যেভাবে পাকিস্তানি পতাকা প্রদর্শন আটকে দিয়েছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার

যেভাবে পাকিস্তানি পতাকা প্রদর্শন আটকে দিয়েছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার

ছবি: সংগৃহীত

একাত্তরের মার্চ মাস। বাংলার আকাশ-বাতাস স্লোগানে উত্তাল। চারদিকে বুলেটের গর্জন। উত্তাল দিনগুলোর মধ্যে ২৩ মার্চ—তৎকালীন ‘পাকিস্তান দিবস’। প্রথা অনুযায়ী, এই দিনে সারা দেশে পাকিস্তানি পতাকা ওড়ানোর বাধ্যবাধকতা ছিল। টেলিভিশনের পর্দায় বাজানো হতো পাকিস্তানের জাতীয় সংগীত। কিন্তু সেবার ঠিক রাত ১২টায় বাজল না পাকিস্তানের জাতীয় সংগীত। নিয়ম ভাঙার মতো দুঃসাহসিক কাজটি করেছিলেন সদ্য প্রয়াত মুস্তফা মনোয়ার।

সেই রাতে কী ঘটেছিল?
সাধারণত প্রতিদিন রাত ঠিক ১১টা ৫৫ মিনিটে টেলিভিশনের সব অনুষ্ঠান শেষ হতো। এরপর পাকিস্তানের জাতীয় সংগীত আর পতাকার ছবি দেখিয়ে সম্প্রচার বন্ধ করা হতো। সেদিন ১১টা ৫৫ মিনিট পার হয়ে গেল কিন্তু টেলিভিশন বন্ধ হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই! ডিআইটি (বর্তমান রাজউক) ভবনের নিচে পাহারারত পাকিস্তানি সেনারা তখন বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছিল।

টেলিভিশনের সম্প্রচার কক্ষ থেকে মুস্তফা মনোয়ারের নির্দেশে একের পর এক গান ও অন্যান্য রেকর্ড করা অনুষ্ঠান চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে। উদ্দেশ্য একটাই—যেকোনো মূল্যে সময়ক্ষেপণ করা, যেন ২৩ মার্চ পার হয়ে যায়।

টেলিভিশন কেন বন্ধ হচ্ছে না, তা পরীক্ষা করতে পাকিস্তানি সেনারা দফায় দফায় স্টুডিওর ভেতরে আসছিল। তারা বোঝার চেষ্টা করছিল ঠিক কী ঘটছে। প্রতিবারই মুস্তফা মনোয়ার ও তাঁর সহযোগীরা অত্যন্ত শান্ত মুখে যান্ত্রিক গোলযোগের অজুহাত দেখিয়ে তাঁদের বিদায় করছিলেন। পর্দার পেছনে তখন রুদ্ধশ্বাস মুহূর্ত; একটু ভুল হলেই নিশ্চিত মৃত্যু।

অবশেষে অপেক্ষার অবসান হলো। ঘড়ির কাঁটা টিকটিক করে রাত ১২টা পেরিয়ে স্পর্শ করল ২৪ মার্চকে। সফল হলেন মুস্তফা মনোয়ার। পাকিস্তান দিবসের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটল ক্যালেন্ডারের পাতায়। এরপর রাত ১২টা ৪৫ মিনিটের দিকে অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে পতাকা প্রদর্শন করে সেদিনের কার্যক্রম শেষ করা হয়।

বার্ধক্যজনিত ও বিভিন্ন শারীরিক জটিলতার কারণে সোমবার (২৯ জুন) ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তাঁর প্রয়াণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের শিল্প ও সংস্কৃতির একটি সোনালি অধ্যায়ের অবসান ঘটল।

মুস্তফা মনোয়ার ১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর তৎকালীন নদীয়া জেলার (বর্তমান ঝিনাইদহ জেলার মনোহরপুর গ্রামে) জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা কবি গোলাম মোস্তফা ছিলেন বাংলাদেশের অন্যতম প্রখ্যাত সাহিত্যিক। পারিবারিক সাংস্কৃতিক আবহে বড় হওয়া মুস্তফা মনোয়ার কলকাতার সরকারি চারুকলা কলেজ থেকে ফাইন আর্টসে স্বর্ণপদকসহ প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে ডিগ্রি লাভ করেন।

টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব, নাট্যনির্দেশক ও চিত্রশিল্পী হিসেবে তিনি আজীবন কাজ করেছেন। বাংলাদেশে পাপেট থিয়েটার প্রতিষ্ঠা এবং টেলিভিশনে শিশুদের উপযোগী অসংখ্য জনপ্রিয় অনুষ্ঠান (যেমন: ‘মনের কথা’) তৈরির কারিগর তিনি।

শিল্পকলায় অনন্য অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাঁকে একুশে পদক (২০০৪) প্রদান করে।