মোবাইলে দেখে দোয়া পড়া যাবে?
ফাইল ফটো
স্মার্টফোন এখন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কোরআন তেলাওয়াত, হাদিস অধ্যয়ন ও ইসলামি বই পড়া থেকে শুরু করে বিভিন্ন দোয়া ও জিকিরও অনেকেই মোবাইল ফোনে সংরক্ষণ করে রাখেন। ফলে একটি সাধারণ প্রশ্ন প্রায়ই শোনা যায়- মোবাইলে দেখে দোয়া পড়া যাবে কি? এতে কি দোয়ার সওয়াব কমে যায় বা কোনো শরয়ি সমস্যা সৃষ্টি হয়?
ইসলামের দৃষ্টিতে দোয়া হলো বান্দার পক্ষ থেকে আল্লাহর কাছে বিনয়, প্রয়োজন ও আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ। দোয়া কবুল হওয়ার জন্য মুখস্থ হওয়া শর্ত নয়; বরং গুরুত্বপূর্ণ হলো দোয়ার অর্থ বোঝা, আন্তরিকতা ও আল্লাহর প্রতি একাগ্রতা। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।’ (সুরা গাফির: ৬০) এ আয়াতে দোয়ার প্রতি উৎসাহ দেওয়া হয়েছে, তবে দোয়া মুখস্থ হতে হবে-এমন কোনো শর্ত আরোপ করা হয়নি।
মোবাইল দেখে দোয়া পড়ার বিধান কী?
ফিকহবিদদের আলোচনায় দেখা যায়, কোনো ব্যক্তি যদি দোয়া মুখস্থ না জানেন বা দীর্ঘ কোনো মাসনুন দোয়া পড়তে চান, তাহলে বই, কাগজ বা অন্যকোনো মাধ্যম দেখে দোয়া পড়তে পারেন। সমসাময়িক আলেমরাও মোবাইল ফোনকে একই বিধানের অন্তর্ভুক্ত বলে উল্লেখ করেছেন। কারণ মোবাইল মূলত একটি মাধ্যম, যার সাহায্যে দোয়ার পাঠ সামনে রাখা হয়।
তাই দোয়ার শব্দ বা বাক্য মনে না থাকলে মোবাইল দেখে দোয়া পড়ায় শরিয়তের দৃষ্টিতে কোনো অসুবিধা নেই। বিশেষ করে সকাল-সন্ধ্যার জিকির, ঘুমের দোয়া, সফরের দোয়া, ইস্তেগফার, দরুদ কিংবা কোরআন-হাদিসে বর্ণিত দীর্ঘ দোয়াগুলো মোবাইল দেখে পড়া বৈধ
অজু ও পবিত্রতার বিধান
মোবাইল থেকে দোয়া পড়তে অজু শর্ত নয়। তবে যথাযথ সম্মান ও সতর্কতা বজায় রাখা উচিত। বিশেষ করে মোবাইলে কোরআনের আয়াত প্রদর্শিত থাকলে অনেক ফকিহের মতে অপবিত্র অবস্থায় তা স্পর্শ করা জায়েজ নয়। তাই বিশেষ করে মোবাইলে কোরআনের আয়াত বা কোরআন থেকে নেওয়া দোয়া প্রদর্শিত থাকলে পবিত্রতার প্রতি যত্নবান থাকা উচিত।
টয়লেটে মোবাইল নেওয়া কি যাবে?
যেহেতু মোবাইলে দোয়া বা কোরআনের অ্যাপ থাকে, তাই এটি নিয়ে বাথরুমে যাওয়া যাবে কি না- তা নিয়েও অনেকে দ্বিধায় থাকেন। শরিয়তের বিধান হলো, যতক্ষণ পর্যন্ত মোবাইলের স্ক্রিনে কোরআনের আয়াত বা দোয়া দৃশ্যমান না থাকে, ততক্ষণ মোবাইল সঙ্গে নিয়ে টয়লেটে যাওয়ায় কোনো গুনাহ নেই।
মুখস্থ পড়া নাকি মোবাইল দেখে পড়া-কোনটি উত্তম?
আলেমদের মতে, মুখস্থ থাকলে দোয়ার সময় বারবার পর্দার দিকে তাকানোর প্রয়োজন হয় না। এতে মনোযোগ, খুশু ও একাগ্রতা বেশি বজায় থাকে। তাই মুখস্থ দোয়া মুখস্থ পড়াই উত্তম।
তবে মুখস্থ না থাকার কারণে দোয়া ছেড়ে দেওয়ার চেয়ে মোবাইল দেখে দোয়া পড়া নিঃসন্দেহে উত্তম। কারণ দোয়া নিজেই একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত, আর মোবাইল এখানে কেবল সহায়ক মাধ্যম।
মোবাইল ব্যবহারে সতর্কতা
১. মনোযোগ ঠিক রাখা: নোটিফিকেশন, কল বা বার্তা যেন মনোযোগ নষ্ট না করে, সে জন্য দোয়ার সময় ফোন ‘সাইলেন্ট’ বা ‘ডু নট ডিস্টার্ব’ মোডে রাখা ভালো।
২. নির্ভরযোগ্য উৎস ব্যবহার: ইন্টারনেটে অনেক সময় ভুল দোয়া বা জাল হাদিস ছড়িয়ে থাকে। তাই কোনো অ্যাপ বা ওয়েবসাইট থেকে দোয়া পড়ার আগে তার নির্ভরযোগ্যতা যাচাই করে নেওয়া উচিত।
৩. অর্থ বোঝার চেষ্টা করা: শুধু শব্দ পড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে দোয়ার অর্থ বোঝার চেষ্টা করা এবং হৃদয়ের গভীর আন্তরিকতা বজায় রাখা জরুরি। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘দোয়াই ইবাদত।’ (সুনানে তিরমিজি: ২৯৬৯)
অর্থাৎ দোয়ার মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর সঙ্গে বান্দার সম্পর্ককে দৃঢ় করা। তাই দোয়া মোবাইল দেখে পড়া হোক বা মুখস্থ পড়া হোক- এটি মূল বিষয় নয়; বরং গুরুত্বপূর্ণ হলো আল্লাহর প্রতি আন্তরিকতা, বিনয় এবং আশা নিয়ে তাঁর কাছে প্রার্থনা করা।
শেষ কথা
মোবাইল দেখে দোয়া পড়া শরিয়তসম্মত এবং এতে কোনো গুনাহ নেই। মুখস্থ না থাকলে কিংবা দীর্ঘ কোনো দোয়া পড়তে চাইলে মোবাইলকে সহায়ক মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে দোয়ার সময় আদব রক্ষা করা, মনোযোগ, খুশু ও আন্তরিকতা বজায় রাখার চেষ্টা করা উচিত। কারণ দোয়ার সৌন্দর্য ও গ্রহণযোগ্যতার মূল ভিত্তি হলো বান্দার আন্তরিকতা, খুশু এবং আল্লাহর প্রতি নির্ভরতা।