আত্মীয়দের অধিকার প্রদানে ইসলামের নির্দেশনা

আত্মীয়দের অধিকার প্রদানে ইসলামের নির্দেশনা

প্রতিকী ছবি

মানুষ সমাজবদ্ধ জীব। সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মানুষের জীবনযাপন প্রায় অসম্ভব। সামাজিক জীবনের একটি অপরিহার্য অনুষঙ্গ আত্মীয়তা। মানুষ বিভিন্নভাবে আত্মীয়তার বন্ধনে জড়িয়ে পড়ে। আত্মীয়স্বজনের মাঝে সৌহার্দ-সম্প্রীতি তৈরি হয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে এই সম্পর্ক তিক্ততায় রূপ নেয়। অবশেষে সেটা সম্পর্কচ্ছেদে পর্যবসিত হয়। মানবজীবনের অপরিহার্য অনুষঙ্গ আত্মীয়তার সম্পর্ক সুদৃঢ় ও তাদের অধিকার প্রদানে ইসলামে রয়েছে কার্যকরী নির্দেশনা।

আত্মীয়তার বন্ধন অক্ষুণ্ন রাখা রিজিক বৃদ্ধি ও দীর্ঘায়ু লাভের অনন্য মাধ্যম। আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম  বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রিজিক (জীবিকা) প্রশস্ত হওয়া এবং আয়ু বৃদ্ধির প্রত্যাশা করে সে যেন তার আত্মীয়তার বন্ধন অক্ষুণ্ন রাখে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৯৮৬)

আলোচ্য হাদিসে রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। হাদিসের ব্যাখ্যায় মুহাদ্দিসরা বলেন, ‘এখানে জীবিকা ও আয়ুষ্কাল বৃদ্ধির অর্থ হলো বরকত লাভ করা। ভালো কাজের সুযোগ হওয়া। সময় যথাযথ কাজে লাগানো এবং অপচয় ও ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া।’ (জাওয়াহিরুল হারিরিয়্যা : ২/৩৫২)

আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা একটি আবশ্যকীয় বিধান।

ইসলামি শরিয়তে প্রত্যেকের সাধ্যানুযায়ী আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা ওয়াজিব। তবে সম্পর্ক রক্ষার ক্ষেত্রে অধিক নিকটতম আত্মীয়রা অগ্রাধিকার পাবে। পবিত্র কোরআন মাজিদে আল্লাহতায়ালা জ্ঞানী ব্যক্তিদের কিছু গুণ উল্লেখ করতে গিয়ে  বলেন, ‘যারা সেই সম্পর্ক রক্ষা করে, যা রক্ষার নির্দেশ আল্লাহ দিয়েছেন।’ (সুরা : রাদ, আয়াত : ২১)

আত্মীয়দের অধিকার প্রদানে ইসলামের নির্দেশনা রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম  বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার রক্তের সম্পর্ক বজায় রাখে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬১৩৮)

আল্লাহ মানুষের ভিতর যে পারস্পরিক সম্পর্ক দান করেছেন তার রক্ষা ও আত্মীয়স্বজনের অধিকার আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন। পবিত্র কোরআনেই ইরশাদ হয়েছে, ‘আর নিকটাত্মীয়ের অধিকার রক্ষা কর।’ (সুরা : বনি ইসরাইল, আয়াত : ২৬)

আত্মীয়তার সম্পর্ক অক্ষুণ্ন রখতে কোরআন-সুন্নাহ প্রদত্ত নির্দেশনাগুলো মেনে চলার বিকল্প নেই। আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখতে ইসলামের মৌলিক বেশ কিছু নির্দেশনা-

১. যোগাযাগ রক্ষা করা : আত্মীয়রা পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করবে। এমনকি কেউ বিচ্ছিন্ন থাকলেও তার সঙ্গে অন্যরা যোগাযোগ রক্ষা করবে। রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘... প্রকৃত আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষাকারী সেই যে ব্যক্তি তার আত্মীয় তার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করলেও সে তা রক্ষা করে চলে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৯৯১)

২. ভালো আচরণ করা : পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘মা-বাবার সঙ্গে উত্তম আচরণ কর, আর উত্তম আচরণ কর নিকটাত্মীয়ের সঙ্গে।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৩৬)

৩. অভাবগ্রস্ত হলে সহযোগিতা করা : অভাবগ্রস্ত আত্মীয়স্বজনের সহযোগিতার তাগিদ দিয়ে রসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘কোনো মিসকিনকে দান করলে শুধু দানের সওয়াব আর আত্মীয়কে সহযোগিতা করলে দুটি সওয়াব- দান ও আত্মীয়তা রক্ষা।’ (সুনানে নাসায়ি, হাদিস : ২৫৮২)

৪. মেহমানদারি করা : মেহমানদারি সাধারণ মুসলমানের অধিকার। আত্মীয় হলে তা আরও দৃঢ় হয়। রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে সে যেন মেহমানকে সম্মান করে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬১৩৮)

৫. অসুস্থ হলে সেবা করা : আত্মীয়স্বজন অসুস্থ হলে তাকে দেখতে যাওয়া এবং খোঁজখবর নেওয়া আবশ্যক। কেননা রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম  বলেছেন, ‘ক্ষুধার্ত ব্যক্তিকে আহার করাও, রোগীর শুশ্রƒষা কর এবং বন্দিদের মুক্ত কর।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৩৭৩)

৬. দীনের ব্যাপারে সতর্ক করা : আত্মীয়রা পরস্পরের জাগতিক কল্যাণ কামনার মতো পরকালীন কল্যাণের ব্যাপারে সচেতন ও সতর্ক করবেন। কেননা আল্লাহ বলেছেন, ‘হে মুমিনরা! তোমরা নিজেদের এবং পরিবারপরিজনকে রক্ষা কর জাহান্নামের আগুন থেকে, যার জ্বালানি হবে মানুষ ও পাথর।’ (সুরা : তাহরিম, আয়াত : ৬)

আসুন, আত্মীয়দের যথার্থ অধিকার প্রদানে ইসলামের নির্দেশনাগুলো মেনে চলি। পারস্পরিক সৌহার্দ-সম্প্রীতি বজায় রেখে সুখময় সমাজ বিনির্মাণে এগিয়ে যাই।

♦ লেখক : মুহাদ্দিস, জামিয়া গাফুরিয়া মাখযানুল উলুম, টঙ্গী, গাজিপুর