মসজিদে প্রবেশের সময় যেসব ভুল আমরা প্রায়ই করে থাকি

মসজিদে প্রবেশের সময় যেসব ভুল আমরা প্রায়ই করে থাকি

ফাইল ফটো

মসজিদ পৃথিবীর সর্বোত্তম স্থান। একজন মুমিনের জীবনে মসজিদের গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, সঠিক জ্ঞানের অভাব বা অসচেতনতার কারণে মসজিদে প্রবেশ ও অবস্থানের সময় আমরা এমন কিছু ভুল করে বসি, যা মসজিদের পবিত্রতা নষ্ট করে এবং আমাদের ইবাদতের সওয়াব কমিয়ে দেয়।
মসজিদে প্রবেশের সময় প্রচলিত কিছু ভুল ও এ বিষয়ে শরিয়তের নির্দেশনা নিচে তুলে ধরা হলো-

আদব ও সুন্নাহর পরিপন্থী ভুল

১. ডান পায়ের বদলে বাঁ পায়ে প্রবেশ করা
মসজিদে প্রবেশের সুন্নাহ পদ্ধতি হলো ডান পা আগে দেওয়া এবং বের হওয়ার সময় বাঁ পা আগে দেওয়া। অনেকেই তাড়াহুড়োয় এ বিষয়টি খেয়াল করেন না। মসজিদে প্রবেশের সময় দোয়া পড়াও সুন্নাহ- اللَّهُمَّ افْتَحْ لِي أَبْوابَ رَحْمَتِكَ অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আমার জন্য আপনার রহমতের দরজাগুলো খুলে দিন।’ (সহিহ মুসলিম: ৭১৩)

২. ‘তাহিয়্যাতুল মসজিদ’ আদায় না করা
মসজিদে প্রবেশ করে বসার আগে দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করা সুন্নাহ। অনেকেই সরাসরি বসে পড়েন, যা এই গুরুত্বপূর্ণ আমল থেকে বঞ্চিত করে। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ মসজিদে প্রবেশ করলে দুই রাকাত নামাজ না পড়া পর্যন্ত যেন না বসে।’ (সহিহ বুখারি: ৪৪৪; সহিহ মুসলিম: ৭১৪)

ব্যক্তিগত ও পরিবেশগত পরিচ্ছন্নতা

৩. দুর্গন্ধযুক্ত অবস্থায় মসজিদে প্রবেশ করা
বিড়ি-সিগারেট খেয়ে কিংবা কাঁচা পেঁয়াজ-রসুন খেয়ে সেই দুর্গন্ধ নিয়ে মসজিদে প্রবেশ করা অনুচিত। এতে মুসল্লিদের কষ্ট হয় এবং ফিরিশতারাও বিরক্ত হন। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘মানুষ যে জিনিসে কষ্ট পায়, ফেরেশতারাও তাতে কষ্ট পায়।’ (সহিহ মুসলিম: ৫৬৪)

৪. জুতা-স্যান্ডেল এলোমেলোভাবে রাখা
মসজিদের প্রবেশমুখে জুতা-স্যান্ডেল বিশৃঙ্খলভাবে রাখা অন্য মুসল্লিদের চলাচলে বিঘ্ন ঘটায়। পরিচ্ছন্নতা ও শৃঙ্খলা ইসলামের অবিচ্ছেদ্য অংশ। রাসুলুল্লাহ (স.) সর্বদা সুন্দর ও সুশৃঙ্খল পরিবেশ পছন্দ করতেন।

নামাজ ও মুসল্লিদের প্রতি সম্মান

৫. জামাত ধরতে দৌড়ে প্রবেশ করা
ইকামত শুরু হয়ে গেলে বা জামাত দাঁড়িয়ে গেলে অনেকেই দৌড়ে মসজিদে প্রবেশ করেন। এটি সুন্নাহবিরোধী আচরণ। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘নামাজের জন্য আসো প্রশান্তি ও স্থিরতা নিয়ে; তাড়াহুড়ো করো না। যতটুকু পাবে তা আদায় করো, আর যা ছুটে যাবে তা পূর্ণ করো।’ (সহিহ বুখারি: ৬৩৬)

৬. নামাজির সামনে দিয়ে যাতায়াত করা
মসজিদে ঢুকে সামনে যাওয়ার জন্য অনেকেই নামাজরত ব্যক্তির সামনে দিয়ে চলে যান, যা গুরুতর গুনাহ। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যদি মুসল্লির সামনে দিয়ে অতিক্রমকারী জানতো এটা কত বড় অপরাধ, তাহলে সে মুসল্লির সামনে দিয়ে অতিক্রম করার চেয়ে চল্লিশ (দিন/মাস/বছর) দাঁড়িয়ে থাকা উত্তম মনে করতো। (সহিহ বুখারি: ৫১০)

৭. অন্য মুসল্লিদের অধিকার ক্ষুণ্ণ করা
সামনে যাওয়ার জন্য ঘাড় ডিঙিয়ে যাওয়া, বসার জায়গা সংকুচিত করা বা অযথা ধাক্কাধাক্কি করা- এসব আচরণও মসজিদের আদবের পরিপন্থী এবং অন্যের অধিকার (হক্কুল ইবাদ) লঙ্ঘনের শামিল।

ডিজিটাল শিষ্টাচার ও মসজিদের গাম্ভীর্য

৮. মোবাইল ফোন সাইলেন্ট না রাখা
নামাজের সময় মোবাইলের রিংটোন বেজে ওঠা বর্তমানে একটি বড় সমস্যা। এটি মুসল্লিদের ইবাদতের একাগ্রতা ও মসজিদের পবিত্র পরিবেশ নষ্ট করে। মসজিদে প্রবেশের আগে মোবাইল ফোন বন্ধ বা সাইলেন্ট রাখা জরুরি। অনিচ্ছাকৃতভাবে বেজে উঠলে পকেটে হাত দিয়ে দ্রুত তা বন্ধ করে দেওয়া উচিত।

৯. উঁচু স্বরে কথা বলা ও দুনিয়াবি আলাপ
মসজিদে উচ্চস্বরে কথা বলা, হাসাহাসি বা অপ্রয়োজনীয় দুনিয়াবি আলাপচারিতা ইবাদতের পরিবেশ ক্ষুণ্ণ করে। এমনকি উচ্চস্বরে তেলাওয়াত করাও অনুচিত, যদি তা অন্যের কষ্টের কারণ হয়। রাসুলুল্লাহ (স.) মসজিদে ইতেকাফকালে সাহাবিদেরকে উচ্চস্বরে কেরাত পড়তে শুনে পর্দা সরিয়ে বললেন- জেনে রাখো! তোমাদের প্রত্যেকেই স্বীয় রবের সাথে চুপিসারে আলাপে রত আছো। কাজেই তোমরা পরস্পরকে কষ্ট দিও না এবং পরস্পরের সামনে কেরাতে বা সালাতে আওয়াজ উঁচু করো না। (সুনানে আবু দাউদ: ১৩৩২)

মসজিদ মহান আল্লাহর পবিত্র ঘর। এখানে প্রবেশের মূল উদ্দেশ্য হলো বিনয় ও পরম একাগ্রতার সঙ্গে ইবাদত করা। উপরোক্ত ভুলগুলো অনেক সময় আমাদের কাছে ছোট মনে হলেও এগুলো ইবাদতের গুণগত মান কমিয়ে দেয়। তাই মসজিদের আদব মেনে চলা এবং প্রতিটি পদক্ষেপে সুন্নাহর অনুসরণে সচেতন হওয়া প্রত্যেক মুসলমানের ঈমানি দায়িত্ব। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে মসজিদের যথাযথ মর্যাদা রক্ষা করার তাওফিক দান করুন। আমিন।