ছেলের ইমামতিতে পটিয়া মাদরাসার মহাপরিচালকের জানাজা
সংগ্রহীত ছবি
দক্ষিণ চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী দ্বিনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আল জামিয়া আল ইসলামিয়া পটিয়া মাদরাসার মহাপরিচালক, প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও শিক্ষাবিদ আল্লামা মুফতি মাওলানা আবু তাহের কাসেমী নদভী (রহ.)-এর নামাজে জানাজা শেষে তাকে দাফন করা হয়েছে।
সোমবার (৩০ মার্চ) রাত সাড়ে ১১টায় পটিয়া মাদরাসা মাঠে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত হাজার হাজার আলেম-উলামা, শিক্ষার্থী, রাজনীতিবিদ, ভক্ত ও সাধারণ মুসল্লির ঢল নামে। পুরো মাদরাসা প্রাঙ্গণ পরিণত হয় এক শোকাহত জনসমুদ্রে।
জানাজার নামাজে ইমামতি করেছেন আল্লামা মুফতি মাওলানা আবু তাহের কাসেমী নদভীর ছেলে মাওলানা মুহাম্মদ হাসান।
জানাজা শেষে তাকে মাদরাসা সংলগ্ন কবরস্থানে দাফন করা হয়। এসময় উপস্থিত মুসল্লিদের কান্না আর দোয়ার মধ্য দিয়ে শেষ বিদায় জানানো হয় প্রিয় এ আলেমকে।
এর আগে সোমবার দুপুর ১টা ৪০ মিনিটে চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।
মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৬৮ বছর।
জানাজায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থী ও ভক্তরা আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, হুজুর আমাদের জন্য শুধু একজন শিক্ষক ছিলেন না, তিনি ছিলেন পিতৃতুল্য অভিভাবক। তার ইন্তেকালে আমরা যেন এতিম হয়ে গেলাম।
প্রবীণ এ আলেমের মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন ধর্ম মন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ, ভূমি মন্ত্রণালয় ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর হেলাল উদ্দিন, পটিয়ার সংসদ সদস্য মোহাম্মদ এনামুল হক এনাম, বাশঁখালীর সংসদ সদস্য মাওলানা জহিরুল ইসলাম, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মোহাম্মদ ইদ্রিস মিয়া, এয়াকুব গ্রুপের চেয়ারম্যান শিল্পপতি এম এয়াকুব আলী, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা জামায়াতে ইসলামির আমির আনোয়ারুল আলম চৌধুরী, শেভরন ক্লিনিক্যাল ল্যাবের চেয়ারম্যান ডা. ফরিদুল আলম, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির আল্লামা শাহ মহিবুল্লাহ বাবুনগরী, মহাসচিব আল্লামা শায়খ সাজিদুর রহমান প্রমুখ।
পৃথক পৃথক শোক বার্তায় তারা বলেন, আল্লামা আবু তাহের নদভীর ইন্তেকাল শুধু পটিয়ার নয়, পুরো দেশের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। তিনি ছিলেন একজন প্রজ্ঞাবান আলেম ও সমাজ গঠনের কারিগর। তাঁর শূন্যতা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। মুফতি আবু তাহের নদভী ছিলেন নীরব সাধক, যিনি আজীবন দ্বিনি শিক্ষার প্রসারে নিজেকে উৎসর্গ করেছেন। তাঁর আদর্শ আমাদের জন্য পথপ্রদর্শক হয়ে থাকবে।
উল্লেখ্য, আল্লামা আবু তাহের নদভী (রহ.)-এর মৃত্যুতে ইতোমধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় অঙ্গনের নেতৃবৃন্দ গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তারা বলেন, তার ইন্তেকাল দেশের দ্বিনি অঙ্গনের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।
দীর্ঘ শিক্ষাজীবন ও কর্মজীবনে তিনি অসংখ্য ছাত্র গড়ে তুলেছেন এবং আল জামিয়া আল ইসলামিয়া পটিয়াকে দেশের অন্যতম শীর্ষ দ্বিনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। একজন নীরব সাধক ও প্রজ্ঞাবান আলেমের বিদায়ে শোকাহত পটিয়াবাসী। তবে তার রেখে যাওয়া জ্ঞান, আদর্শ ও দিকনির্দেশনা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পথ দেখাবে এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।
আল্লামা মুফতি মাওলানা আবু তাহের কাসেমী নদভী ১৯৬০ সালে চট্টগ্রাম জেলার ফটিকছড়ি উপজেলার উত্তর নিচিন্তাপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম নাজির আহমদ। শৈশবেই তিনি পারিবারিক পরিবেশে দ্বিনি শিক্ষার সূচনা করেন।
শিক্ষা জীবনে তিনি নানুপুর, জামিয়া ইউনুসিয়া এবং আল জামিয়া আল ইসলামিয়া পটিয়ায় অধ্যয়ন করেন। ১৯৮০ সালে দাওরায়ে হাদিস এবং ১৯৮১ সালে ইফতা সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে উচ্চশিক্ষার জন্য ভারত ও পাকিস্তানে সফর করেন। দারুল উলুম দেওবন্দে পুনরায় দাওরায়ে হাদিস সম্পন্ন করেন এবং নদওয়াতুল উলামায় আরবি ভাষা ও সাহিত্যে উচ্চতর শিক্ষা লাভ করেন।
শিক্ষাজীবন শেষে মাওলানা আবু তাহের আল জামিয়া আল ইসলামিয়া পটিয়ায় শিক্ষকতা শুরু করেন। সেখানে হাদিস ও আরবি সাহিত্যের শিক্ষক হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি তিনি প্রশাসনিক দায়িত্বেও নিয়োজিত ছিলেন এবং দারুল ইকামার নাজিম হিসেবেও কাজ করেছেন।
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি আল জামিয়া আল ইসলামিয়া পটিয়ার মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরে ২০২৫ সালের অক্টোবরে তিনি আঞ্জুমানে ইত্তেহাদুল মাদারিস বাংলাদেশের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এ ছাড়া তিনি হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের সহসভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।