৬৬ বছর ধরেই কিউবায় হামলার ছুঁতো খুঁজছে যুক্তরাষ্ট্র?
সংগৃহীত ছবি
চলমান ইরান যুদ্ধের উত্তেজনার মধ্যেই এবার খোদ যুক্তরাষ্ট্রের দোরগোড়ায় (ফ্লোরিডা প্রণালীর অনতিদূরে) বেজে উঠেছে আরেকটি যুদ্ধের দামামা। দীর্ঘ ৬৬ বছর ধরে সমাজতান্ত্রিক দ্বীপরাষ্ট্র কিউবায় সামরিক হামলার ছুতা খুঁজছে বিশ্বমোড়ল যুক্তরাষ্ট্র, এমনটাই অভিযোগ করছে হাভানা।
১৯৬০ সালের মে মাস থেকে শুরু হওয়া এই দুই দেশের বৈরিতা ২০২৬ সালের মে মাসে এসে এক চরম ও নিষ্ঠুরতম অধ্যায়ে রূপ নিয়েছে। একদিকে একের পর এক কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং অন্যদিকে সামরিক আগ্রাসনের প্রচ্ছন্ন হুমকিতে এক সময়ের সমৃদ্ধ কিউবা এখন যেন প্রাক-শিল্পযুগের অন্ধকারে নিমজ্জিত হচ্ছে।
সম্প্রতি মার্কিন গণমাধ্যম এক্সিওস-এর এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, কিউবার কাছে ৩০০টি ড্রোন রয়েছে যা দিয়ে তারা মার্কিন লক্ষ্যবস্তুতে হামলার পরিকল্পনা করছে। তবে এই দাবিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও সাজানো অজুহাত বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন কিউবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রুনো রদ্রিগেজ। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, কিউবা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কোনো হুমকি নয় এবং যুদ্ধে জড়ানোর কোনো ইচ্ছাও তাদের নেই। তবে বাইরের শত্রুর আক্রমণ থেকে নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় তারা বদ্ধপরিকর। বিশ্লেষকদের মতে, গত ৩ জানুয়ারি ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপতি নিকোলাস মাদুরোকে মার্কিন সেনারা অপহরণ করার পর থেকেই কিউবা নিয়ে আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল, যা এখন ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন হুমকিতে আরও ঘনীভূত হয়েছে।
এদিকে, মার্কিন নিষেধাজ্ঞার জেরে কিউবার অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি এখন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ভেনেজুয়েলা থেকে জ্বালানি তেল সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পুরো দেশ বিদ্যুৎহীন ও অন্ধকারে ডুবে গেছে। ১ কোটি জনসংখ্যার এই দেশটিতে খাবার ও গ্যাসের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে, থমকে গেছে কলকারখানা ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা। জ্বালানির অভাবে সাধারণ মানুষের ঘরে বিদ্যুৎ না থাকলেও পুলিশের গাড়িতে ঠিকই তেল মিলছে, এমন বৈষম্যের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ কিউবাবাসী রাস্তায় নেমে থালা-বাটি বাজিয়ে প্রতিবাদও জানাচ্ছে। কিউবার রাষ্ট্রপতি মিগেল দিয়াজ-কানেল যুক্তরাষ্ট্রের এই অবরোধকে একটি পুরো জাতিকে জিম্মি করার ‘গণহত্যার সামিল’ চক্রান্ত বলে আখ্যা দিয়েছেন।
ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, ১৯৫৯ সালে ফিদেল কাস্ত্রোর নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পর থেকেই পুঁজিবাদী যুক্তরাষ্ট্রের চক্ষুশূলে পরিণত হয় কিউবা। ১৯৬১ সালের সিআইএ সমর্থিত ব্যর্থ ‘বে অব পিগস’ আক্রমণ এবং ১৯৬২ সালের ঐতিহাসিক ‘কিউবান ক্ষেপণাস্ত্র সংকট’-এর সময় তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রপতি জন এফ কেনেডি কিউবায় আর কখনো হামলা না করার প্রতিশ্রুতি দিলেও বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসন সেই চুক্তিকে বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছে।
সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে বহুগুণ পিছিয়ে থাকা এই ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্রটিকে কোণঠাসা করতে ওয়াশিংটন এখন একের পর এক চাল চালছে। সর্বশেষ গত ২০ মে মার্কিন বিচার বিভাগ কিউবার ৯৪ বছর বয়সী সাবেক নেতা রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে ১৯৯৬ সালের একটি বিমান ভূপাতিত করার ঘটনায় হত্যার অভিযোগ এনেছে। রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে এই ফৌজদারি মামলা দায়েরের পর বিশ্বজুড়ে এখন একটাই প্রশ্ন, ভেনেজুয়েলার পর এবার কি রাউলকে ধরতেও কিউবায় সামরিক অভিযান চালাবে যুক্তরাষ্ট্র, নাকি এই অসম লড়াইয়ের শেষ অন্য কোথাও, তা সময়ই বলে দেবে।