ভাইরাল কোরবানির পশু কেনার বিধান
প্রতীকী ছবি
কোরবানি ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এটি নিছক পশু জবাইয়ের নাম নয়; বরং আল্লাহর প্রতি আনুগত্য, ত্যাগ, তাকওয়া ও আত্মসমর্পণের প্রতীক।
তাই কোরবানির মূল আত্মা হলো—একনিষ্ঠ নিয়ত এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের আকাঙ্ক্ষা। যদি নিয়ত বিশুদ্ধ না থাকে, তাহলে কোরবানির পশু যত বড়, দাম যত বেশি কিংবা বাহ্যিক চাকচিক্য যত আকর্ষণীয়ই হোক না কেন, আল্লাহর কাছে তা গ্রহণযোগ্য নয়। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহর কাছে পৌঁছে না এগুলোর গোশত ও রক্ত; বরং তাঁর কাছে পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া।’
(সুরা : হজ, আয়াত : ৩৭)
এই আয়াতে মহান আল্লাহ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, কোরবানির মূল উদ্দেশ্য প্রদর্শনী নয়; বরং হৃদয়ের বিশুদ্ধতা ও তাকওয়া।
একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির আশা না থাকলে এই আমল মূল্যহীন হয়ে পড়ে। হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিয়তের ওপরেই কাজের ফলাফল নির্ভর করে এবং প্রত্যেক ব্যক্তি তার নিয়ত অনুযায়ী প্রতিফল পাবে। কাজেই যার হিজরত আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের সন্তুষ্টির জন্য, তার হিজরত আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের জন্যই। আর যার হিজরত পার্থিব লাভের জন্য অথবা কোনো মহিলাকে বিয়ে করার জন্য, তার হিজরতের ফল সেটাই, যে উদ্দেশ্যে সে হিজরত করেছে।
(বুখারি, হাদিস : ১)
অতএব, কোরবানির পশু কেনা, লালন-পালন ও জবাই—সবকিছুতেই নিয়তের বিশুদ্ধতা অপরিহার্য। সেখানে যদি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ বা অহংকারের অনুপ্রবেশ ঘটে, তাহলে তা পুরো আমলকেই বিনষ্ট করতে পারে।
বর্তমানে কোরবানির মৌসুম এলেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কিছু ‘ভাইরাল’ পশুর ব্যাপক প্রচার দেখা যায়। কখনো বিশাল আকৃতি, কখনো অস্বাভাবিক দাম, আবার কখনো পরিচিত কিংবা বিতর্কিত ব্যক্তির নামে নামকরণের মাধ্যমে এগুলোকে মানুষের আকর্ষণের কেন্দ্রে পরিণত করা হয়। সংবাদমাধ্যম, ইউটিউব, ফেসবুক কিংবা টিকটকে এগুলো নিয়ে আলোচনা চলে।
ফলে পশুর পাশাপাশি তার সম্ভাব্য ক্রেতাকেও মানুষের আগ্রহ ও আলোচনার বিষয় হতে হয়।
এখানেই একজন মুমিনের একনিষ্ঠতা বিনষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। কারণ মানুষের অন্তর দুর্বল। প্রশংসা, পরিচিতি, সামাজিক মর্যাদা কিংবা আলোচিত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা অজান্তেই নিয়তকে প্রভাবিত করতে পারে। শয়তান ইবাদতের মধ্যেও রিয়া (লোক-দেখানো) প্রবেশ করানোর চেষ্টা করে, যা মানুষের পুরো ইবাদতকে নিষ্ফল করে দেয়। হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমাদের ওপর সবচেয়ে ভয়ানক যে বিষয়ের আমি আশঙ্কা করছি তা হলো শিরকে আসগার (ছোট শিরক)।’ তারা বললেন, ছোট শিরক কী হে আল্লাহর রাসুল? তিনি বললেন, ‘রিয়া’। মহান আল্লাহ যখন মানুষকে তাদের কর্মফল দান করবেন তখন বলবেন, ‘দুনিয়ায় যাদেরকে দেখানোর উদ্দেশ্যে তোমরা আমল করতে তাদের কাছে যাও। দেখ, তাদের কাছে কোনো প্রতিদান পাও কি না?’ (শুআবুল ঈমান)
নাউজুবিল্লাহ! এ কারণেই ভাইরাল বা আলোচিত পশু কেনার ক্ষেত্রে একজন মুমিনের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকা উচিত। কারণ বিষয়টি শুধু ‘একটি গরু কেনা’ নয়; বরং নিজের অন্তরকে অহংকার, আত্মপ্রচার ও রিয়া থেকে রক্ষা করারও বিষয়।
তবে এটাও সত্য, ইসলাম কখনো সামর্থ্যের মধ্যে উত্তম পশু কোরবানি করতে নিরুৎসাহ করেনি; বরং সুন্দর ও উত্তম জিনিস আল্লাহর পথে ব্যয় করা প্রশংসনীয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা কখনো পূর্ণ সওয়াব অর্জন করতে পারবে না, যতক্ষণ না তোমাদের প্রিয় বস্তু আল্লাহ রাস্তায় ব্যয় করবে। আর যা কিছু তোমরা ব্যয় করবে, তবে নিশ্চয়ই আল্লাহ সে বিষয়ে সম্যক জ্ঞাত।’
(সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ৯২)
আমাদের মহানবী (সা.)-ও আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় উত্তম পশু ও একাধিক পশু কোরবানি করেছেন। হাদিসে আছে, মহানবী (সা.)-এর জীবনের শেষ হজের বছর তিনি ১০০টি পশু কোরবানি করেছেন। তার মধ্যে ৬৩টি পশু তিনি নিজ হাতে কোরবানি করেছেন।
(ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৩০৭৬)
অতএব, আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় কোরবানি করতে দামি বা সুন্দর পশু কেনা দোষের কিছু নয়। সমস্যা তখনই সৃষ্টি হয়, যখন আল্লাহর সন্তুষ্টির জায়গা দখল করে নেয় মানুষের প্রশংসা, সামাজিক প্রতিযোগিতা কিংবা আত্মপ্রদর্শন।
শুধু ভাইরাল হয়ে যাওয়ার কারণে কোনো পশু কেনা সরাসরি হারাম বা অবৈধ বলা যাবে না। শরিয়তের মূল বিচার নিয়তের ওপর। কেউ যদি সত্যিই আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পশুটি কেনে, এবং তার অন্তরে দুনিয়াবি খ্যাতি, প্রদর্শনী বা অহংকারের প্রভাব না থাকে, তাহলে তার কোরবানি সহিহ হতে পারে। মহান আল্লাহ সবাইকে একনিষ্ঠভাবে কোরবানি করার তাওফিক দান করুন। আমিন।