টিনএজ সন্তানকে বুঝতে হলে আগে শুনতে হবে

টিনএজ সন্তানকে বুঝতে হলে আগে শুনতে হবে

ছবি: সংগৃহীত

বর্তমান সময়ে কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। পড়াশোনার চাপ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব, আত্মপরিচয়ের সংকট এবং পারিবারিক যোগাযোগের ঘাটতি অনেক সময় তাদের একাকিত্ব, উদ্বেগ ও হতাশার দিকে ঠেলে দেয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বয়সে সন্তানের সঙ্গে বাবা-মায়ের সম্পর্কের ধরন বদলানো জরুরি। ছোটবেলার মতো শুধু নির্দেশনা নয়, প্রয়োজন বোঝাপড়া ও সহমর্মিতা।

নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করুন

কিশোর-কিশোরীরা তখনই নিজেদের কথা খুলে বলে, যখন তারা অনুভব করে যে তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা হবে এবং তাড়াহুড়া করে বিচার করা হবে না। তাই কথা বলার সময় বাধা না দিয়ে ধৈর্য ধরে শুনুন। সঙ্গে সঙ্গে উপদেশ দেওয়ার পরিবর্তে তাদের অনুভূতি বোঝার চেষ্টা করুন।

“তুমি সবসময় ভুল করো” কিংবা “তোমার বয়সে আমি...” ধরনের মন্তব্য এড়িয়ে চলাই ভালো। এসব কথা অনেক সময় সন্তানকে আরও গুটিয়ে দেয়।

শোনা বেশি, বলা কম

অনেক বাবা-মা সন্তানের সমস্যা শুনেই সমাধান দিতে শুরু করেন। কিন্তু অধিকাংশ টিনএজার প্রথমে চায় কেউ তাদের অনুভূতি বুঝুক। প্রশ্ন করতে পারেন, “তোমার কেমন লাগছে?” অথবা “তুমি কী ভাবছো?”। আবার বলতে পারেন, “তুমি হয়তো অনেক চাপ অনুভব করছো।” এমন কথায় সন্তান নিজের মনের কথা বলার সুযোগ পায়।

প্রতিদিন ছোট ছোট সংযোগ গড়ে তুলুন

খোলামেলা সম্পর্ক একদিনে তৈরি হয় না। একসঙ্গে খাবার খাওয়া, হাঁটতে যাওয়া, পছন্দের কোনো সিনেমা দেখা কিংবা দিনে কিছু সময় মোবাইল ছাড়া গল্প করা সম্পর্ককে দৃঢ় করে। নিয়মিত ছোট ছোট যোগাযোগই একসময় বড় আস্থার ভিত্তি গড়ে তোলে।

ওপেন ডোর রুলস অনুসরণ করুন

সন্তানকে বোঝান, যে কোনো বিষয়ে সে আপনার কাছে আসতে পারে। তবে শুধু বললেই হবে না, আচরণেও তা প্রমাণ করতে হবে। সম্পর্ক, ভুল সিদ্ধান্ত বা কোনো ভয় নিয়ে কথা বললে অতিরিক্ত রাগ বা আতঙ্ক প্রকাশ না করে শান্তভাবে শুনুন। অন্যথায় তারা পরিবারের বাইরে সমর্থন খুঁজতে বাধ্য হতে পারে।

বিচার নয়, বোঝার চেষ্টা

টিনএজাররা সবচেয়ে বেশি ভয় পায় সমালোচনা ও বিচারকে। তাই “তুমি ভুল করেছো” বলার বদলে বলতে পারেন, “এই জায়গাটা আরও ভালোভাবে করা যেত, তোমার কী মনে হয়?” কথার ধরন বদলালে যোগাযোগের পরিবেশও বদলে যায়।

নিয়ন্ত্রণ নয়, চাই দিকনির্দেশনা

কৈশোরে স্বাধীনভাবে চিন্তা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার চাহিদা তৈরি হয়। তাই “এটাই করতে হবে” বলার পরিবর্তে “তোমার মতে কোনটা ভালো হবে?” প্রশ্নটি বেশি কার্যকর হতে পারে। এতে তারা দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত নিতে শেখে এবং নিজের মতামতের মূল্য অনুভব করে।

আবেগ নিয়ন্ত্রণ শেখান

এই বয়সে আবেগের তীব্রতা বেশি থাকে। কিন্তু সেই আবেগ কীভাবে সামলাতে হবে, তা অনেকেই জানে না। রাগ, দুঃখ বা হতাশা চিহ্নিত করা এবং সেগুলো স্বাস্থ্যকর উপায়ে প্রকাশ করা শেখানো জরুরি। যেমন, ডায়েরি লেখা, বিশ্বস্ত কারও সঙ্গে কথা বলা বা হাঁটতে যাওয়া।

ডিজিটাল জগতকে বুঝুন

আজকের কিশোরদের জীবনের বড় একটি অংশ অনলাইনে কাটে। তাই শুধু নিষেধাজ্ঞা নয়, প্রয়োজন সচেতনতা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সুবিধা ও ঝুঁকি নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করুন। বয়স উপযোগী নিয়ম তৈরি করুন এবং পরিবারের সবাই মিলে স্বাস্থ্যকর ডিজিটাল অভ্যাস গড়ে তুলুন। বাবা-মায়ের নিজের আচরণও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

সতর্ক সংকেতগুলো খেয়াল করুন

যদি সন্তান হঠাৎ খুব চুপচাপ হয়ে যায়, স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি একা থাকতে চায়, মেজাজে অস্বাভাবিক পরিবর্তন আসে বা আগে পছন্দের কাজগুলোতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে, তাহলে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিন।

শান্তভাবে কথা বলুন এবং তাকে বোঝান যে আপনি তার পাশে আছেন। প্রয়োজন হলে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সহায়তা নিতে দ্বিধা করবেন না।

নিঃশর্ত গ্রহণযোগ্যতা দিন

প্রতিটি সন্তানের জানা দরকার যে ভুল করলেও সে পরিবারের কাছে গ্রহণযোগ্য ও নিরাপদ। এর অর্থ এই নয় যে সব ভুলকে প্রশ্রয় দিতে হবে। বরং ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধের মধ্যে ভারসাম্য রেখে তাকে সঠিক পথে এগিয়ে যেতে সাহায্য করতে হবে।

সন্তানের সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তি যদি হয় আস্থা, সম্মান ও খোলামেলা যোগাযোগ, তাহলে কৈশোরের অনেক চ্যালেঞ্জই সহজে মোকাবিলা করা সম্ভব।