সময়ের সঠিক ব্যবহারই সফল জীবনের চাবিকাঠি

সময়ের সঠিক ব্যবহারই সফল জীবনের চাবিকাঠি

ছবিঃ সংগৃহীত।

মানুষের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো সময়। অর্থ, সম্পদ কিংবা কোনো সুযোগ হারিয়ে গেলে অনেক ক্ষেত্রেই তা আবার ফিরে পাওয়া সম্ভব হতে পারে। কিন্তু সময় একবার চলে গেলে তা আর কখনো ফিরে আসে না। তাই ইসলাম সময়কে মানুষের জীবনের অন্যতম বড় আমানত হিসেবে বিবেচনা করেছে। কিয়ামতের দিন মানুষকে যেসব বিষয়ে জবাবদিহি করতে হবে, তার মধ্যে জীবন ও যৌবন কী কাজে ব্যয় করেছে, সে প্রশ্নও থাকবে। অথচ আজকের সমাজে সময় অপচয় ও অপ্রয়োজনীয় ব্যস্ততা মানুষের অন্যতম বড় সংকটে পরিণত হয়েছে। এমন বাস্তবতায় আমরা যদি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দেখানো জীবন দর্শনে দিকে তাকাই। তাহলে তা আমাদের জন্য সময় ব্যবস্থাপনার এক অনন্য ও বাস্তবসম্মত আদর্শ উপস্থাপন করে।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা সময়ের গুরুত্ব বোঝাতে বিভিন্ন স্থানে সময়ের শপথ করেছেন। তিনি বলেছেন,

وَالْعَصْرِ ۝ إِنَّ الْإِنْسَانَ لَفِي خُسْرٍ

‘সময়ের শপথ! নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতির মধ্যে রয়েছে।’ (সুরা আসর, আয়াত : ১-২)

ইমাম ফখরুদ্দীন রাজি (রহ.) বলেছেন, মহান আল্লাহ তাআলা কোনো কিছুর শপথ তখনই করেন, যখন তার মধ্যে বিশেষ গুরুত্ব ও শিক্ষা নিহিত থাকে। সময়ের শপথের মাধ্যমে মানুষের জীবনে সময়ের অপরিসীম মূল্য তুলে ধরা হয়েছে। (তাফসিরে কাবির, সুরা আল-আসর)

রাসুলুল্লাহ (সা.) সময়ের গুরুত্ব সম্পর্কে বলেছেন,

نِعْمَتَانِ مَغْبُونٌ فِيهِمَا كَثِيرٌ مِنَ النَّاسِ الصِّحَّةُ وَالْفَرَاغُ

‘দুটি নিয়ামতের ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষ প্রতারিত হয়, তা হলো সুস্বাস্থ্য ও অবসর সময়।’ (বুখারি, হাদিস : ৬৪১২)

এই হাদিসে সময়কে এমন এক সম্পদ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যার প্রকৃত মূল্য অধিকাংশ মানুষ উপলব্ধি করতে পারে না। মানুষ সাধারণত সময়ের গুরুত্ব তখনই বুঝতে পারে, যখন তা হাতছাড়া হয়ে যায়।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তিনি সময়কে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করতেন। তার প্রতিটি দিন ইবাদত, পরিবার, শিক্ষা, সমাজসেবা এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের মধ্যে সুষমভাবে বণ্টিত ছিল। আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেছেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘরে থাকলে পরিবারের কাজে সহযোগিতা করতেন, আর নামাজের সময় হলে নামাজে চলে যেতেন। (বুখারি, হাদিস : ৬৭৬)

এ ঘটনা প্রমাণ করে যে, তিনি জীবনের বিভিন্ন দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতেন। আজ অনেক মানুষ কর্মজীবনের কারণে পরিবারকে সময় দিতে পারেন না, আবার কেউ পারিবারিক ব্যস্ততায় আত্মিক উন্নয়নকে উপেক্ষা করে চলেন। নববী আদর্শ শেখায়, জীবনের প্রতিটি দায়িত্বের জন্য নির্দিষ্ট সময় বরাদ্দ করা প্রয়োজন।

নববী সময় ব্যবস্থাপনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দিনের শুরুতে সক্রিয়তা। রাসুলুল্লাহ (সা.) দোয়া করেছেন,

اللَّهُمَّ بَارِكْ لِأُمَّتِي فِي بُكُورِهَا

‘হে আল্লাহ! আমার উম্মতের জন্য দিনের প্রারম্ভিক সময়ে বরকত দান করুন।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ২৬০৬; তিরমিজি, হাদিস : ১২১২)

এ কারণে সাহাবায়ে কেরাম ভোরের পর থেকেই কাজ শুরু করতে উৎসাহিত হতেন। আধুনিক গবেষণাও দেখিয়েছে যে, দিনের প্রথম ভাগে মানুষের মনোযোগ ও কর্মক্ষমতা তুলনামূলক বেশি থাকে। (American Psychological Association, Time and Productivity Studies)

রাসুলুল্লাহ (সা.) সময়কে শুধু কাজের জন্য নয়, আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করার জন্যও ব্যবহার করতেন। তাহাজ্জুদের নামাজ তার দৈনন্দিন জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে,

وَمِنَ اللَّيْلِ فَتَهَجَّدْ بِهِ نَافِلَةً لَكَ

‘রাতের কিছু অংশে তাহাজ্জুদ আদায় করুন, যা আপনার জন্য অতিরিক্ত ইবাদত।’ (সুরা আল-ইসরা, আয়াত :৭৯) রাতের নির্জন সময়ে ইবাদত মানুষের আত্মিক শক্তি বৃদ্ধি করে এবং পরবর্তী দিনের জন্য মানসিক প্রস্তুতি তৈরি করে।

নববী আদর্শের আরেকটি বৈশিষ্ট্য ছিল অপ্রয়োজনীয় কাজে সময় নষ্ট না করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,

مِنْ حُسْنِ إِسْلَامِ الْمَرْءِ تَرْكُهُ مَا لَا يَعْنِيهِ

‘মানুষের ইসলামের সৌন্দর্যের একটি অংশ হলো তার অপ্রয়োজনীয় বিষয় পরিত্যাগ করা।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৩১৭)

আজকের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমনির্ভর যুগে এই হাদিসের গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে গেছে। গবেষণা অনুযায়ী, অতিরিক্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার মানুষের উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দেয় এবং মনোযোগ বিঘ্নিত করে। (Organisation for Economic Co-operation and Development, Digital Well-being Report)

রাসুলুল্লাহ (সা.) কাজ সম্পাদনে ধারাবাহিকতাকে বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। তিনি বলেছেন,

أَحَبُّ الْأَعْمَالِ إِلَى اللَّهِ أَدْوَمُهَا وَإِنْ قَلَّ

‘আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল হলো যে আমল নিয়মিত করা হয়, যদিও তা অল্প হয়।’ (বুখারি, হাদিস : ৬৪৬৪; মুসলিম, হাদিস : ৭৮২)

এই হাদিস সময় ব্যবস্থাপনার একটি মৌলিক নীতি শিক্ষা দেয়। বড় লক্ষ্য অর্জনের জন্য হঠাৎ আবেগ নয়, বরং নিয়মিত ও ধারাবাহিক প্রচেষ্টা প্রয়োজন।

ইসলামি সভ্যতার ইতিহাসেও সময়ের যথাযথ ব্যবহারের অসংখ্য দৃষ্টান্ত রয়েছে। ইমাম নববি (রহ.), ইবন হাজর আসকালানি (রহ.) এবং ইমাম ইবনুল জাওজি (রহ.) তাদের জীবনের প্রায় প্রতিটি মুহূর্ত জ্ঞানচর্চা, শিক্ষা ও ইবাদতে ব্যয় করেছেন। ইতিহাসবিদরা উল্লেখ করেছেন, ইমাম নববি (রহ.) দৈনিক অল্প সময় বিশ্রাম নিয়ে বাকি সময় শিক্ষা, গবেষণা ও ইবাদতে নিয়োজিত থাকতেন। (আয-যাহাবি, সিয়ারু আ’লামিন নুবালা)

কিয়ামতের দিন সময় সম্পর্কে জবাবদিহির বিষয়টি স্মরণ করিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,

لَا تَزُولُ قَدَمَا عَبْدٍ يَوْمَ الْقِيَامَةِ حَتَّى يُسْأَلَ عَنْ عُمُرِهِ فِيمَا أَفْنَاهُ...

‘কিয়ামতের দিন কোনো বান্দার পা নড়বে না, যতক্ষণ না তাকে তার জীবন কোথায় ব্যয় করেছে সে সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে...’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৪১৭)

এ হাদিস প্রমাণ করে যে, সময় শুধু ব্যক্তিগত সম্পদ নয়; এটি আল্লাহপ্রদত্ত একটি আমানত।

বর্তমান বিশ্বে সময় ব্যবস্থাপনা নিয়ে অসংখ্য বই, সেমিনার ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি বাস্তবায়িত হচ্ছে। কিন্তু চৌদ্দশ বছর আগে রাসুলুল্লাহ (সা.) যে জীবনব্যবস্থা উপস্থাপন করেছেন, তার মধ্যে রয়েছে সময়ের সর্বোত্তম ব্যবহার, দায়িত্বের ভারসাম্য, আত্মিক উন্নয়ন, কর্মদক্ষতা এবং মানবকল্যাণের এক পরিপূর্ণ সমন্বয়। তাই সময়কে গুরুত্ব দেওয়া, পরিকল্পিত জীবনযাপন করা, অপ্রয়োজনীয় কাজে সময় নষ্ট না করা এবং প্রতিটি মুহূর্তকে কল্যাণকর কাজে ব্যয় করাই সফল জীবনের চাবিকাঠি। আর এটিই আমাদের জন্য নববী আদর্শের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। যে ব্যক্তি সময়ের মর্যাদা বুঝতে পারে, সে প্রকৃতপক্ষে নিজের জীবন ও ভবিষ্যতের মর্যাদাও বুঝতে পারে।