসংগত রীতিটি নিয়ে প্রশ্ন তোলার সময় এখনই।
লেখক: আইনজীবী, রাজনীতিবিদ ও কলামিস্ট