রাজনৈতিক ক্ষমতা ও ভীতিমুক্ত আমলা
সংগ্রহীত ছবি
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী ছাড়াও দেশের সচেতন নাগরিক বিশেষ করে উপমহাদেশের বাংলাদেশ নামক এই টেরিটরির মানুষদের পরম্পরায় যে চেতনা ধাবমান বা প্রবহমান আছে তা হচ্ছে অন্যায়, অরাজকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, সরব সোচ্চারতা। ইসলাম ধর্মমতে যার সক্রিয় সমর্থন আছে। যেহেতু কোরআন, হাদিস মোতাবেক অন্যায়ের বিরুদ্ধে শারীরিকভাবে বাধাদানকারীকে প্রথম শ্রেণির ইমানদার, বাক্যবাণে বাধাদানকারীকে দ্বিতীয় শ্রেণির ইমানদার, অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরবে ঘৃণা করাকে তৃতীয় শ্রেণির ইমানদার হিসেবে অভিহিত করা হয়। প্রথম এবং দ্বিতীয় শ্রেণির ইমানদার হতে গেলে স্বীয় ব্যক্তি, পরিবার, গোষ্ঠীকে স্বাবলম্বী, স্বাধীন হতে হয়।
তাই অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্যতা ইমানের আধিক্য, গরিবি, দরিদ্রতা ইমানহীনতার দাবানল।
অটোমান সাম্রাজ্য সুলতানি আমলের পর থেকেই এ অঞ্চলের মানুষ অন্যায়বিরোধী, স্বাধীনচেতা। সে কারণেই কায়েমি স্বার্থবাদীরা সুপরিকল্পিত উপায়ে এ অঞ্চলের মানুষকে গরিব রাখতে চেয়েছে। ইসলাম ধর্মমতে, দরিদ্রতার কারণে মজবুত ইমান কচুপাতার পানিতুল্য টলে পড়ে যায়।
গাজীপুরস্থ টিএমএসএস অ্যাপারেলস নামক গার্মেন্টসের বস্তিতে বসবাসকারী গার্মেন্টস কর্মীদের সঙ্গে বাক্যালাপে তার চাক্ষুষ প্রমাণ পেয়েছি। এ অঞ্চলে বালাকোটের যুদ্ধ, হাজী শরীয়তুল্লাহর নেতৃত্বে¡ বিদ্রোহ, তিতুমীরের বাঁশের কেল্লার বিদ্রোহ, ফকির বিদ্রোহ অসংখ্য সংগ্রামের ইতিহাস গৌণ হওয়ার উপাদান যদি ১৯৪৭, ১৯৭১ এবং ২০২৪-এর বিদ্রোহ হয়ে থাকে সেটাও আমাদের ভাবিয়ে তোলে। তাই আমাদের সংস্কৃতি থেকে সব ন্যায়-ন্যায্য চাওয়াপাওয়া বিদ্রোহ যেন বিদুরিত না হয়, এজন্যই শরিফ ওসমান হাদি ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার স্থাপন করেছেন। তাঁর সঙ্গে আমার মুখোমুখি কথা না হলেও ফোনে কথা বলে তাঁর মনোভাব যা বুঝেছিলাম, তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কখনোই একাকার হতে পারবেন না, তাঁর দর্শন তাঁকে অমিশ্রিতই রাখবে।
ভাগ্যের নির্মম পরিহাস তাঁর রোপিত বৃক্ষ বিকশিত হওয়ার আগেই তাঁকে দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে হলো। প্রিয় পাঠক, কায়েমি স্বার্থবাদীরা এ অঞ্চলের মানুষকে গরিব রেখে তাদের গরিমা রাজ্য বহাল রাখার জন্য দুর্নীতিকে সুকৌশলে দোর্দণ্ড প্রতাপে পালন করেন।
এজন্য মুখ্য শক্তি রাজনৈতিক দলগুলোকে দুর্নীতিতে আকৃষ্ট করে, দুর্বল করে। মানুষকে গরিব রাখার অন্যতম উপাদান দুর্নীতিকে দুর্বল অপরাধ গণ্য করা। যে দুর্নীতির দ্বারা সম্পদ অপচয় হয়, সম্পদ পাচার হয়, মানুষ প্রলুব্ধ হয়, মানুষের ইবাদত আরাধনা বিফলে যায়, মানুষের ন্যায় চেতনা নিঃশেষ হয়, যার ফলে মানুষের মানবতা, মূল্যবোধ জলাঞ্জলি হয়, মানুষ এবং পশুর মধ্যে পার্থক্য থাকে না, সৃষ্টিকর্তা, আল্লাহর ঘোষণা মানুষ শ্রেষ্ঠ জীব কথাটি অসাড় হয়ে পড়ে, কায়েমি স্বার্থবাদীদের শক্তি, সমৃদ্ধতা বাড়ে।
সুবিধাবঞ্চিত উত্তরবঙ্গের উত্তর বগুড়ায় জন্ম নেওয়া টিএমএসএসের মূলমন্ত্র গরিবি হটানো। গরিবি হটাতে পারলে মানুষ সৃষ্টির সেরাতে পরিণত হবে। কাজটি জটিল, কঠিন, চ্যালেঞ্জিং। কায়েমি স্বার্থবাদীরা দারিদ্র্যবিমোচন কাজে রত জনবল এমনকি বেতনভুক্ত জনবলের মানবিক গুণাবলি নিম্নগামী করার জন্য নানা কৌশলে তাদের বিপথগামী করছে। এককভাবে এবং পারিবারিকভাবে অর্থশালী, বিত্তবান হয়ে জাতিকে পেছনে ফেললে ব্যক্তি বিত্ত টেকসই হবে না। এই চিন্তাচেতনা দেশের মানুষের মনে দানা বাঁধতে দিচ্ছে না। ফলে দেশপ্রেম থাকছে না।
দেশপ্রেম না রাখার অন্যতম কর্মকৌশল, প্ল্যাটফর্ম হচ্ছে রাজনৈতিক দল। সে কারণেই বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বলতেন, ‘ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়’। বর্তমানে তত্ত্বটি রিভার্স হয়েছে। তাই এ বছর বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগ এবং তাদের সাথি দল নির্বাচনে না এলেও ৫১টি দল ২০২৬ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছে। নির্বাচনের অন্যতম আওয়াজ দুর্নীতিকে দূর করার বাণী হালে পানি পাচ্ছে না। লস অব ন্যাচারালিটি তত্ত্ব মোতাবেক কোনো নেতিবাচক বিষয় চরমে উঠতে দিলে তার চূড়ান্ত আঘাত জুলাই অপেক্ষাও বেশি জ্বলন্ত হবে। সেজন্য বাংলাদেশের সব নাগরিকের বিবেকের অনুশাসন বাড়াতে হবে। বিবেককে বড় আদালত গণ্য করে অগ্রসর না হলে বিপদগ্রস্ত হতে হবে।
প্রত্যেক স্বাধীন রাষ্ট্রের-১) নির্বাহী বিভাগ (এক্সিকিউটিভ অথরিটি) যা বেসামরিক এবং সামরিক আমলা দ্বারা চলে, ২) লেজিসলেটিভ অথরিটি, যা রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সংসদ দিয়ে চলে, ৩) ল এমপোজিং অথরিটি বা বিচার বিভাগ, যা জুডিশিয়ারি, বিচারক দ্বারা চলে। এ তিনটি বিভাগের মুখ্য কর্তৃত্বকারকরা সুশাসনে ভূমিকা পালন করতে পারে। কোনো দৈবদুর্বিপাকজনিত কারণে এ তিন বিভাগের লেজিসলেটিভ বিভাগ, রাজনৈতিক সরকার নিষ্ক্রিয় হলে, না থাকলেও আমলা দ্বারা দেশ চলমান বা অগ্রসর হতে পারে। কিন্তু আমলারা যদি কারও অনুগত হয়, ভয়ভীতিতে বিভ্রান্ত হয় সে দেশ শক্তিশালী হতে পারে না। সেজন্য আমলাদের সব সময়ই প্রভাবমুক্ত নিরপেক্ষ রাখা জাতির কল্যাণে সচেষ্ট থাকতে হয়। অভিজ্ঞ আমলাদের মুখে শুনেছি, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এ বিষয়ে খুব কঠোর ছিলেন। স্বৈরাচার এরশাদও নাকি আকুণ্ঠ ছিলেন। ফলে তাঁর জনপ্রিয়তার কারণেই বাংলাদেশকে প্রেসিডেন্টশিয়াল ফর্ম থেকে সংসদীয় ফর্মে আনা হয়েছিল এবং এই এক ব্যক্তিই জেলবন্দি অবস্থায় পাঁচটি আসনে নিরঙ্কুশ বিজয়, সামরিক সর্বাধিনায়ক, রাষ্ট্রপ্রধান, পার্টিপ্রধান, সংসদীয় রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধি, রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় থাকাবস্থায় স্বাভাবিক মৃত্যু এবং গণদাবিতে জন্মভূমিতে সমাধি। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ সরল মানুষকে স্বীকৃতি দেয়, ভালোবাসে। নিজকে ভালোবাসতে চাইলে নীতি অনুসরণে অনুশাসনাধীন থাকলে, দেশের সেবা করলে সম্পদ লোভী হওয়ার প্রয়োজন নেই। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সময়কাল যতই বৃদ্ধি পাচ্ছে আমলাদের আমলনামায় অনিয়ম, অনুগততা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা পরিবর্তন না হলে অর্জন অধরা থাকবে। সাধু সাবধান।
লেখক : প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক, টিএমএসএস. ইমেইল : es@tmss-bd.org