দেশব্যাপী জোরদার নিরাপত্তা, সতর্ক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী

দেশব্যাপী জোরদার নিরাপত্তা, সতর্ক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী

সংগ্রহীত ছবি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে আজ বৃহস্পতিবার। অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ভোট নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশন (ইসি) দেশব্যাপী নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। গত রবিবার থেকে সেনাবাহিনীসহ সব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাঠে কাজ শুরু করেছে। তারা আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নির্বাচনী এলাকায় দায়িত্ব পালন করবেন।

নির্বাচনী আচরণবিধি প্রতিপালন ও অপরাধ দমনে সারা দেশে নিয়োজিত আছেন এক হাজার ৫১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট।

পরিস্থিতি অনুকূলে: ইসি

জ্যেষ্ঠ নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ জানিয়েছেন, নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কমিশন সন্তুষ্ট। 

সাংবাদিকদের তিনি বলেন, মাঠপর্যায়ের বর্তমান অবস্থা ভোটের জন্য পুরোপুরি সহায়ক। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বৈঠকে তারা আশ্বস্ত করেছেন যে দেশের পরিস্থিতি সন্তোষজনক এবং নির্বাচন নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করা সম্ভব।

ইসি সূত্র জানায়, সেনাবাহিনী আগে থেকেই মাঠে থাকলেও এখন তাদের কার্যক্রম আরও জোরদার করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তাদের সঙ্গে সমন্বয় করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দায়িত্ব পালন করবে। কেন্দ্রীয় সমন্বয় সেল সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবে এবং ডিজিটাল ‘সুরক্ষা’ অ্যাপের মাধ্যমে তথ্য আদান-প্রদান হবে।

প্রায় ৯ লাখ সদস্যের মোতায়েন

এবারের নির্বাচনে মোট ৮ লাখ ৯৭ হাজার ১১৭ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য দায়িত্বে থাকবেন।

বাহিনীভিত্তিক সংখ্যা হলো— বাংলাদেশ সেনাবাহিনী : ১ লাখ, নৌবাহিনী : ৫ হাজার, বিমানবাহিনী : ৩ হাজার ৭৩০ (এর মধ্যে স্থলভাগে ১ হাজার ২৫০), পুলিশ : ১ লাখ ৮৭ হাজার ৬০৩, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী : ৫ লাখ ৭৬ হাজার ৩১৪, বিজিবি : ৩৭ হাজার ৪৫৩, কোস্টগার্ড : ৩ হাজার ৫৮৫, র‍্যাব : ৭ হাজার ৭০০, এ ছাড়া জরুরি সেবা নিশ্চিত করতে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ১৩ হাজার ৩৯০ সদস্য প্রস্তুত থাকবে।

ভ্রাম্যমাণ আদালত ও তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা

সারা দেশে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ১ হাজার ৫১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। ভোটকেন্দ্রের ভেতরে বা বাইরে কোনো অভিযোগ কিংবা সহিংসতা ঘটলে ‘নির্বাচনী সুরক্ষা’ অ্যাপের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক বার্তা পৌঁছে যাবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে। দ্রুত হস্তক্ষেপের ব্যবস্থা থাকবে এবং বডি-ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহার করা হবে।

প্রয়োজনে কেন্দ্রে সেনাবাহিনী

আগের জাতীয় নির্বাচনে সেনাবাহিনী মূলত স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও এবার গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ সংশোধনের মাধ্যমে তিন বাহিনীকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার আওতায় আনা হয়েছে।

ফলে প্রয়োজন হলে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরাও ভোটকেন্দ্রে অন্যান্য বাহিনীর মতো দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। সেনাবাহিনীকে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে।

প্রথমবার ড্রোনের ব্যবহার

এবারের নির্বাচনে প্রথমবারের মতো ৪১৮টি ড্রোন ব্যবহারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে—

সেনাবাহিনী : ২০০, নৌবাহিনী : ১৬, বিজিবি : ১০০, পুলিশ : ৫০, কোস্টগার্ড : ২০, র‍্যাব : ১৬, আনসার ও ভিডিপি : ১৬, এসব ড্রোন সমন্বিতভাবে ব্যবহার করা হবে। পাশাপাশি বিভিন্ন বাহিনীর ডগ স্কোয়াডও প্রস্তুত থাকবে।

ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র ১৬,৩৫৯

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা ১৬ হাজার ৩৫৯। সাধারণ কেন্দ্র রয়েছে ১৭ হাজার ৬৫৬টি। ঢাকা মহানগরীতে ৩৭টি কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে ডিএমপি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, মহানগর এলাকার বাইরে সাধারণ কেন্দ্রে ১৬–১৭ জন এবং ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে ১৭–১৮ জন সদস্য মোতায়েন থাকবেন। মহানগরে সাধারণ কেন্দ্রে ১৬ এবং ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে ১৭ জন দায়িত্ব পালন করবেন। দুর্গম ঘোষিত ২৫ জেলার নির্দিষ্ট কেন্দ্রে ১৬–১৮ জন সদস্য থাকবেন। ভোটের দুদিন আগে থেকে ভোটগ্রহণ শেষ হওয়া পর্যন্ত তারা দায়িত্বে থাকবেন।

বিমানবাহিনীর বিশেষ প্রস্তুতি

দুর্গম ও উপকূলীয় এলাকায় দ্রুত নজরদারি ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী হেলিকপ্টার ও ড্রোন প্রস্তুত রেখেছে। ভোলাসহ উপকূলীয় চরাঞ্চলে নৌবাহিনীর সঙ্গে যৌথভাবে হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হবে। জরুরি প্রয়োজনে নির্বাচনী সরঞ্জাম পরিবহন ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে বিমানবাহিনী স্ট্যান্ডবাই থাকবে।

সীমান্তে কড়া নজরদারি

সারা দেশে ১ হাজার ২১০ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন রয়েছে। প্রায় ৩৫ থেকে ৩৭ হাজার সদস্য ৬৪ জেলার ৪৯৫ উপজেলার মধ্যে ৪৮৯টিতে দায়িত্ব পালন করছেন। ভারত ও মিয়ানমার সীমান্তসহ সব সীমান্ত এলাকায় চোরাচালান, মাদক ও অস্ত্রপাচার ঠেকাতে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। ড্রোন, বডি-ওর্ন ক্যামেরা, হেলিকপ্টার ও ডগ স্কোয়াড ব্যবহার করা হচ্ছে। কুইক রেসপন্স ফোর্স (কিউআরএফ) ও র‌্যাপিড অ্যাকশন টিম (র‌্যাট) প্রস্তুত রয়েছে। দুর্গম পার্বত্য এলাকাতেও হেলিকপ্টারের সহায়তায় বিশেষ চৌকি ও ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে।

উপকূলীয় এলাকায় নিরাপত্তা

ভোলা, হাতিয়া, সন্দ্বীপ, কক্সবাজার ও সেন্টমার্টিনসহ উপকূলীয় ও দ্বীপাঞ্চলে নিরাপত্তা নিশ্চিতে নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের জাহাজ মোতায়েন রয়েছে। নৌবাহিনীর পাঁচ হাজার এবং কোস্টগার্ডের তিন হাজার সদস্য সেখানে দায়িত্ব পালন করবেন।

সব মিলিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে দেশজুড়ে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে, যাতে ভোটাররা নির্বিঘ্নে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন।