জেনেভা ক্যাম্পে আশুরা স্মরণ
সংগৃহীত
হাজারো মানুষের পদচারণা, বুক চাপড়ে শোক প্রকাশ, উর্দু শায়েরির করুণ সুর আর কারবালার স্মৃতিবাহী প্রতীকী তাজিয়ায় মুখর হয়ে ওঠে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প এলাকা।
শুক্রবার (২৬ জুন) জুমার নামাজের পর থেকেই জড়ো হতে শুরু করেন জেনেভা ক্যাম্পের বাসিন্দারা। তরুণ ও কিশোরাদের ঢোল বাজাতে দেখা যায়।
এ সময় ‘হায় হোসাইন, ইয়া হোসাইন’ ধ্বনিতে পুরো এলাকায় প্রকম্পিত হয়। মাথায় লাল-কালো শোকের ফিতা, হাতে কারবালার নিশান এবং সামনে বিশালাকার প্রতীকী তাজিয়া নিয়ে মিছিলটি ক্যাম্পের মোড় থেকে শুরু হয় মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট গিয়ে শেষ হয়।
মিছিলে ছিল কারবালার স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে প্রতীকী দুলদুল ঘোড়া, পানির মশক এবং বিভিন্ন শোকপতাকা। প্রশাসনের নিরাপত্তা নির্দেশনা মেনে এবারও কোনো ধারালো অস্ত্র বা আত্মপ্রহার ছাড়াই শান্তিপূর্ণভাবে শোক প্রকাশ করেন অংশগ্রহণকারীরা। বুক চাপড়ে প্রতীকী মাতম, মার্সিয়া পাঠ এবং দোয়া-মোনাজাতের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয় আয়োজনটি।
জেনেভা ক্যাম্পের তাজিয়া মিছিলে অংশ নেওয়া সত্তর বছর বয়সী এহসান উল্লাহ খারকি বলেন, “আমাদের বাপ-দাদারা যখন এখানে বসতি গড়েন, তখন থেকেই এই তাজিয়া মিছিলের রেওয়াজ চলে আসছে। সারা বছর নানা কষ্টের মধ্যে থাকি, কিন্তু মহররম এলে আমরা কারবালার কথা স্মরণ করি। ইমাম হোসাইন (রা.) অন্যায়ের সামনে মাথা নত করেননি। তাঁর সেই ত্যাগ ও আদর্শ আজও আমাদের ধৈর্য আর সাহস জোগায়।”
জেনেভা ক্যাম্পের তাজিয়া মিছিলের সবচেয়ে স্বতন্ত্র দিক হলো উর্দু ভাষার ঐতিহ্যবাহী শোকগাঁথা। ঢাকার অন্যান্য এলাকার মিছিলে যেখানে বাংলা ও আরবি শোকসংগীতের প্রাধান্য দেখা যায়, সেখানে জেনেভা ক্যাম্পে উর্দু মার্সিয়ার সুর এক ভিন্ন আবেগের জন্ম দেয়।”
মিছিলে অংশ নেওয়া তরুণ তানজিল হোসাইন বলেন, “আমরা এখন বাংলা ও উর্দু দুই ভাষাতেই কথা বলি। কিন্তু আশুরার দিনে আমাদের মার্সিয়ার সুর পুরো পরিবেশ বদলে দেয়। যখন ঐতিহ্যবাহী শোকগাঁথা গাওয়া হয়, তখন মনে হয় আমরা যেন কারবালার সেই ইতিহাসকে অনুভব করছি। এটি শুধু ধর্মীয় অনুষঙ্গ নয়, আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যেরও অংশ।”
কারবালার প্রান্তরে ইমাম হোসাইন (রা.) ও তাঁর সঙ্গীদের তৃষ্ণার্ত অবস্থার স্মরণে ক্যাম্পের বিভিন্ন স্থানে বসানো শরবতের বড় ড্রাম। সেখানে পথচারী ও মিছিলে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে বিনামূল্যে পানি, শরবত ও খাবার বিতরণ করা হয়। এ আয়োজনকে ঘিরে তৈরি হয় এক অনন্য সম্প্রীতির পরিবেশ।
শরবত বিতরণে ব্যস্ত মোছা. তানজুম্মান হাতুন বলেন, “আমরা এখানে সবাই মিলে এই আয়োজন করি। কারবালার শিক্ষা হলো ত্যাগ, মানবতা আর ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো। তাই শিয়া-সুন্নি ভেদাভেদ না করে আমরা সবাই একসঙ্গে শরবত ও খাবার বিতরণ করি। এই দিনটি আমাদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ আরো দৃঢ় করে।”