বকুল ফুল: প্রকৃতির ছোট্ট তারা

বকুল ফুল: প্রকৃতির ছোট্ট তারা

ছবি: সংগৃহীত

“বকুলের মালা শুকাবে/ রেখে দিব তার সুরভী/ দিন গিয়ে রাতে লুকাবে/ মুছো নাকো আমারি ছবি।”— গাজী মাজহারুল আনোয়ারের রচিত বহুল প্রচলিত এই গানটির মতোই যুগে যুগে অনেক কবি, সাহিত্যিক, গীতিকার করে গেছেন বকুল বন্দনা। ছোট্ট তারার মতো দেখতে এই ফুলটি তার সৌন্দর্য ও সৌরভের জন্য স্থান করে নিয়েছে মানুষের হৃদয়ে। 

এটি এমন এক ফুল, যা হয়তো সবার প্রিয় নয়, তবে বকুল ঝরা পথে হাঁটার সময় একটি ঝরে পড়া ফুল কুড়িয়ে নেওয়ার লোভ খুব কম মানুষই সামলাতে পারে! এর মৃদু সুবাস আর নীরব উপস্থিতি যেন মুহূর্তের জন্য হলেও মানুষকে থমকে দাঁড়াতে বাধ্য করে। 

বকুল গাছের বৈজ্ঞানিক নাম Mimusops elengi। মাঝারি আকৃতির চিরসবুজ এই গাছটি দেখতে অনেকটা ঝোপালো ধরনের। পুরো গাছ ভর্তি পাতা থাকে সবসময়ই, হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত পথিকও এই গাছটির নিচে দুদণ্ড জিরিয়ে নিতে পারে। শুধু ফুলের সৌন্দর্য নয়, সবুজে আচ্ছাদিত এই গাছটির নিজস্ব সৌন্দর্যও মুগ্ধ করে রাখে প্রকৃতিপ্রেমীদের। তাই হয়তো অনেক বৃক্ষপ্রেমীর চাওয়া থাকে নিজ আঙিনায় একটি বকুল গাছের। যার সৌন্দর্য, ফুল আর শীতল ছায়া মুগ্ধ করে রাখবে বছরের পর বছর। 

বকুল ফুল আকারে ক্ষুদ্র তবে এর সৌন্দর্য কোনো অংশেই কম নয়। ছোট্ট এই ফুলটির চারপাশে রয়েছে শুভ্র রঙ আর মাঝখানে হলুদাভ আভা। হাতে নিলেই মন ভালো করে দেওয়ার মতো স্নিগ্ধ সৌন্দর্য এই ফুলটির। প্রকৃতি যেন এর কারুকার্যে বিন্দুমাত্র কৃপণতা করেনি। 

সাধারণত বর্ষাকালে বকুল বেশি ফোটে, তবে শীত ব্যতীত প্রায় সারা বছরই এর দেখা মিলে। সকালবেলা গাছের নিচে তারার মতো বিছিয়ে থাকে, আর সারাদিন টুপটাপ করে ঝরে পড়তেই থাকে ফুলগুলো। 

বহু মানুষের শৈশবের স্মৃতিতে জড়িয়ে আছে বকুল ফুল। ছোটবেলায় ঘুম থেকে উঠেই মাদরাসায় যাওয়ার আগে বকুল কুড়াতে যাওয়া, আর বাড়ি ফিরে সেই ফুলগুলো দিয়ে মালা বানানো শৈশবের সুন্দর স্মৃতিগুলোর একটি। বকুলের মিষ্টি সুবাস আজো মনে করিয়ে দেয় সেই সোনালী দিনগুলোর কথা। 

বকুল ফুল শুকিয়ে যাওয়ার পরেও এর সুবাস রয়ে যায় বহুদিন। যেন ফুলটি শুকিয়ে গেলেও তার সঙ্গে জুড়ে থাকা স্মৃতি রয়ে যায় অমলিন। 

বকুলের সৌন্দর্য, স্নিগ্ধতা আর সুবাসের পাশাপাশি এর রয়েছে নানারকম ঔষধি গুণাবলিও। প্রাচীনকাল থেকেই ভেষজ ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসায় এর ফুল, ফল, পাতা, ছাল বিভিন্নভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। দাঁতের মাড়ির সুরক্ষায় বকুল ফল অত্যন্ত কার্যকরী। 

গাছের ছালের রস থেকে তৈরিকৃত ঔষধ ডায়রিয়া, জ্বরসহ দাঁতের বিভিন্ন সমস্যায় ব্যবহার হয়। শুকনো ফুলের গুঁড়ো মাথাব্যথা উপশমে এবং ছাল ও পাতার নির্যাস ত্বকের বিভিন্ন সমস্যায় ব্যবহারের লোকজ প্রচলন রয়েছে।

সময়ের স্রোতে বদলে গেছে অনেক কিছু। সেই চিরচেনা গাছটি এখন সংখ্যায় খুবই সীমিত। পুরনো কিছু বাড়ি, স্কুল-কলেজ প্রাঙ্গণে কিংবা কনক্রিটের শহরের মাঝে কিছু গাছের দেখা মিলে। তবুও গাছটি যেন তার ফুলের সৌন্দর্য আর নীরব প্রশান্তি নিয়ে অবলীলায় দাঁড়িয়ে থাকে। যাতে আমরা ঝরে পড়া ছোট্ট তারাগুলো কুড়িয়ে নিতে পারি কিছু পরিচিত অনুভবে, আর যত্ন করে রেখে দিতে পারি জীবনের পুরনো ডায়েরির ভাঁজে।