সাহাবিরা যেসব খেলাধুলা করতেন

সাহাবিরা যেসব খেলাধুলা করতেন

ছবি: সংগৃহীত

ইসলাম জীবনের ধর্ম, ফিতরতের ধর্ম। খেলাধুলা ইসলামে অনুমোদিত। শরীরচর্চার জন্য উপকারী খেলাধুলায় রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজেও উৎসাহিত করেছেন। শরীর সুস্থ রাখার প্রয়োজনে উপকারী খেলাধুলা ইসলামে জায়েজ, ক্ষেত্রবিশেষে তা প্রশংসনীয় এবং পছন্দনীয়।

যেসব খেলাধুলায় সময় নষ্ট হয় অথবা জুয়া ও বাজি ধরার মতো হারাম বিষয় বা হারাম আয় জড়িত থাকে, সেসব খেলাধুলা নাজায়েজ। খেলাধুলার সময় সতর ঢাকা থাকা আবশ্যক এবং কোনো ধরনের যৌন উসকানি থাকা নিষেধ। কবুতর বাজি ও পাশা খেলাসহ বেশ কিছু খেলা হাদিসে নিষেধ করা হয়েছে। যে খেলায় জীবনের ঝুঁকি থাকে, তাও ইসলামে নিষিদ্ধ। সেই সাথে খেলাধুলার কারণে যেন মানুষ আল্লাহ তায়ালার স্মরণ থেকে বিমুখ না হয়ে পড়ে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

এভাবে কিছু শর্ত সাপেক্ষে ইসলামে খেলাধুলা অনুমোদিত। নবী যুগে সাহাবিদের ভেতর খেলাধুলার দারুণ চর্চা ছিল। তারা নিয়মিত শরীরচর্চা করতেন এবং নবীজি (সা.) তাদেরকে এ বিষয়ে উৎসাহিত করতেন। ইতিহাসের পাতা উল্টালে এ ধরনের অনেক খেলাধুলার কথা পাওয়া যায়। নবী যুগে প্রচলিত কয়েকটি খেলা:

তীর নিক্ষেপ

নবী যুগে জনপ্রিয় খেলাধুলা ছিল তীর নিক্ষেপ। যুদ্ধবিদ্যার পাশাপাশি শরীরচর্চার জন্য সাহাবীরা এই খেলা চর্চা করতেন। রাসুলুল্লাহ (স.) তীর নিক্ষেপকে উৎসাহিত করে বলেন, ‘আল্লাহ একটি তীরের ওসিলায় তিনজন লোককে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন—তীর নির্মাতা যে নির্মাণকালে কল্যাণের আশা করেছে, এই তীর নিক্ষেপকারী এবং তা নিক্ষেপে সাহায্যকারী। তিনি আরও বলেন, তোমরা তীরন্দাজি করো ও ঘোড়দৌড় শিক্ষা করো। তবে তোমাদের ঘোড়দৌড় শেখার তুলনায় তীরন্দাজি শেখা আমার কাছে বেশি পছন্দনীয়।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ১৬৩৭)

সাঁতার

রাসুলুল্লাহ (সা.) সাঁতার শিখতে উৎসাহিত করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘প্রত্যেক এমন জিনিস, যাতে আল্লাহর স্মরণ নেই তা অর্থহীন বা ভুল, তবে চারটি বিষয় ছাড়া। তা হলো, হাতের নিশানা ঠিক করার উদ্দেশ্যে তীর খেলা, ঘোড়াকে প্রশিক্ষণ দেওয়া, স্ত্রীর সঙ্গে হাসি-কৌতুক করা, সাঁতার শেখা।’ (সুনানে কুবরা লিল-নাসায়ি: ৮৯৪০)

ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতা

আরবদের ভেতর ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতার অভ্যাস ছিল। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছেন। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ঘোড়ার দৌড় প্রতিযোগিতা করিয়েছেন। এই প্রতিযোগিতা হাফয়া থেকে শুরু হয়ে সানিয়্যাতুল বিদায় শেষ হতো। বর্ণনাকারী বলেন, আমি মুসা (রা.)-কে বললাম, এর দূরত্ব কী পরিমাণ হবে? তিনি বললেন, ছয় বা সাত মাইল। আর প্রশিক্ষণহীন ঘোড়ার প্রতিযোগিতা শুরু হতো সানিয়্যাতুল বিদা থেকে এবং শেষ হতো বনু জুরাইকের মসজিদে। আমি বললাম, এর মধ্যে দূরত্ব কত? তিনি বললেন, এক মাইল বা তার তদ্রূপ। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.)-ও এই প্রতিযোগীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৮৭০)

মল্লযুদ্ধ

ইসলামের শুরুর যুগে একটি প্রসিদ্ধ খেলা ছিল মল্লযুদ্ধ। মহানবী (সা.) নিজেও একবার মল্লযুদ্ধে অংশ নেন। মক্কার একজন বিখ্যাত মল্লযোদ্ধা ছিল রুকানা বিন ইয়াজিদ। একদিন মহানবী (স.) তাকে দীনের দাওয়াত দিলে সে তা প্রত্যাখ্যান করে। তখন রাসুলুল্লাহ (স.) তাকে বলেন, আমি যদি মল্লযুদ্ধে তোমাকে পরাজিত করি, তবে কি তুমি আল্লাহর ওপর ঈমান আনবে? রুকানা তাতে সম্মত হলো। অতঃপর মহানবী (স.) তাকে মল্লযুদ্ধে পরাজিত করেন। (সিরাতে ইবনে হিশাম: ১/৩৯০)

দ্রুত হাঁটার প্রতিযোগিতা

দীনের দাওয়াত, যুদ্ধের অভিযান ও জীবিকার অনুসন্ধান ইত্যাদি বিভিন্ন কাজে বের হওয়ার পর দ্রুত হাঁটার প্রতিযোগিতা হতো। দীনি কাজে বের হয়ে এমন প্রতিযোগিতা করাকে মহানবী (সা.) উৎসাহিত করেছেন। 

পশুর প্রশিক্ষণ

রাসুলুল্লাহ (সা.) বাহন হিসেবে ব্যবহৃত হয় এমন পশুকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার অনুমতি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘প্রত্যেক এমন জিনিস, যাতে আল্লাহর স্মরণ নেই তা অর্থহীন বা ভুল, তবে চারটি বিষয় ছাড়া। তা হলো, হাতের নিশানা ঠিক করার উদ্দেশ্যে তীর খেলা, ঘোড়াকে প্রশিক্ষণ দেওয়া, স্ত্রীর সঙ্গে হাসি-কৌতুক করা, সাঁতার শেখা।’ (সুনানে কুবরা লিল-নাসায়ি: ৮৯৪০)

ভারোত্তোলন

তৎকালীন আরব সমাজে ভারোত্তোলন প্রতিযোগিতাও ছিল। বলা হয়ে থাকে, সাহাবি জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা.)-এর মাথায় এই খেলার ধারণা প্রথম আসে। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) দৃষ্টিশক্তি হারানোর পর এমন একদল মানুষের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, যারা পাথর উত্তোলন করছিলেন। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন তাদের কী হয়েছে? একজন বলল, তারা পাথর উত্তোলন করছে এবং দেখছে তাদের মধ্যে কে বেশি শক্তিশালী। তিনি বলেন, আল্লাহর পথের কর্মীরা তাদের চেয়ে শক্তিশালী। (ইরওয়াউল গালিল: ৫/৩৩৩) 
 
নবী যুগে সাহাবীদের মধ্যে এ ধরনের বিভিন্ন শরীর চর্চামূলক খেলাধুলার অভ্যাস প্রচলিত ছিল। ইসলাম খেলাধুলাকে নিষেধ করে না, তবে একটি সুন্দর সীমারেখা টেনে দিয়েছে। বর্তমানে চারদিকে খেলাধুলার নামে জুয়া, বাজি, অশ্লীলতার সয়লাব, এই সময়ে নবী যুগের সুস্থ খেলাধুলার ইতিহাস আমাদের চোখ খুলে দেয়। বর্তমান যুগেও আমরা ফুটবল, ক্রিকেট বা ব্যাডমিন্টন খেলতে পারি, যদি তা আমাদের সালাত থেকে বিমুখ না করে এবং শরীয়ত যে সীমারেখা টেনে দিয়েছে তার লঙ্ঘন না হয়। একই সাথে হারাম কোন কিছু যুক্ত না হয়।