ডিজিএফআইয়ের সাবেক ডিজি মামুন রিমান্ডে
সংগৃহীত ছবি
রাজধানীর মিরপুর থেকে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) সাবেক মহাপরিচালক (ডিজি) লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বুধবার গভীর রাতে মিরপুর ডিওএইচএস এলাকার একটি বাসা থেকে ১/১১-এর অন্যতম এ কুশীলবকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। গতকাল তাকে জুলাই গণ অভ্যুত্থানে রাজধানীর মিরপুরে দেলোয়ার হোসেন হত্যা মামলায় সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করে আদালতে পাঠানো হয়। আদালত শুনানি শেষে তার পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। শেখ মামুন খালেদের বিরুদ্ধে ডিজিএফআইকে রাজনৈতিক কাজে সম্পৃক্ত করা, জঙ্গি নাটকের প্রবক্তা, দুর্নীতির মাধ্যমে জলসিঁড়ি আবাসনের শতকোটি টাকা আত্মসাৎ, আয়নাঘরের রূপকার এবং সজীব ওয়াজেদ জয়ের ক্ষমতা অপব্যবহার করে হাজার কোটি টাকা অবৈধভাবে উপার্জনের অভিযোগ রয়েছে। এর আগে গত সোমবার গভীর রাতে বারিধারা ডিওএইচএস থেকে ২০০৭-০৮ সময়ের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ের আলোচিত সাবেক সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করে ডিবি। তাকে গত মঙ্গলবার মানব পাচারের মামলায় পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেওয়ার এক দিন পরেই তখনকার আরেক প্রভাবশালী সাবেক সেনা কর্মকর্তা শেখ মামুনকে গ্রেপ্তার করা হলো। শেখ মামুন খালেদকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম জানান, বুধবার রাতে সাড়ে ১২টার দিকে সাবেক সেনা কর্মকর্তা শেখ মামুন খালেদকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাকে বৈষম্যবিরোধী মামলার সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করে আদালতে পাঠানো হয়। আদালত সূত্র জানায়, মিরপুরে দেলোয়ার হোসেন নামে একজনকে হত্যার ঘটনায় করা মামলায় তার পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. সিদ্দিক আজাদের আদালত শুনানি শেষে এ আদেশ দেন। এদিন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের এসআই কফিল উদ্দিন আসামিকে আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। রাষ্ট্রপক্ষে রিমান্ডের পক্ষে শুনানি করেন ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট ওমর ফারুক ফারুকী। অন্যদিকে আসামির পক্ষে রিমান্ড বাতিলের আবেদন জানিয়ে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট নজরুল ইসলাম খান পাখি। উভয় পক্ষের যুক্তি উপস্থাপনের পর আদালত পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই বিকালে মিরপুর ১০ নম্বর ফলপট্টি এলাকায় ছাত্র-জনতার আন্দোলনে দেশি অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে আওয়ামী লীগের ৫০০-৭০০ নেতা-কর্মী হামলা চালায়। এ সময় শেখ মামুন খালেদের আদেশে আন্দোলনকারীদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালানো হয়। সেদিন গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন দেলোয়ার হোসেন। গত ২১ জুলাই শ্যামলীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় শেখ মামুন খালেদের জড়িত থাকার বিষয়ে পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ও পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী রিমান্ডের পক্ষে শুনানিতে বলেন, এ আসামি ১/১১-এর সময়কার কুশীলবদের একজন। তখন তিনি ডিজিএফআইয়ে কর্মরত ছিলেন। সে সময় এ আসামি ব্যবসায়ী রাজনৈতিক নেতাদের বন্দি করে কোটি টাকা হাতিয়ে নেন এবং হেনস্তা করেন। পরবর্তী সময়ে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় আনতে যারা সহযোগিতা করছিল তার মধ্যে তিনি একজন। যার পুরস্কার স্বরূপ তিনি ডিজিএফআই প্রধান হন। তারপর তিনি আয়নাঘর তৈরি করেন। যেখানে গান পাউডার দিয়ে মানুষ পুড়িয়ে মারাসহ নানা অপরাধ করেন। এ ছাড়াও জলসিঁড়ি প্রকল্পের কোটি টাকা হাতিয়ে নেন। এ কারণে ইতোমধ্যে আদালত স্ত্রীসহ তার বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেন। পিপি আরও বলেন, তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে ক্যান্টনমেন্ট থেকে এক কাপড়ে বের করে দেন মামুন খালেদ। এ জন্য তদন্তের স্বার্থে তাকে রিমান্ডে নেওয়া হোক।
জানা গেছে, ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি সেনা সমর্থিত সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ঘটনার সময় শেখ মামুন কুমিল্লায় কর্নেল হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ওই বছরের ডিসেম্বরে তিনি ডিজিএফআইতে পরিচালক (এফএসআইবি) হিসেবে যোগ দেন। পরে ২০০৮ সালের জুনে তিনি ব্রিগেডিয়ার চৌধুরী ফজলুল বারির স্থলাভিষিক্ত হয়ে পরিচালকের (কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর-সিআইবি) দায়িত্ব পালন করেন। পরে তিনি লেফটেন্যান্ট জেনারেল মোল্লা ফজলে আকবরের উত্তরসূরি হিসেবে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ২০১১ সালে মহাপরিচালক (ডিজি) হিসেবে ডিজিএফআইতে ফিরে আসেন এবং দেড় বছর ডিজিএফআইয়ের ডিজি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়াও তিনি ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজের কমান্ড্যান্ট এবং বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিএউপি) উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। অবৈধভাবে শেয়ার ব্যবসা, ক্ষমতার অপব্যবহার, বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে সাবেক এই সেনা কর্মকর্তার বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অনুসন্ধান শুরু করে প্রায় দেড় বছর আগে।
গত বছরের ২২ মে শেখ মামুন খালেদ, তার স্ত্রী নিগার সুলতানা খালেদ, কর কমিশনার আবু সাঈদ মো. মুস্তাক এবং জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই)-এর সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল টি এম জোবায়েরের ভায়রা ভাই খন্দকার আবুল কাইয়ুমের বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা দেন আদালত। দুদকের পৃথক দুটি আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ জাকির হোসেন গালিব ওই আদেশ দেন। বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞার আবেদনে বলা হয়, শেখ মামুন খালেদের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে শেয়ার ব্যবসা, ক্ষমতার অপব্যবহার, বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে অনুসন্ধান চলছে।