জব্বারের বলীখেলা ঘিরে মেলা

জব্বারের বলীখেলা ঘিরে মেলা

সংগৃহীত ছবি

চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক জব্বারের বলী খেলার ১১৭তম আসর বসছে আজ। নগরীর লালদীঘি ময়দানে বলীখেলা ঘিরে দুইদিনব্যাপী বসেছে বৈশাখী মেলা। দেশের দূর-দূরান্ত থেকে দোকানিরা নানা ধরনের পণ্য নিয়ে এসে পসরা বসিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বসা দোকানগুলোতে মাটির তৈরি তৈজসপত্র ও খেলনা থেকে শুরু করে ফুলদানি ও পুতুল, বেত-কাঠ ও বাঁশের তৈরি নানা আসবাবপত্র, হাতপাখা, মাছ ধরার পলো, ডালা, কুলো, গাছের চারা, মুড়ি মুড়কি, শীতল পাটি, দা-বটি, ছুরিসহ গৃহস্থালির সব ধরনের সামগ্রী হচ্ছে।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, বলীখেলা এ অঞ্চলের আদি অকৃত্রিম একটা ঐতিহ্য। আগে পাড়ায় পাড়ায় এ খেলার আয়োজন করা হতো। বিশেষ করে জ্যৈষ্ঠ ও বৈশাখ মাসে খালি জমিতে আয়োজন করা হয় এ খেলা। কালক্রমে ঐতিহ্যবাহী এই বলীখেলা প্রায় বন্ধ হয়ে গেলেও মাথা উঁচু করে এখনো দাঁড়িয়ে আছে শতবর্ষী আবদুল জব্বারের বলীখেলা। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে যুব সমাজকে সংগঠিত করতে ১৯০৯ সালে নগরীর বদরপাতির আবদুল জব্বার সওদাগর এই বলীখেলার প্রচলন করেছিলেন। যা সময়ের পরিক্রমায় জব্বারের বলী খেলা নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। বৈশাখের ১২ তারিখে লালদিঘীর ময়দানে বলী খেলা হয়। বিপ্লবী পূর্ণেন্দু দস্তিদারের ‌‘স্বাধীনতা সংগ্রামে চট্টগ্রাম’ বইতে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বিপ্লবের আগে প্রস্তুতির অংশ হিসেবে অনুশীলন সমিতির বলীখেলাসহ বিভিন্ন শক্তি ও নৈপুণ্য প্রদর্শনের খেলার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পূর্ণেন্দু দস্তিদার লিখেছেন, ‘১৮৯৯-১৯০১ সালের কলকাতায় তরুণ ব্যারিস্টার প্রমথনাথ মিত্রের উদ্যোগে বাংলার প্রথম গোপন বিপ্লবী দল “অনুশীলন সমিতি” প্রতিষ্ঠিত হয়। অনুশীলন সমিতিতে লাঠিখেলা, অসি খেলা, ছোরা খেলা, কুস্তি, মুষ্টিযুদ্ধ ইত্যাদি শিক্ষা দেওয়া হতো। পাশাপাশি চরিত্র গঠনের শিক্ষাও দেওয়া হতো।’ শোষকের বিরুদ্ধে শক্তি প্রদর্শনের ভাবনা থেকে প্রচলিত জব্বারের বলীখেলা কালক্রমে এ অঞ্চলের প্রাণের খেলা ও মেলায় পরিণত হয়েছে। প্রতিবছর ১২ বৈশাখ এই বলীখেলা অনুষ্ঠিত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় একবার এবং কোভিড-১৯ এর কারণে দুই বছর বলীখেলা হয়নি।

জানা যায়, বলীখেলাকে কুস্তি বা মল্লযুদ্ধ প্রতিযোগিতা বলা হতো। এই বলীখেলা হয়ে আসছে পুরোপুরি গ্রামীণ নিয়মকানুনে। নির্মল বিনোদনই কেবল নয়, শোষণকারীদের বিপক্ষে শক্তিমত্তা প্রদর্শনের জন্য নিজেকে কিংবা সমাজকে তৈরি করার প্রচেষ্টাও ছিল এই মল্লযুদ্ধে। আবদুল হক চৌধুরীর ‘চট্টগ্রামের সমাজ ও সংস্কৃতির রূপরেখা’ বইয়ে উল্লেখ করা হয়, ‘মল্লযুদ্ধে চট্টগ্রামের ঐতিহ্য সুপ্রাচীনকালের। চট্টগ্রামে মল্ল নামে খ্যাত বহু সুপ্রাচীন হিন্দু-মুসলমান পরিবার দেখা যায়। চট্টগ্রামের ২২টি মল্ল পরিবার ইতিহাস বিখ্যাত। তাঁরা সবাই মধ্য চট্টগ্রাম, অর্থাৎ কর্ণফুলী ও শঙ্খ নদের মধ্যবর্তী এলাকার ২০ গ্রামের লোক ছিলেন। আশিয়া গ্রামের আমান শাহ মল্ল, চাতরি গ্রামের চিকন মল্ল, কাতারিয়া গ্রামের চান্দ মল্ল, জিরি গ্রামের ঈদ মল্ল ও নওয়াব মল্ল, পারি গ্রামের হরি মল্ল, পেরলা গ্রামের নানু মল্ল, পটিয়ার হিলাল মল্ল ও গোরাহিত মল্ল, হাইদগাঁওর অলি মল্ল ও মোজাহিদ মল্ল, শোভনদÐীর তোরপাচ মল্ল, কাঞ্চননগরের আদম মল্ল, ঈশ্বরখাইনের গনি মল্ল, সৈয়দপুরের কাসিম মল্ল, পোপাদিয়ার যুগী মল্ল, খিতাপচরের খিতাপ মল্ল, ইমামচরের ইমাম মল্ল, নাইখাইনের বোতাত মল্ল, মাহাতার এয়াছিন মল্ল, হুলাইনের হিম মল্ল, গৈরলার চুয়ান মল্ল।’ প্রাচীনকাল থেকে এ অঞ্চলের প্রতি জেলায় হাতে গোনা কুস্তি প্রতিযোগিতা বা মল্লযুদ্ধ আয়োজন হতো। চট্টগ্রামের মতো দুই মাস ধরে বলীখেলা আর কোথাও হতো না। মল্লরা সাধারণত খুব সুঠামদেহী এবং শক্তিশালী হতেন।

শুক্রবার মেলার প্রথম দিনে লালদীঘি এলাকা সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, আন্দরকিল্লা থেকে কোতোয়ালি মোড়, জেল রোড, কে সি দে রোডসহ আশপাশের সড়কের ফুটপাতের ওপর দোকানিরা তাদের পণ্যের পসরা বসিয়েছেন। কেউ কেউ দোকান সাজাচ্ছেন। কেউ বিক্রির জন্য আনা মৃৎশিল্পের নানা পণ্যের ওপর নজরকাড়া রং করছেন। দোকানিরা জানান, দুই দিনব্যাপী মেলা হলেও তারা প্রতিবছর মেলার দুই দিন আগে থেকেই দোকান সাজাতে শুরু করেন। চট্টগ্রামের অন্যতম প্রধান এই মেলা থেকে পণ্য কিনতে লোকজন এক বছর ধরে অপেক্ষা করে থাকেন। কারণ এখানে একসঙ্গে যত ঐতিহ্যবাহী পণ্য পাওয়া যায়, স্বাভাবিক সময়ে এসব পাওয়া যায় না।