কোনো রাজনৈতিক দলের সহিংস আচরণ সহ্য করা হবে না : প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস
সংগ্রহীত ছবি
নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের কোনো ধরনের সহিংস আচরণ, কেন্দ্র দখল, ভোটে প্রভাব বিস্তার করা কিংবা উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না বলে স্পষ্ট জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস।
মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণে তিনি বলেন, “রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আমি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলতে চাই—আপনারা দলের কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সর্বস্তরের নেতা-কর্মীদের দ্ব্যর্থহীনভাবে নির্দেশ দিন, যেন কেউ কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা, সহিংসতা, ভয়ভীতি প্রদর্শন, কেন্দ্র দখল, ভোটে প্রভাব বিস্তার করা কিংবা উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত না হয়। কেউ যেন সোশ্যাল মিডিয়া বা অন্য কোনোভাবে গুজব না-ছড়ায়। রাষ্ট্র কোনোভাবেই এ ধরনের আচরণ সহ্য করবে না।
”
তিনি বলেন, “ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয়—একটি ত্রুটিপূর্ণ, প্রশ্নবিদ্ধ বা সহিংসতাপূর্ণ নির্বাচন শেষ পর্যন্ত কারো জন্যই মঙ্গল বয়ে আনে না। বরং দেশের সর্বনাশ ডেকে আনে। যারা জনগণের মতামত উপেক্ষা করে শক্তি ও অনিয়মের মাধ্যমে ক্ষমতায় থাকতে চেয়েছে, তারা সবাই শেষ পর্যন্ত জনগণের আদালতে কঠিন জবাবদিহিতার মুখোমুখি হয়েছে।”
অধ্যাপক ইউনূস বলেন, “নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ করতে সরকার সর্বোচ্চ প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে।
এবার রেকর্ডসংখ্যক আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতাসম্পন্ন সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদেরও ব্যাপকভাবে দায়িত্বে রাখা হয়েছে, যাতে যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা সহিংসতা দ্রুত ও কঠোরভাবে প্রতিহত করা যায়। আমি গভীরভাবে বিশ্বাস করি তাঁরা সকলেই ঈমান, দেশপ্রেম ও কর্তব্য নিষ্ঠায় উজ্জীবিত হয়ে তাঁদের উপর অর্পিত মহান দায়িত্ব সুষ্ঠু ও সুচারু রূপে পালন করবেন।”
প্রধান উপদেষ্টা আরো বলেন, ‘প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে প্রথমবারের মতো সারা দেশে ব্যাপক পরিসরে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে।
ভোটকেন্দ্রে দায়িত্বরত কর্মকর্তারা শরীরের সঙ্গে সেঁটে রাখা ক্যামেরা ব্যবহার করছেন। নিরাপত্তা ও নজরদারিতে ড্রোন ও ডগ স্কোয়াড ব্যবহারের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। এসব ব্যবস্থার একমাত্র লক্ষ্য—ভোটাররা যেন নির্ভয়ে, নিশ্চিন্তে ও সম্মানের সঙ্গে তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন।”
তিনি বলেন, “এই নির্বাচনকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার জন্য কিছু ঐতিহাসিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। প্রথমবারের মতো প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে।
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বসবাসকারী আমাদের ভাই-বোনেরা দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে অংশগ্রহণ করতে পারছেন—এটি আমাদের গণতন্ত্রের পরিসরকে আরও বিস্তৃত করেছে। আমাদের এই নতুন অভিজ্ঞতা অন্যান্য দেশে প্রচলনের জন্য ইতোমধ্যে কয়েকটি দেশ আগ্রহ প্রকাশ করেছে এবং আমাদের অভিজ্ঞতার প্রতিটি ধাপ তারা পর্যবেক্ষণ করছে।”
তিনি বলেন, “একই সঙ্গে দেশে অবস্থানরত সরকারি কাজে নিয়োজিত ব্যক্তি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এবং আইনি হেফাজতে বা কারাগারে থাকা যোগ্য নাগরিকদের জন্য পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট প্রদানের সুযোগ দেয়া হয়েছে। এটি প্রমাণ করে—রাষ্ট্র কাউকে বাদ দিয়ে নয়, সবাইকে সঙ্গে নিয়েই এগোতে চায়।”
ভোটাধিকার বিষয়ে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, “ভোটাধিকার কারো দয়া নয়; এটি আমাদের সংবিধানপ্রদত্ত মৌলিক অধিকার। এই অধিকার প্রয়োগের মাধ্যমেই আমরা ঠিক করি, আমাদের ভবিষ্যৎ কোনো পথে যাবে। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব।”
প্রধান উপদেষ্টা উল্লেখ করেন, “ইতোমধ্যে আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা শেষ হয়ে গেছে। এখন আমাদের সবার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পালা।
এবারের নির্বাচনকে ঘিরে সার্বিক প্রচার-প্রচারণা পূর্ববর্তী যেকোনো নির্বাচনের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে শান্তিপূর্ণ হয়েছে। মত ও আদর্শের পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক দলগুলো সংযম দেখিয়েছে, প্রার্থীরা দায়িত্বশীল আচরণ করেছেন এবং সাধারণ মানুষ সচেতন থেকেছেন। এই পরিবেশ হঠাৎ করে তৈরি হয়নি—এটি সম্মিলিত দায়িত্ববোধের ফল” । এ জন্য তিনি দেশের সকল রাজনৈতিক দল, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী, ভোটার, নির্বাচন কমিশন, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিবৃন্দ, গণমাধ্যমকর্মী এবং নির্বাচনের সাথে সংশ্লিষ্ট সকল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের প্রতিটি সদস্যকে ধন্যবাদ জানান।
তিনি বলেন, “আপনাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমরা একটি আশাব্যঞ্জক পরিবেশে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছাতে পেরেছি।”
প্রধান উপদেষ্টা আরো বলেন, “তবে এই শান্তিপূর্ণ পরিবেশের মাঝেও আমাদের হৃদয়ে গভীর বেদনার ছায়া রয়েছে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর এবং প্রচার-প্রচারণাকালে সংঘটিত কয়েকটি সহিংস ঘটনায় আমরা কিছু মূল্যবান প্রাণ হারিয়েছি। এই সহিংসতা আমাদের জাতীয় বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে। গণতন্ত্রের চর্চায় কোনো প্রাণ ঝরে যাওয়া—কোনো সভ্য রাষ্ট্রের জন্যই গ্রহণযোগ্য নয়।”
অধ্যাপক ইউনূস উল্লেখ করেন, “এবারের নির্বাচনে ৫১টি দল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে, যা এ যাবৎকালের যেকোনো নির্বাচনের মধ্যে সর্বাধিক সংখ্যক রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ। স্বতন্ত্রসহ মোট প্রার্থীর সংখ্যা দুই হাজারেরও বেশী। আগের জাতীয় নির্বাচনগুলোতে এর চেয়ে বেশি প্রার্থী প্রায় কখনোই দেখা যায়নি।”
তিনি বলেন, “এবারের নির্বাচন শুধু আরেকটি নিয়মিত নির্বাচন নয়। এটি একটি গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের প্রথম জাতীয় নির্বাচন। দীর্ঘ সময় ধরে জমে থাকা ক্ষোভ, বৈষম্য, বঞ্চনা ও অবিচারের বিরুদ্ধে জনগণের যে জাগরণ আমরা দেখেছি, এই নির্বাচন তার সাংবিধানিক প্রকাশ। রাজপথের সেই দাবি আজ আপনাদের ব্যালটের মাধ্যমে উচ্চারিত হতে যাচ্ছে। তাই এই নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রায় একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক।”
তিনি আরো বলেন, “এই নির্বাচনের মাধ্যমে আমরা শুধু জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করছি না—একই সঙ্গে আমরা সিদ্ধান্ত নিচ্ছি, বাংলাদেশ কোন পথে এগোবে। আমরা কি একটি বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গড়তে পারব, নাকি আবারও পুরোনো ক্ষমতাকেন্দ্রিক ও অনিয়ন্ত্রিত বৃত্তে ফিরে যাব—এই প্রশ্নের উত্তর দেবে গণভোট।”
প্রধান উপদেষ্টা সকল প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, “নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক না কেন, ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জাতির বৃহত্তর স্বার্থকে প্রাধান্য দিন। বিজয় যেমন গণতন্ত্রের অংশ, তেমনি পরাজয়ও গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য সত্য। নির্বাচনের পর সবাই মিলে একটি নতুন, ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করুন।”