‘উদাসীনতায়’ জৌলুস হারাচ্ছে লাকসাম-চাঁদপুর রেলপথ

‘উদাসীনতায়’ জৌলুস হারাচ্ছে লাকসাম-চাঁদপুর রেলপথ

ফাইল ছবি

চট্টগ্রাম-চাঁদপুর রুটের এক সময়ের জনপ্রিয় ট্রেন মেঘনা এক্সপ্রেস এখন অস্তিত্ব সংকটে। ১৯৮৭ সালে চালু হওয়া এ ট্রেনটি একসময় রেলের যাত্রী ও রাজস্ব আয়ের দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত দুর্বলতা, উদাসীনতা ও পরিকল্পনার অভাবে লাকসাম-চাঁদপুর রেল সেকশন আজ মৃতপ্রায় অবস্থায়।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জরাজীর্ণ রেলপথ সংস্কারে এক ধরনের অনীহা রয়েছে। আধুনিক সিগন্যালিং ব্যবস্থা চালু হয়নি। পুরোনো ট্রেন বন্ধ করা হয়েছে, নতুন কোচ সংযোজনেও গড়িমসি দেখা যাচ্ছে। পিক আওয়ারের ট্রেন বন্ধ থাকায় নাজুক হয়ে পড়েছে লাকসাম-চাঁদপুর সেকশন। বরিশাল বিভাগসহ দেশের মধ্যাঞ্চলের লঞ্চনির্ভর যাত্রীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই রুটে এখন আগের মতো সেবা নেই।

যাত্রী কমছে, বিকল্প পথে ঝুঁকছে মানুষ
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রেলের উদাসীনতার কারণে যাত্রীদের আগ্রহ কমেছে। পদ্মা সেতু চালুর পর ঢাকা হয়ে সড়কপথে দক্ষিণাঞ্চলে যাতায়াত বেড়েছে। তবে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, পার্বত্য চট্টগ্রাম, ফেনী, নোয়াখালী, কুমিল্লা, সিলেট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও লক্ষ্মীপুর অঞ্চলের যাত্রীদের কাছে এখনো চাঁদপুর রুট গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো ট্রেন না থাকায় অনেকেই বাড়তি খরচ সত্ত্বেও ঢাকা হয়ে যাতায়াতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছেন।

ঐতিহ্যবাহী রুটের ইতিহাস
রেলওয়ে সূত্র জানায়, ১৮৯২ সালে আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে কোম্পানি গঠনের পর ১৮৯৫ সালের ১ জুলাই চট্টগ্রাম থেকে কুমিল্লা ১৫০ কিলোমিটার এবং লাকসাম থেকে চাঁদপুর ৬৯ কিলোমিটার মিটারগেজ রেলপথ চালু হয়। চাঁদপুর হয়ে দেশের মধ্য ও দক্ষিণাঞ্চলে নৌপথে সহজ যাতায়াতের কারণে এই রুট দ্রুত জনপ্রিয়তা পায়। তবে শতবর্ষী এই রেলপথে উল্লেখযোগ্য সংস্কার না হওয়ায় সময়ের সঙ্গে গুরুত্ব হারাতে থাকে।

ট্রেন কমে দুই জোড়ায়
একসময় চট্টগ্রাম-চাঁদপুর, কুমিল্লা-চাঁদপুর ও লাকসাম-চাঁদপুর রুটে প্রতিদিন ১০-১২ জোড়া ট্রেন চলাচল করত। নোয়াখালী থেকে প্রতিদিন তিন জোড়া ট্রেন লাকসাম পর্যন্ত যাত্রী পরিবহন করত, যাদের বেশির ভাগের গন্তব্য ছিল চাঁদপুর সেকশন। ধাপে ধাপে ট্রেন কমে বর্তমানে চাঁদপুর পর্যন্ত মাত্র দুই জোড়া ট্রেন চলাচল করছে। এর মধ্যে একটি আন্তঃনগর মেঘনা এক্সপ্রেস এবং অন্যটি বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত সাগরিকা কমিউটার।

রাজস্ব গুরুত্ব কমে যাওয়া
রেলের তথ্যমতে, আন্তঃনগর সার্ভিস চালুর পর যাত্রী ও আয়ের দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল মেঘনা এক্সপ্রেস। প্রথম অবস্থানে ছিল তিস্তা এক্সপ্রেস। তিস্তা এক্সপ্রেস মাসে গড়ে ১ কোটি ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা আয় করলেও মেঘনা এক্সপ্রেস আয় করত ৩০ থেকে ৩৫ লাখ টাকা। ট্রেন কমে যাওয়া এবং সেবার মান অবনতির কারণে এই রুটের অবস্থাও নাজুক হয়ে পড়ে।

বন্ধ হয়ে গেছে একাধিক ট্রেন
কোভিড-১৯ এর আগে এই রুটে প্রতিদিন দুই জোড়া ডেমু ট্রেন চলাচল করত। ২০১৩ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর চালু হওয়া ৮১, ৮২, ৮৩ ও ৮৪ নম্বর ডেমু ট্রেনগুলো এখন বন্ধ। এছাড়া ১৭১, ১৭২, ১৭৩ ও ১৭৪ নম্বর লোকাল ট্রেন নিয়মিত চলাচল করত। ২০০০ সালের দিকে ১১৭ ও ১১৮ নম্বরসহ দুই জোড়া লোকাল ট্রেন বন্ধ হয়ে যায়। যাত্রী ও রাজস্ব থাকা সত্ত্বেও এসব ট্রেন বন্ধ হওয়ায় যাত্রীরা বিকল্প পথে ঝুঁকে পড়েন।

চাহিদা থাকা সত্ত্বেও লাকসাম-চাঁদপুর রুটে রেলের বিনিয়োগ সীমিত। নতুন ট্রেন চালু হয়নি, বরং বিদ্যমান ট্রেন বন্ধ করা হয়েছে। সময়সূচির অসামঞ্জস্যের কারণে অনেক সময় গভীর রাতে ট্রেন চাঁদপুর পৌঁছায়। এতে যাত্রীসংখ্যা দিন দিন কমছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। লাকসাম-চাঁদপুর সেকশনের মাধ্যমে চাঁদপুর, বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী, বরগুনা, ঝালকাঠি, শরিয়তপুর, মাদারীপুর, ফরিদপুর, পিরোজপুর, খুলনা ও সাতক্ষীরা জেলার যাত্রীরা চলাচল করতেন। ঢাকা থেকে প্রতিদিন ৩০ থেকে ৩৫টি লঞ্চ চাঁদপুরে যাত্রী পরিবহন করত। ট্রেন সেবার অবনতিতে এই সমন্বিত যোগাযোগ ব্যবস্থাও দুর্বল হয়ে পড়েছে।

যাত্রী আয়ে ওঠানামা
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২২ সালের ডিসেম্বরে মেঘনা এক্সপ্রেস ৬৯ হাজার ৮৪১ যাত্রী পরিবহন করে আয় করে ৯৮ লাখ ১৬ হাজার ৫৮২ টাকা। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে ৭৪ হাজার যাত্রী পরিবহন করে আয় হয় ১ কোটি ৫ লাখ ৭৪ হাজার ১৭৩ টাকা। তবে পরবর্তী সময়ে আয় ও যাত্রীসংখ্যায় বড় ওঠানামা দেখা যায়। আগস্টে ১৭ হাজার ৬০৫ যাত্রী থেকে আয় হয় ২৮ লাখ ২০ হাজার ৬০৭ টাকা। সেপ্টেম্বরে ৫৬ হাজার ২৫৮ যাত্রী থেকে আয় হয় ৮৭ লাখ ৫১ হাজার ৫৬৪ টাকা। কোভিডের আগে মাসে ১ কোটি ২০ লাখ থেকে দেড় কোটি টাকা পর্যন্ত আয় হতো।

পুরোনো কোচে চলছে ট্রেন
গত দেড় দশকে বাংলাদেশ রেলওয়ে ৪০৭টি যাত্রীবাহী কোচ সংগ্রহ করে বিভিন্ন ট্রেনে সংযোজন করেছে। তবে মেঘনা এক্সপ্রেস এখনো পুরোনো পিএইচটি টাইপ কোচ দিয়ে চলছে। ১৮/৩৬ লোডের এই ট্রেনে শোভন চেয়ার, শোভন, প্রথম শ্রেণীর চেয়ার ও কেবিন থাকলেও সেগুলো পুরোনো। অন্য কম গুরুত্বপূর্ণ রুটেও নতুন কোচ সংযোজন হলেও চাঁদপুরগামী ট্রেনগুলোতে এখনো জীর্ণ কোচ ও কম গতির লোকোমোটিভ ব্যবহার করা হচ্ছে। এমনকি নতুন কোচ সংযোজনের পর অবমুক্ত কোচও এই রুটে দেওয়া হয়নি।

এ বিষয়ে জানতে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মো. সবুক্তগীনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।