যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ঋত্বিক ঘটকের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন

যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ঋত্বিক ঘটকের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন

সংগ্রহীত ছবি

নিউ ইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের ইথাকায় অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় বিদ্যাপীঠ (অন্যতম আইবেলিক বিশ্ববিদ্যালয়) কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলার কিংবদন্তি চলচ্চিত্রকার ঋত্বিক ঘটকের এক অভূতপূর্ব জন্মশতবার্ষিকী উদযাপিত হয়েছে। 

গত বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাংগুয়েজ রিসোর্স সেন্টারে নিউ ইয়র্ক সময় সকাল ১০টায় এই ব্যতিক্রমধর্মী উদযাপন অনুষ্ঠিত হয়। দুই পর্বে বিভক্ত অনুষ্ঠানের প্রথম ভাগে ছিল ‘নির্বাসিত জীবনের স্মৃতি ও মানব চেতনার শেষ আশ্রয় : ঋত্বিক ঘটক ও থিও এঞ্জেলোপোলাসের তুলনামূলক পাঠ’ শীর্ষক সেমিনার।

দ্বিতীয় পর্বে ছিল ঋত্বিকের কালজয়ী ছবি ‘মেঘে ঢাকা তারা’র সঙ্গীত নিয়ে পুনর্বিবেচনা ও সঙ্গীত-পরিবেশনা।

পুরো অনুষ্ঠান একই সঙ্গে ভার্চুয়ালি সম্প্রচারিত হওয়ার কারণে বিপুলসংখ্যক শিক্ষক শিক্ষার্থী এবং সিনেমাপিপাসু দর্শক বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকেও অংশগ্রহণ করেছেন।

কর্নেলের বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাংগুয়েজ রিসোর্স সেন্টার ও ব্রিটেনভিত্তিক সাংস্কৃতিক সংস্থা সৌধ সোসাইটি অব পোয়েট্রি এন্ড ইন্ডিয়ান মিউজিকের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই উদযাপনের সেমিনার-পর্বে মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্য ও সংস্কৃতি ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাকালীন পরিচালক, কবি ও ঔপন্যাসিক অধ্যাপক শামীম রেজা।

চলচ্চিত্র সমালোচক ও ল্যাংগুয়েজ রিসোর্স সেন্টারের শিক্ষাক্রম সমন্বয়ক ড. আহমেদ শামীমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেমিনারে মূল প্রবন্ধকার অধ্যাপক শামীম রেজা গ্রিক চলচ্চিত্রকার থিও ও বাঙালি চলচ্চিত্রকার ঋত্বিকের সিনেমায় মাইগ্রেশন, পার্টিশন ইত্যাকার অনুষঙ্গের ভেতর উদ্বাস্তু মানুষের এপোক্যালিপ্টিক রিয়েলিটি ও অস্তিত্ব সঙ্কটের স্বরূপ উন্মোচনে ব্রতী হন। এইসব দার্শনিক অনুষঙ্গের গভীরতা আরো নিবিড়ভাবে উদঘাটনের জন্যে ঋত্বিকের সিনেমার পাশাপাশি প্রতীচ্যের বিভিন্ন সিনেমার প্রসঙ্গও তিনি উত্থাপন করেন।

তিনি ‘সুবর্ণরেখা’ চলচ্চিত্রে সীতা চরিত্রের উদ্বাস্তু জীবনের সঙ্গে বাল্মিকীর রামায়ণের সেই পরাধীন সম্রাজ্ঞী অপহৃতা সীতার তুলনামূলক আলোচনা করেন।

‘ইউলিসিস গেইজ‘ এ মূলত (আলেকজান্ডার) চরিত্রের যে বলকান দেশগুলো উদ্বাস্তু ‘এ’ চরিত্রের যুদ্ধ বিধ্বস্ত বলকান অঞ্চল ভ্রমণ যেমন হোমারের ওডিসিয়াসের ইউলিসিসে দেশ থেকে দেশে যুদ্ধ থেকে দেশে ফেরার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে তুলনামূলক আলোচনা করেন।

সেমিনারে মূল আলোচক কবি ও চিকিৎসাবিজ্ঞানী অধ্যাপক সেজান মাহমুদ সেমিনার-প্রবন্ধ ও সেমিনারের থীমকে ‘জরুরি ও অভূতপূর্ব’ আখ্যা দিয়ে বলেন, আজকের আধুনিক মানুষের সঙ্কটের স্বরূপ বোঝার জন্যে আমরা বারবার এই উদ্বাস্তু মানুষের গল্পগুলো, সিনেমাগুলো পাঠ এবং পুনর্পাঠ করতে হবে। একই সঙ্গে জর্জিও আগামবেন এবং জগতের অস্তিত্ববাদী দার্শনিকদের তত্ত্বগুলোও এসব সিনেমার বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যাখ্যা বা ভাষ্য নির্মাণে কতটা জরুরি ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারে তা নিয়েও আলোকপাত করেন।

বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত ঔপন্যাসিক সালমা বাণী তাঁর আলোচনায় নিজের লেখা উপন্যাস ‘ইমেগ্রেশন‘ উদ্বাস্তু মানুষের জীবন বাস্তবতা ও ঋত্বিকের সিনেমার বিবিধ প্লট ও চরিত্র ইত্যাকার অনুষঙ্গ টেনে মূল্যবান বক্তব্য উপস্থাপন করেন।

কবি ও সৌধ পরিচালক টি এম আহমেদ কায়সার বলেন, নীটশের ঈশ্বরবিহীন বিশ্বে জগতের সকল আধুনিক মানুষই একই সঙ্গে উদ্বাস্তু এবং শোচনীয়ভাবে নিঃসঙ্গ। তাই উদ্বাস্তু মানুষ নিয়ে সিনেমা প্রকারান্তরে আধুনিক মানুষের জটিল সঙ্কটের সঙ্কেতবাহী দ্যোতকপুঞ্জ। তিনি বলেন, থিও এঞ্জেলোপোলসের ‘ইটার্নিটি এন্ড এ ডে’ সিনেমায় গ্রীক কবি দিওনিসিস সলমসের কবিতা ও ঋত্বিক ঘটকের ‘মেঘে ঢাকা তারা’ সিনেমায় সিলেটের কবি ইদম শাহের গান ‘মন তোমায় কেবা পার করে’-তে উদ্বাস্তু জীবনের যে পার্থিব ও আধ্যাত্মিক সঙ্কটের ইঙ্গিত বিধৃত হয়েছে, এই রূপকল্পের অন্তর্নিহিত মর্ম ও মগ্ন মৌনতা বিশ্লেষণে এক্ষুণি তৎপর হতে হবে কারণ এতেই লুকিয়ে আছে অনেক সঙ্কটের উত্তরও। মিখাইল বাখতিন, তাঁর ক্রনোটোপ তাঁর দ্বিরালাপ তত্ত্ব এক্ষেত্রে আমাদের সবচেয়ে সহায়ক হয়ে উঠতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

দ্বিতীয়পর্বে ঋত্বিকের ‘মেঘে ঢাকা তারা’ সিনেমায় ব্যবহৃত সঙ্গীত, প্রাসঙ্গিক ভাষ্যসহ পরিবেশন করেন বহির্বিশ্বে কিরানা ঘরানার শীর্ষ শাস্ত্রীয় সঙ্গীতশিল্পী চন্দ্রা চক্রবর্তী। তিনি ‘মেঘে ঢাকা তারা’ সিনেমায় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত বিশেষত রাগ হংসধ্বনি গাওয়া কিংবদন্তীতুল্য শিল্পী পন্ডিত এ কাননের সঙ্গীত শিষ্যা। ফলে পন্ডিত এ কাননের ঋত্বিক সংশ্লিষ্টতা নিয়ে তাঁর স্মৃতিচারণ এবং ‘মেঘে ঢাকা তারা’র দৃশ্য-বিন্যাসের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে তাঁর কণ্ঠে গাওয়া রাগ ভাটিয়ার ও হংসধ্বনি ঋত্বিক উদযাপনে যোগ করে এক নতুন মাত্রা।