সর্বদা ইস্তেগফার: আল্লাহর নৈকট্য ও সংকটমুক্ত জীবনের চাবিকাঠি
ছবি: সংগৃহীত
মানুষ হিসেবে আমরা প্রতিনিয়ত ছোট-বড় নানা ভুল ও পাপাচারের সম্মুখীন হই। এই বিচ্যুতিগুলো আমাদের মহান আল্লাহর রহমত থেকে দূরে সরিয়ে দেয় এবং জীবনে অস্থিরতা নামিয়ে আনে। এই দূরত্ব ঘুচিয়ে আল্লাহর ভালোবাসা ও নৈকট্য লাভের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম হলো ‘ইস্তেগফার’ বা আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা। ইস্তেগফার কেবল গুনাহ মাফের উপায় নয়, বরং এটি দুনিয়া ও আখেরাতের সব সমৃদ্ধি ও সাফল্যের এক অনন্য ঐশ্বরিক চাবিকাঠি।
আল্লাহর নির্দেশ ও নবীজি (স.)-এর সুন্নাহ
ইস্তেগফার করা খোদ মহান আল্লাহর নির্দেশ। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাও। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা বাকারা: ১৯৯) অন্য আয়াতে এসেছে, ‘আর তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা চাও।’ (সুরা হুদ: ৩) আমাদের প্রিয়নবী হজরত মুহাম্মদ (স.) ছিলেন মাসুম বা নিষ্পাপ। তা সত্ত্বেও তিনি মহান আল্লাহর বিনয়ী বান্দা হিসেবে প্রতিদিন ৭০ বারেরও বেশি তওবা ও ইস্তেগফার করতেন। (সহিহ বুখারি: ৬৩০৭)
গুনাহ মাফ ও আল্লাহর দয়া লাভ
গুনাহ হয়ে গেলে হতাশ না হয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইলে তিনি তা মার্জনা করে দেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর কেউ কোনো মন্দ কাজ করে অথবা নিজের প্রতি জুলুম করে পরে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করলে আল্লাহকে সে ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু পাবে।’ (সুরা নিসা: ১১০) ইস্তেগফারের মাধ্যমে বান্দার হৃদয়ের মরিচা দূর হয় এবং সে আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহভাজন হয়।
বিপদাপদ থেকে সুরক্ষা ও আজাবের ঢাল
ভয়াবহ বিপদ বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ অনেক সময় মানুষের পাপের শাস্তি হিসেবে আসে, আবার কখনো এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষাও হতে পারে। তবে ইস্তেগফার এই কঠিন সময়গুলোতে রক্ষা পাওয়ার শক্তিশালী ঢাল। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘এবং আল্লাহ এমনও নন যে, তারা ক্ষমা প্রার্থনা করবে (ইস্তেগফার করবে) অথচ তিনি তাদেরকে শাস্তি দেবেন।’ (সুরা আনফাল: ৩৩) অর্থাৎ যতক্ষণ কোনো জনপদে ইস্তেগফারের আমল জারি থাকে, ততক্ষণ সেখানে আল্লাহর ব্যাপক আজাব নাজিল হয় না।
দুশ্চিন্তা মুক্তি ও সংকীর্ণতা থেকে উদ্ধার
বর্তমান সময়ের মানসিক অস্থিরতা ও দুশ্চিন্তা দূর করার অব্যর্থ উপায় হলো ইস্তেগফার। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি নিজের জন্য ‘ইস্তেগফার’ আবশ্যক করে নেবে, আল্লাহ তাকে সব দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি দেবেন, সব সংকীর্ণতা থেকে উদ্ধার করবেন এবং তাকে এমনভাবে জীবিকার ব্যবস্থা করবেন যা তার চিন্তার বাইরে।’ (সুনানে নাসায়ি: ৩৮১৯)
রিজিকে বরকত ও জাগতিক সমৃদ্ধি
মানুষের পাপের কারণে অনেক সময় তার জন্য বরাদ্দকৃত রিজিক থেকে সে বঞ্চিত হয়। (ইবনে মাজাহ: ৪০২২) ইস্তেগফার বান্দাকে পরিশুদ্ধ করে তার রিজিকের বন্ধ দুয়ার খুলে দেয়। সুরা হুদ-এ আদ জাতির প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, যদি তোমরা তওবা ও ইস্তেগফার করো, তাহলে আল্লাহ যথাসময়ে বৃষ্টি বর্ষণ করবেন এবং তোমাদের শক্তি ও জনবল বৃদ্ধি করে দেবেন। (সুরা হুদ: ৫২) মুস্তাদরাকে হাকেম-এর বর্ণনামতে, ইস্তেগফারকারীকে আল্লাহ অকল্পনীয় উৎস থেকে রিজিক দান করেন। (হাদিস নং: ৭৬৭৭)
আখেরাতে জান্নাত ও বিশেষ মর্যাদা
আল্লাহর জান্নাতি বান্দাদের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো তারা শেষ রাতে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায়। সুরা আলে ইমরানে (১৫-১৭) এর বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, প্রতি রাতের শেষ তৃতীয়াংশে মহান আল্লাহ দুনিয়ার আসমানে অবতরন করে ঘোষণা করেন- ‘কে আছে আমার কাছে ক্ষমা চাইবে? আমি তাকে ক্ষমা করব।’ (সহিহ বুখারি: ১১৪৫) যারা এই সময়ে ইস্তেগফার করে, আল্লাহ তাদের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করবেন।
এই সামগ্রিক বাস্তবতা থেকেই প্রতীয়মান হয়- ইস্তেগফার খুবই মূল্যবান ইবাদত, যা মানুষকে সর্বদা বিনয়ী থাকতে শেখায় এবং আল্লাহর প্রতি অটুট আস্থা তৈরি করে।
ইস্তেগফারের সংক্ষিপ্ত ও সহজ কিছু বাক্য
- আস্তাগফিরুল্লাহ (আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই)।
- আস্তাগফিরুল্লাহা রাব্বি মিন কুল্লি জাম্বিও ওয়া আতুবু ইলাইহি।
- আস্তাগফিরুল্লাহাল্লাজি লা ইলাহা ইল্লা হুয়াল হাইয়্যুল কাইয়্যুমু ওয়া আতুবু ইলাইহি।
ইস্তেগফার হলো মুমিনের জীবনের রক্ষাকবচ। এটি আখেরাতের পাথেয়। তাছাড়া দুনিয়ার অভাব-অনটন, রোগ-শোক ও পেরেশানি দূর করার এক মহৌষধ। তাই আসুন, আমাদের জিহ্বাকে সব সময় আল্লাহর জিকির ও ইস্তেগফারে সিক্ত রাখি।