নারীর প্রতি বিদ্বেষের জবাব হবে ব্যালটে

নারীর প্রতি বিদ্বেষের জবাব হবে ব্যালটে

ফাইল ছবি

মনে আছে গত বছর মার্চ মাসে নারী হেনস্থার সেই ঘটনাটা? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এক ছাত্রীকে ‘ওড়না পরা’ নিয়ে প্রকাশ্যে হেনস্তার অভিযোগ উঠলে গ্রেফতার করা হয় মোস্তফা আসিফ অর্ণব নামের এক ব্যক্তিকে। কিন্তু পরদিনই তিনি জামিনে মুক্তি পান। এই ঘটনাকে কেউ কেউ “দুঃখজনক বিচ্ছিন্ন ঘটনা” বলে এড়িয়ে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু মোহাম্মদপুর, কক্সবাজার, সদরঘাট—এক বছরের মধ্যেই যেসব জায়গায় নারীরা মবের মতো ভয়ংকর আক্রমণের শিকার হয়েছেন, তাতে স্পষ্ট হয় যে ঘটনাগুলো মোটেই বিচ্ছিন্ন কিছু নয়।

বরং এটা কাঠামোগত।

ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো বলেছিলেন—“Power is not something that is acquired, seized, or shared, but something that circulates.” ক্ষমতা কেবল রাষ্ট্র বা পুলিশের হাতে সীমাবদ্ধ থাকে না; ক্ষমতা ছড়িয়ে থাকে ভাষায়, আচরণে, নজরে, রাস্তায়, ক্যাম্পাসে। একজন নারীকে ‘ওড়না পরো’ বলে থামিয়ে দেওয়া আসলে শারীরিক আক্রমণের চেয়েও বড় কিছু—এটা তার দেহের ওপর সামাজিক ক্ষমতা কায়েম করার চেষ্টা। এই বিদ্বেষ শুধু ব্যক্তিগত নৈতিকতার ব্যর্থতা নয়; এটা দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ভাষ্য থেকে জন্ম নেওয়া এক শাসনব্যবস্থা।

এই নারীবিদ্বেষ রাস্তায় থামে না। এটা রাজনীতির কেন্দ্রে ঢুকে পড়েছে। সম্প্রতি জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের কর্মজীবী নারীদের নিয়ে দেওয়া ‘নারীবিদ্বেষী ও অবমাননাকর’ বক্তব্যের বিরুদ্ধে ১১টি সংগঠন নির্বাচন কমিশনে স্মারকলিপি দিয়েছে। তারা বক্তব্য প্রত্যাহার, নিঃশর্ত ক্ষমা এবং তার প্রার্থিতা বাতিলের দাবি জানিয়েছে।

স্মারকলিপিতে বলা হয়েছে, তার ভেরিফায়েড এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্ট থেকে করা মন্তব্য সংবিধানস্বীকৃত সমতা ও মানবাধিকারের পরিপন্থী; এতে নারীর শ্রম, মর্যাদা ও সামাজিক ভূমিকা অস্বীকার করা হয়েছে। দলটি ‘হ্যাকিং’-এর অজুহাত দিলেও কোনো নিরপেক্ষ তদন্ত বা বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ হাজির করতে পারেনি।

এখানেই ফুকোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা প্রাসঙ্গিক—“truth is produced by power.” ক্ষমতাবানরা যখন ধর্ম, সংস্কৃতি বা নৈতিকতার ভাষায় কথা বলে, তখন সেই কথাই ‘সত্য’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে চায়। নারীর কাজকে অবৈধ বা অশালীন বলা আসলে নারীকে নয়—নারীর স্বাধীনতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার কৌশল। জুলাই ২০২৪-এর অভ্যুত্থানে নারীরা ছিলেন সম্মুখসারির যোদ্ধা।

ছাত্রী, নারী শিক্ষক, কর্মজীবী নারী, গৃহিণী—সবাই রাস্তায় নেমেছিলেন। গুলি, লাঠি, টিয়ার গ্যাসের মুখে দাঁড়িয়ে তারা শুধু নিজেদের নয়, পুরুষ সহযোদ্ধাদেরও আগলে রেখেছেন। অনেকেই বলেন, নারীরা যদি রাস্তায় না নামতেন, আন্দোলন এতটা সফল হতো না। তাদের অবদান কোনো অংশে কম ছিল না—বরং অনেক ক্ষেত্রে বেশি।
তবু paradox এখানেই: বাংলাদেশে নারী ভোটার পুরুষের চেয়ে বেশি, কিন্তু রাজনীতিতে নারীর প্রতিনিধিত্ব নামমাত্র। যোগ্য নারী নেত্রী থাকা সত্ত্বেও ধর্মভিত্তিক দলগুলো ধর্মের দোহাই দিয়ে বলে—নারীরা দলীয় প্রধান হতে পারবেন না।

ফরাসি দার্শনিক সিমন দ্য বোভোয়ার বহু আগেই এই দ্বিচারিতার মূলে আঘাত করেছিলেন। তিনি লিখেছিলেন—“One is not born, but rather becomes, a woman.” নারী হওয়া কোনো জৈবিক নিয়তি নয়; এটা একটি রাজনৈতিক নির্মাণ। সমাজ নারীকে এমনভাবে ‘গড়ে তোলে’ যেন সে নেতৃত্বের জন্য নয়, অনুসরণের জন্য জন্মেছে। অথচ বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। বাংলাদেশের খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা, পাকিস্তানের বেনজির ভুট্টো, ইন্দোনেশিয়ার মেগাওয়াতি সুকর্ণোপুত্রী, তুরস্কের তানসু চিলার—এঁদের সফলতা ও ব্যর্থতা আছে, ঠিক পুরুষ নেতাদের মতোই। ধর্ম কখনো তাদের নেতৃত্বের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। বাধা হয়েছে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা আর ক্ষমতা হারানোর ভয়।

সংসদে সংরক্ষিত নারী আসন দীর্ঘদিন নারীদের রাজনীতি থেকে বঞ্চিত রাখার ক্ষতিপূরণ হিসেবে জরুরি। কিন্তু এর অপব্যবহার বন্ধ করাও সমান জরুরি। রুয়ান্ডায় ২৪টি আসন নারীদের জন্য সংরক্ষিত—ফলে সেখানে সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব প্রায় ৬১ শতাংশ, যা বিশ্বে সর্বোচ্চ। উগান্ডা, তানজানিয়া, পাকিস্তান, ইরাক, জর্ডানেও একই ব্যবস্থা আছে। এসব কোটা নারী প্রতিনিধিত্ব বাড়ায়, কিন্তু সঠিক কাঠামো না থাকলে তা টোকেনিজমে পরিণত হয়—যেখানে নারী থাকে, কিন্তু ক্ষমতা থাকে না।

সিমন সতর্ক করেছিলেন—“Representation of the world, like the world itself, is the work of men.” যতদিন রাজনীতির কাঠামো, নিয়ম আর ভাষা পুরুষের হাতে থাকবে, ততদিন নারী শুধু সংখ্যায় বাড়বে—ক্ষমতায় নয়। নারীরা যদি রাস্তায় গুলি-লাঠি খেয়ে আন্দোলন জিতিয়ে দিতে পারে, তাহলে রাজনীতিতে তাদের পূর্ণ অংশগ্রহণের অধিকার কেন দেওয়া হবে না? এটা আর ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক প্রশ্ন নয়—এটা ন্যায়, সমতা ও গণতন্ত্রের প্রশ্ন।

এখন সময় এসেছে ধীরে ধীরে টোকেনিজম বন্ধ করার। এই কাজ একমাত্র নির্বাচন কমিশনই করতে পারে। প্রত্যেক রাজনৈতিক দলকে নির্দিষ্ট পরিমাণ নারী ও অধিকারবঞ্চিত প্রার্থীর প্রতিনিধিত্ব দিতে বাধ্য করতে হবে। কোনো দল যদি নারীদের দলীয় প্রধান হতে সাংগঠনিক বাধা সৃষ্টি করে, তবে তাকে পশ্চাদগামী ও বৈষম্যমূলক আচরণের দায়ে নির্বাচনের যোগ্যতা হারানোর মতো শাস্তি দেওয়ার কথাও ভাবতে হবে।

এবার নারীরা অনেক কিছু থেকেই বঞ্চিত হয়েছে—যার ক্ষতিপূরণ কোনো সরকারই পুরোপুরি দিতে পারবে না। জানি না, আগামীর সরকার দেবে কিনা। কিন্তু আপাতত একটি শক্তিশালী জবাব আমাদের হাতে আছে—ব্যালট। সকল নারীবিদ্বেষের সকল জবাব দেয়ার সুযোগ আছে ১২ ফেব্রুয়ারি ব্যালটে।

লেখক:
প্রাবন্ধিক, চলচ্চিত্র নির্মাতা
ই-মেইল: anarjomurshid@gmail.com