জানাজায় বেশি মানুষ হলে কী হয়?
ফাইল ছবি
ইসলামে জানাজার নামাজ জীবিত মুসলমানদের পক্ষ থেকে মৃতব্যক্তির জন্য মহান আল্লাহর দরবারে সম্মিলিতভাবে মাগফিরাত ও রহমতের আবেদন। হাদিসে এসেছে, জানাজায় যত বেশি মুসলিম শরিক হন এবং আন্তরিকভাবে মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করেন, ততই তার জন্য আল্লাহর রহমত ও ক্ষমা লাভের আশা বৃদ্ধি পায়।
জানাজায় ১০০ জন মুসলিমের অংশগ্রহণ
জানাজায় অধিকসংখ্যক মুসল্লির উপস্থিতি মৃত ব্যক্তির জন্য বিশেষ সুপারিশের কারণ।
উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘যে মৃত ব্যক্তির জানাজায় একশজন মুসলমান অংশ নেয় এবং সবাই তার জন্য আল্লাহর কাছে সুপারিশ (ক্ষমা প্রার্থনা) করে, আল্লাহ তাদের সুপারিশ কবুল করেন।’ (সহিহ মুসলিম: ২০৮৭)
অর্থাৎ, অধিকসংখ্যক মুসলমানের আন্তরিক দোয়া মৃত ব্যক্তির জন্য আল্লাহর রহমত লাভের একটি বড় মাধ্যম।
আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক না করা ৪০ জন মুসলমানের দোয়া
অন্য এক হাদিসে সংখ্যাটি আরও কমিয়ে আল্লাহর রহমতের কথা জানানো হয়েছে।
হজরত আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘কোনো মুসলমান মারা গেলে তার জানাজায় যদি এমন চল্লিশজন লোক উপস্থিত হয়, যারা আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করে না, আল্লাহ ওই মৃত ব্যক্তির ব্যাপারে তাদের সুপারিশ (দোয়া) কবুল করেন।’ (সহিহ মুসলিম: ২০৮৮)
এই হাদিসে আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক না করা মুসলমানদের আন্তরিক দোয়ার গুরুত্ব বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
একশ নাকি চল্লিশ, দুটি হাদিসের মধ্যে কি বিরোধ আছে?
দুটি হাদিসে ভিন্ন সংখ্যার উল্লেখ থাকলেও মুহাদ্দিসদের মতে এর মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। বরং এটি আল্লাহর রহমতের ব্যাপকতারই প্রমাণ। কেউ কেউ ব্যাখ্যা করেছেন, প্রথমে একশজনের কথা জানানো হয়েছিল; পরে উম্মতের প্রতি রহমতস্বরূপ তা চল্লিশজনে সহজ করা হয়। মূল শিক্ষা হলো- উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ঈমানদার মুসলমানের আন্তরিক দোয়া আল্লাহর কাছে অত্যন্ত মূল্যবান।
বেশি মানুষ হলেই কি মাগফিরাত নিশ্চিত?
হাদিসে একশ বা চল্লিশ মুমিনের দোয়া কবুল হওয়ার সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, কোনো ব্যক্তির পরকালীন পরিণতি সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে রায় দেওয়া যাবে। এসব হাদিস মূলত আল্লাহর রহমত লাভের একটি সুসংবাদ ও আশা প্রকাশ করে। চূড়ান্ত ফয়সালা একমাত্র আল্লাহ তাআলার। তিনি প্রত্যেক মানুষের ঈমান, আমল ও অন্তরের অবস্থা সম্পর্কে সর্বাধিক অবগত।
মৃত ব্যক্তি সম্পর্কে মুসলমানদের ভালো সাক্ষ্যের গুরুত্ব
জানাজায় উপস্থিতির বাইরেও মৃত ব্যক্তি সম্পর্কে সাধারণ মুসলমানদের স্বতঃস্ফূর্ত ভালো সাক্ষ্য ইসলামে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
সহিহ বুখারিতে বর্ণিত হয়েছে, নবী (স.)-এর পাশ দিয়ে একটি জানাজা নিয়ে যাওয়া হলে সাহাবিরা ওই ব্যক্তির প্রশংসা করেন। তখন তিনি বলেন, ‘ওয়াজাবাত’ (অবধারিত হয়ে গেছে)। পরে আরেকটি জানাজা যাওয়ার সময় লোকেরা তার সমালোচনা করলে তিনি আবারও বলেন, ‘ওয়াজাবাত’।
হজরত ওমর (রা.) কারণ জানতে চাইলে রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘প্রথম ব্যক্তির প্রশংসা করায় তার জন্য জান্নাত অবধারিত হয়েছে এবং দ্বিতীয় ব্যক্তির সমালোচনা করায় তার জন্য জাহান্নাম অবধারিত হয়েছে। তোমরা পৃথিবীতে আল্লাহর সাক্ষী।’ (সহিহ বুখারি: ১৩৬৭)
এই হাদিসের শিক্ষা হলো- আল্লাহ যাঁর কল্যাণ চান, তাঁর প্রতি মানুষের অন্তরে ভালোবাসা ও উত্তম সাক্ষ্য সৃষ্টি করে দেন। তাই কোনো মৃত ব্যক্তির ব্যাপারে মুসলমানদের স্বতঃস্ফূর্ত ভালো সাক্ষ্য তার উত্তম পরিণতির একটি আশাব্যঞ্জক লক্ষণ হতে পারে। তবে চূড়ান্ত ফয়সালা একমাত্র আল্লাহ তাআলার।
কম মানুষ হলেও অন্তত তিন কাতার করা
সব সময় জানাজায় অনেক মানুষ উপস্থিত নাও থাকতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে সুন্নাহ হলো উপস্থিত মুসল্লিদের অন্তত তিনটি কাতারে ভাগ করা।
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘কোনো মৃত ব্যক্তির জানাজায় যদি মুসলমানদের তিনটি সারি (কাতার) হয়, তবে তার জন্য (জান্নাত) অবধারিত হয়ে যায়।’ (সুনানে আবু দাউদ: ৩১৬৬; জামে তিরমিজি: ১০২৮)
মুহাদ্দিসরা ব্যাখ্যা করেছেন, এর অর্থ হলো- মৃত ব্যক্তি আল্লাহর রহমত ও জান্নাত লাভের সুসংবাদ পান। তবে চূড়ান্ত ফয়সালা একমাত্র আল্লাহ তাআলার।
লোকদেখানো নয়, মূল উদ্দেশ্য মাগফিরাত
জানাজার নামাজে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি কাম্য, তবে এটি কখনোই সামাজিক মর্যাদা বা লোকদেখানোর প্রতিযোগিতার বিষয় নয়। জানাজার মূল উদ্দেশ্য হলো মৃত ব্যক্তির জন্য আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে মাগফিরাত প্রার্থনা করা। তাই জানাজাকে লোকসমাগমের প্রদর্শনীতে পরিণত করা ইসলামের শিক্ষা নয়।
জানাজায় অংশগ্রহণকারীদের জন্যও বিশাল প্রতিদান
জানাজায় অংশ নেওয়া শুধু মৃত ব্যক্তির জন্য নয়; এতে অংশগ্রহণকারীও বিপুল সওয়াব লাভ করেন।
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি জানাজার নামাজ আদায় করে, সে এক কিরাত সওয়াব লাভ করে। আর যে ব্যক্তি জানাজার সঙ্গে থেকে দাফন পর্যন্ত উপস্থিত থাকে, সে দুই কিরাত সওয়াব লাভ করে।’ সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, ‘দুই কিরাত কী?’ তিনি বললেন, ‘দুটি বিশাল পাহাড়সম সওয়াব; যার ক্ষুদ্রতমটিও উহুদ পাহাড়ের সমান।’ (সহিহ বুখারি, কিতাবুল জানায়িজ; সহিহ মুসলিম)
মুমিনের প্রতি মুমিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ হক
জানাজার নামাজ ফরজে কিফায়া। এটি এক মুমিনের প্রতি অন্য মুমিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হক। সমাজে এই ইবাদত মৃত ব্যক্তির জন্য যেমন রহমতের কারণ, তেমনি জীবিতদের মৃত্যু, আখেরাত ও আল্লাহর সামনে উপস্থিত হওয়ার বাস্তবতাও স্মরণ করিয়ে দেয়।
তাই পরিচিত, প্রতিবেশী কিংবা আত্মীয় যে-ই হোন না কেন, কোনো মুসলমানের মৃত্যুসংবাদ পেলে সামর্থ্য থাকলে তার জানাজায় শরিক হওয়া এবং আন্তরিকভাবে তার জন্য দোয়া করা প্রত্যেক মুমিনের দায়িত্ব ও সৌভাগ্যের বিষয়।
মোটকথা, জানাজায় অধিকসংখ্যক মুসলমানের উপস্থিতি এবং তাদের আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক না করে করা আন্তরিক দোয়া মৃত ব্যক্তির জন্য আল্লাহর রহমত ও মাগফিরাত লাভের আশা বৃদ্ধি করে। একই সঙ্গে এটি জীবিতদের জন্যও বড় নেকি অর্জনের একটি সুবর্ণ সুযোগ। তাই কোনো মুসলমানের মৃত্যুসংবাদ পেলে তার জানাজায় শরিক হওয়া, তার জন্য ইখলাসের সঙ্গে দোয়া করা এবং তার ভালো দিকগুলো স্মরণ করা একজন মুমিনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে মুসলমানদের হক যথাযথভাবে আদায় করার, মৃতদের জন্য বিশুদ্ধ অন্তরে দোয়া করার এবং ঈমানের সঙ্গে উত্তম পরিণতি লাভের তাওফিক দান করুন। আমিন।