তীব্র তাপপ্রবাহে বিপর্যস্ত ইউরোপ, ফ্রান্সে পানিতে ডুবে ৪০ জনের মৃত্যু
সংগৃহীত
তীব্র তাপপ্রবাহে পুড়ছে ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশ। প্রচণ্ড গরম থেকে স্বস্তি পেতে নদী ও খালে নেমে ফ্রান্সে এ পর্যন্ত ৪০ জনের ডুবে মারা গেছেন। ফ্রান্স, স্পেন ও ইতালিতেও রেকর্ড তাপমাত্রায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। জারি করা হয়েছে রেড অ্যালার্ট।
তাপপ্রবাহে ফ্রান্স, স্পেন ও ইতালি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মঙ্গলবার ফ্রান্সে জুন মাসের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ২৯ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস গড় তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। এর আগের রাতে দেশটিতে সর্বোচ্চ উষ্ণ রাতের রেকর্ড হয়; সেদিন সর্বনিম্ন গড় তাপমাত্রা ছিল ২১ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বর্তমানে দেশের অর্ধেকেরও বেশি অঞ্চল সর্বোচ্চ সতর্কতা ‘রেড অ্যালার্ট’-এর আওতায় রয়েছে।
ফ্রান্সের ক্রীড়া ও যুববিষয়কমন্ত্রী মারিনা ফেরারি ফরাসি রেডিওকে বলেন, অনেক মানুষ ঝুঁকি বিবেচনা না করেই নদী ও খালে নেমে শরীর ঠান্ডা করার চেষ্টা করছেন। তাপপ্রবাহের সময় তত্ত্বাবধানহীন স্থানে সাঁতার কাটাকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই।
ফ্রান্সে মৃতদের মধ্যে ১৩ বছর বয়সী এক কিশোরী রয়েছে। রোববার সন্ধ্যায় পরিবারের সঙ্গে ফঁতেন-লা-পোর এলাকায় সেইন নদীতে নামলেও সাঁতার না জানায় ডুবে মৃত্যু হয় তার।
এ ছাড়া লিওনের কাছে রোন নদী থেকে উদ্ধার করা এক তরুণ পেশাদার ফুটবলার আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি আছেন। যেখানে সাঁতার নিষিদ্ধ, সেই এলাকায় নদীতে নেমে বিপদে পড়া চার তরুণকে উদ্ধারে জরুরি সেবাকর্মীরা অভিযান চালান।
ফ্রান্সের দক্ষিণাঞ্চলীয় কারপঁত্রা শহরে একটি পার্কিং এলাকায় পরিবারের গাড়ির ভেতর দুই ও চার বছর বয়সী দুটি শিশুর মরদেহ পাওয়া যায়। প্রচণ্ড গরমের কারণে তাদের মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ফ্রান্সের আবহাওয়া বিভাগ জানিয়েছে, দেশের ৯৬টি বিভাগের মধ্যে ৫৮টিতে রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে। প্যারিস অঞ্চলের প্রশাসনিক প্রধান ভ্যালেরি পেক্রেস মানুষকে অপ্রয়োজনে ভ্রমণ না করার এবং সম্ভব হলে বাসা থেকে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন।
প্রচণ্ড গরমের কারণে মঙ্গলবার প্যারিসের আইফেল টাওয়ার নির্ধারিত সময়ের আগেই বন্ধ করে দেওয়া হয়। একই কারণে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি দর্শনার্থীসমৃদ্ধ জাদুঘর ল্যুভরও বুধবার থেকে শনিবার পর্যন্ত আগেভাগে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
ল্যুভর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ঐতিহাসিক ভবনটি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলার জন্য পর্যাপ্তভাবে উপযোগী নয়। দিনের শেষ দিকে তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং বিপুল সংখ্যক দর্শনার্থীর কারণে ভেতরে তাপ আরও বেড়ে যায়।
তাপপ্রবাহের কারণে দক্ষিণ-পশ্চিম ফ্রান্সের গোলফেক পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রও সোমবার রাতে বন্ধ করে দেওয়া হয়। কারণ গারোন নদীর পানির তাপমাত্রা ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছানোর আশঙ্কা ছিল। ফরাসি আইন অনুযায়ী, রিয়্যাক্টর শীতলীকরণে ব্যবহৃত পানি এর বেশি গরম হতে পারে না।
স্পেনের কিছু অঞ্চলে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় আন্দালুসিয়া এবং উত্তরাঞ্চলের কান্তাব্রিয়া ও বাস্ক অঞ্চলে রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের কারণে ইউরোপের অন্যান্য দেশের তুলনায় স্পেন বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
স্পেনের রাষ্ট্রীয় আবহাওয়া সংস্থা অ্যামেট জানিয়েছে, ২০০০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে মূল ভূখণ্ডে জুন মাসে ১০টি তাপপ্রবাহ রেকর্ড করা হয়েছে। এর আগের ২৫ বছরে এমন ঘটনা ঘটেছিল মাত্র দুবার।
স্পেনে বুধবার থেকে তাপমাত্রা কমতে শুরু করলেও নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম ও জার্মানিতে সপ্তাহের শেষ দিকে তাপপ্রবাহ তীব্র আকার ধারণ করতে পারে।
ইতালির রোম, মিলান, ফ্লোরেন্স, তুরিন ও ভেনিসসহ ১৫টি শহরে রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে। এই সতর্কতা কেবল বয়স্ক বা অসুস্থ ব্যক্তিদের জন্য নয়, সুস্থ মানুষের জন্যও স্বাস্থ্যঝুঁকির ইঙ্গিত দেয়।
জার্মানিতেও তাপপ্রবাহের মধ্যে কয়েকজনের পানিতে ডুবে মৃত্যু হয়েছে। দেশটির পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে সপ্তাহের শেষ দিকে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে।
জার্মান লাইফসেভিং অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, গত শুক্রবার থেকে রোববারের মধ্যে ছয়টি প্রাণঘাতী সাঁতার দুর্ঘটনা ঘটেছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিবলিস শহরের কাছে রাইন নদী থেকে তিনটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের বয়স ছিল ২৩, ২৭ ও ৫০ বছর।
ইতালিতে সরকার কৃষি ও নির্মাণ খাতের শ্রমিকদের সুরক্ষায় জরুরি শ্রম সুরক্ষা ব্যবস্থা পুনরায় চালু করেছে। প্রচণ্ড গরমের কারণে যেসব প্রতিষ্ঠান কাজ বন্ধ বা সীমিত করবে, তারা সরকারি আর্থিক সহায়তা পাবে।
নেদারল্যান্ডসের আবহাওয়া বিভাগ দক্ষিণ ও মধ্যাঞ্চলে ‘কোড অরেঞ্জ’ সতর্কতা জারি করেছে। বেলজিয়ামেও জাতীয় ওজোন ও তাপপ্রবাহ পরিকল্পনার সতর্কতামূলক ধাপ চালু করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে, তবে ইউরোপ সবচেয়ে দ্রুত উষ্ণ হয়ে ওঠা মহাদেশ। ইউরোপে বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় তাপমাত্রা প্রায় দ্বিগুণ হারে বাড়ছে।
এর ফলে গ্রীষ্মকালীন তাপপ্রবাহ, পানির সংকট এবং দাবানলের ঝুঁকি বাড়ছে। গত বছর ইউরোপে ১০ লাখ হেক্টরের বেশি এলাকা পুড়ে যায়, যা একটি রেকর্ড। এ ক্ষেত্রে স্পেন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি।