আজতেকার আলো-আঁধারিতে ওচোয়ার আবেগঘন ‘সমাপ্তি’
ফাইল ছবি
ম্যাচটি তখন প্রথমার্ধের বিরতিতে। আচমকাই এস্তাদিও আজতেকা স্টেডিয়ামের মূল আলোগুলো নিভিয়ে দেওয়া হলো। লাউডস্পিকারে বেজে উঠল ধ্রুপদী অর্কেস্ট্রার সুর। গ্যালারিতে বসা হাজার হাজার মেক্সিকান সমর্থক তাঁদের মোবাইলের ফ্ল্যাশলাইট জ্বালিয়ে সুরের তালে তালে দুলতে লাগলেন, গাইতে লাগলেন সমবেত গান। পিচের ওপর তখন মেক্সিকোর বদলি খেলোয়াড়রা গা গরম করতে ব্যস্ত, বিজ্ঞাপনী বোর্ডের মৃদু আলোই তাদের একমাত্র ভরসা।
সবাই যখন অনুশীলনে মগ্ন, তখন মাঠের এক প্রান্তে শুধু একজন মানুষ স্থির দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি আর কেউ নন, মেক্সিকোর কিংবদন্তি গোলরক্ষক গিলিয়ার্মো ওচোয়া।
আকাশের দিকে মুখ তুলে ধীর পায়ে চারপাশটা ঘুরে দেখছিলেন ওচোয়া। আজতেকার সেই আলো-আঁধারিতে স্টেডিয়ামের জায়ান্ট স্ক্রিনে যখন তাঁর মুখটা ভেসে উঠল, তখন কি তাঁর চোখের কোণে জল ছিল? দূর থেকে তা নিশ্চিত হওয়া না গেলেও, তাঁর চোখে যে এক অদ্ভুত বিস্ময় আর কৃতজ্ঞতা ছিল, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। গ্যালারির হাজার হাজার ভক্তের ভালোবাসার চাদরে নিজেকে যেন সঁপে দিয়েছিলেন তিনি।
খুব বেশি এমন রাত ওচোয়ার ক্যারিয়ারে আর বাকি নেই। আগামী সপ্তাহেই তিনি পা দেবেন ৪১ বছরে। এটি তাঁর ষষ্ঠ বিশ্বকাপ এবং এটিই তাঁর শেষ। এই বিশ্বযজ্ঞ শেষ হলেই মেক্সিকোর চেনা জার্সিটা চিরতরে তুলে রাখবেন তিনি, ইতি টানবেন পেশাদার ফুটবল ক্যারিয়ারেরও। মেক্সিকান ফুটবলের অন্যতম সেরা এক রোমাঞ্চকর গল্প এবং দেশের মানুষের সাথে এক নিবিড় ভালোবাসার সম্পর্কের অবসান ঘটবে এর মাধ্যমে। তাই আজতেকার মাঠের প্রতিটি ধূলিকণা যেন মন ভরে উপভোগ করছিলেন এই প্রবীণ প্রাচীর।
২০০৪ সালে এই আজতেকা স্টেডিয়ামেই ক্লাব আমেরিকার হয়ে ওচোয়ার পেশাদার ক্যারিয়ারের সূচনা হয়েছিল। এর মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে এই মাঠেই অভিষেক হয় মেক্সিকো জাতীয় দলেও। ক্ষিপ্র রিফ্লেক্স আর অসীম সাহসিকতা তাঁকে রাতারাতি মেক্সিকানদের চোখের মণি বানিয়ে তোলে। জর্জ ক্যাম্পোসের মতো ওচোয়াও প্রমাণ করেছিলেন, গোলপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে বাজপাখি হতে হলে বিশাল উচ্চতার প্রয়োজন হয় না, শুধু অদম্য ইচ্ছাশক্তিই যথেষ্ট।
২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপে ওচোয়া রাতারাতি বৈশ্বিক সুপারস্টারে পরিণত হন। ২০০৬ ও ২০১০ বিশ্বকাপের হতাশা ভুলে ফোর্টালেজায় ব্রাজিলের একের পর এক আক্রমণ যেভাবে তিনি রুখে দিয়েছিলেন, তা ফুটবল ইতিহাসে কিংবদন্তি গর্ডন ব্যাঙ্কসের সাথে তুলনায় জায়গা করে নেয়। ক্লাব ফুটবলে হয়তো বড় বড় ইউরোপীয় ক্লাবে খেলা হয়নি তাঁর, কিন্তু দেশের জার্সিতে তিনি সবসময়ই ছিলেন এক অবিচল পাহাড়। ২০১৮ ও ২০২২ বিশ্বকাপেও তিনি ছিলেন মেক্সিকোর ত্রাতা। দেশের হয়ে ১৫০-এর বেশি ম্যাচ খেলা ওচোয়া সবসময় ভক্তদেরই একজন হয়ে মাঠে লড়েছেন।
ফিফাকে দেওয়া সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে ওচোয়া বলেছিলেন, "জাতীয় দল সবসময়ই আমার কম্পাস (দিকনির্ণায়ক) ছিল। এটি আমাকে পথ দেখিয়েছে। এই জার্সিটা ছাড়া আমার ক্যারিয়ার কেমন হতো, আমি জানি না।"
অথচ এই বিশ্বকাপের দলেও তাঁর থাকা নিয়ে এক সময় বড় সংশয় ছিল। ২০১৫ সালের শেষের দিকে তিনি রাউল রাঙ্গেল, লুইস অ্যাঞ্জেল মালাগনদের পেছনে পড়ে মেক্সিকোর চার নম্বর গোলরক্ষকে পরিণত হয়েছিলেন। কিন্তু মূল কিপার মালাগনের আকস্মিক ইনজুরি ওচোয়ার জন্য এমন এক বন্ধ দরজা খুলে দেয়, যা তিনি নিজেও ভাবেননি। মেক্সিকোর কোচ হাভিয়ের আগুইরে এই তরুণ দলে ওচোয়ার অভিজ্ঞতাকে এক অন্যতম কৌশল হিসেবে যুক্ত করেন। দলের ১৭ বছর বয়সী মিডফিল্ডার গিলবার্তো মোরা যেমনটা বলছিলেন, "ওচোয়া আমার আইডল। তাঁর সাথে ড্রেসিংরুম শেয়ার করা স্বপ্নের মতো।"
তরুণদের পথ দেখানো আর ড্রেসিংরুমে ইতিবাচক শক্তি জোগানো- ওচোয়া হয়তো এই ভূমিকাতেই খুশি থাকতেন। কিন্তু বিধাতা তাঁর জন্য অন্য এক সমাপ্তি লিখে রেখেছিলেন। প্রথম দুই ম্যাচ জিতে মেক্সিকো এক ম্যাচ হাতে রেখেই গ্রুপ ‘এ’-র চ্যাম্পিয়ন হওয়া নিশ্চিত করায় চেক প্রজাতন্ত্রের বিপক্ষে শেষ ম্যাচে ওচোয়াকে বদলি হিসেবে মাঠে নামার সুযোগ করে দেন কোচ।
৪০ বছর বয়সে ৬টি ভিন্ন বিশ্বকাপে খেলার রাজকীয় রেকর্ডের রাতে আজতেকা স্টেডিয়াম ওচোয়াকে দিল এক পরম উপহার। নিজের প্রিয় চেনা মাঠে ভক্তদের সাথে ওচোয়ার এই শেষ যোগাযোগ ফুটবল ইতিহাসে এক অমর অধ্যায় হয়েই থাকবে।