সন্তান অবাধ্য হলে কী করবেন

সন্তান অবাধ্য হলে কী করবেন

ছবি: ফাইল ফটো

সন্তান আল্লাহ তাআলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ নেয়ামত। একইসঙ্গে সে মা-বাবার জন্য একটি আমানত ও পরীক্ষা। প্রতিটি মা-বাবাই চান, তাঁদের সন্তান সৎ, দ্বীনদার ও আদর্শ মানুষ হয়ে উঠুক। কিন্তু কখনো কখনো সন্তান মা-বাবার ন্যায্য উপদেশ অমান্য করে বা ভুল পথে পা বাড়ায়। তখন হতাশ হওয়া কিংবা শুধু কঠোরতার আশ্রয় নেওয়া উচিত নয়। ধৈর্য, প্রজ্ঞা ও ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী তাকে সংশোধনের চেষ্টা করাই একজন মুমিন মা-বাবার দায়িত্ব।

১. আগে নিজের দায়িত্ব ও আমল পর্যালোচনা করুন
সন্তান বিপথে গেলে মা-বাবার প্রথম কাজ হলো নিজের দায়িত্ব পালনে কোনো ঘাটতি ছিল কি না, তা ভেবে দেখা। সন্তানকে দ্বীনি শিক্ষা, নৈতিক মূল্যবোধ ও উত্তম পরিবেশ দেওয়া মা-বাবার দায়িত্ব। পাশাপাশি হালাল উপার্জন, নিজের আমল ও পারিবারিক পরিবেশও সন্তানের চরিত্র গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘হে ঈমানদাররা! তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবারকে সেই আগুন থেকে রক্ষা করো, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর।’ (সুরা তাহরিম: ৬)

২. সন্তানের অধিকার আদায়ে অবহেলা করবেন না
সন্তানের কাছ থেকে আনুগত্য প্রত্যাশার আগে তার প্রাপ্য অধিকার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সঠিক লালন-পালন, উত্তম শিক্ষা, দ্বীনি মূল্যবোধ, ভালোবাসা ও নিরাপদ পারিবারিক পরিবেশ- এসবই সন্তানের মৌলিক অধিকার।

রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘প্রত্যেক শিশুই ফিতরাতের ওপর জন্মগ্রহণ করে। এরপর তার মা-বাবাই তাকে ইহুদি, খ্রিস্টান অথবা অগ্নিপূজক বানায়।’ (সহিহ বুখারি: ১৩৮৫; সহিহ মুসলিম: ২৬৫৮)

এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, সন্তানের চরিত্র ও বিশ্বাস গঠনে মা-বাবার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

৩. বয়স অনুযায়ী আচরণের ধরন বদলান
শিশুর বয়স ও মানসিক বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে তার সঙ্গে আচরণের ধরনও পরিবর্তন হওয়া প্রয়োজন। ছোটবেলায় স্নেহ-মমতা দিয়ে গড়ে তুলতে হয়, কৈশোরে শিক্ষা ও শৃঙ্খলার ওপর গুরুত্ব দিতে হয়, আর প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর তাকে সম্মান দিয়ে কথা বলা ও পরামর্শে সম্পৃক্ত করা অধিক ফলপ্রসূ।

সন্তান বড় হওয়ার পর শুধু নির্দেশ দেওয়ার পরিবর্তে তার কথা শোনা, যুক্তি দিয়ে বোঝানো এবং পারস্পরিক আস্থা তৈরি করা অবাধ্যতা কমাতে সহায়ক হয়।

৪. কঠোরতার চেয়ে কোমলতা বেশি কার্যকর
রাগ, অপমান বা অতিরিক্ত কঠোরতা অনেক সময় সন্তানকে আরও দূরে ঠেলে দেয়। ইসলাম মানুষকে কোমল আচরণ ও প্রজ্ঞার সঙ্গে সংশোধনের শিক্ষা দিয়েছে।

রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ কোমলতা পছন্দ করেন। কোমলতার কারণে তিনি এমন কিছু দান করেন, যা কঠোরতার কারণে দান করেন না।’ (সহিহ মুসলিম)

তাই সন্তানের ভুল হলে জনসমক্ষে অপমান না করে নির্জনে আন্তরিকতার সঙ্গে বোঝানোর চেষ্টা করা উচিত।

৫. রাগের মাথায় বদদোয়া করবেন না
সন্তান যতই অবাধ্য হোক, তার বিরুদ্ধে অভিশাপ বা বদদোয়া করা উচিত নয়। মা-বাবার দোয়া যেমন কবুল হয়, তেমনি বদদোয়াও কবুল হতে পারে।

রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘তোমরা তোমাদের সন্তানদের বিরুদ্ধে বদদোয়া কোরো না। এমন হতে পারে, তা এমন এক সময়ের সঙ্গে মিলে যাবে, যখন আল্লাহ দোয়া কবুল করেন।’ (সহিহ মুসলিম)

তাই হতাশা বা ক্ষোভের মুহূর্তেও সন্তানের জন্য কল্যাণের দোয়াই করা উচিত।

৬. দোয়া কখনো বন্ধ করবেন না
সন্তানকে সৎ পথে ফিরিয়ে আনার সবচেয়ে বড় অবলম্বন হলো আল্লাহর কাছে আন্তরিকভাবে দোয়া করা। পবিত্র কোরআনে নেক সন্তান ও পরিবারের কল্যাণ কামনায় একাধিক দোয়া শিক্ষা দেওয়া হয়েছে-

رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَٲجِنَا وَذُرِّيَّـٰتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَٱجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا ‘হে আমাদের রব! আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের আমাদের চোখের শীতলতা দান করুন এবং আমাদের মুত্তাকিদের নেতা বানিয়ে দিন।’ (সুরা ফুরকান: ৭৪)

আরও ইরশাদ হয়েছে- رَبِّ ٱجْعَلْنِى مُقِيمَ ٱلصَّلَوٲةِ وَمِن ذُرِّيَّتِى‌ۚ رَبَّنَا وَتَقَبَّلْ دُعَآءِ ‘হে আমার রব! আমাকে ও আমার সন্তানদের নামাজ কায়েমকারী বানিয়ে দিন।’ (সুরা ইবরাহিম: ৪০)

৭. সৎ সঙ্গ ও সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিত করুন
সন্তানের চরিত্র গঠনে বন্ধু, পারিবারিক পরিবেশ এবং সামাজিক প্রভাবের ভূমিকা অনেক। তাই তার চলাফেরা, বন্ধুবান্ধব ও সময় কাটানোর পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন থাকা প্রয়োজন। পরিবারে দ্বীনি চর্চা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার পরিবেশ থাকলে তা সন্তানের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

গুরুতর সমস্যা হলে বাস্তব উদ্যোগও প্রয়োজন
যদি সন্তানের আচরণ মাদকাসক্তি, সহিংসতা, আত্মক্ষতি, অপরাধে জড়িয়ে পড়া বা মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত গুরুতর সমস্যার পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তাহলে শুধু শাসন বা উপদেশে সীমাবদ্ধ না থেকে পরিবার, বিশ্বস্ত আলেম এবং প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা কাউন্সেলরের সহায়তা নেওয়াও প্রজ্ঞার পরিচয়। ইসলাম কল্যাণকর উপায় অবলম্বনে নিরুৎসাহিত করে না।

সন্তান অবাধ্য হয়ে গেলে হতাশ হওয়া, সম্পর্ক ছিন্ন করা বা শুধু কঠোরতার আশ্রয় নেওয়া সমাধান নয়। দায়িত্বশীল মা-বাবা প্রথমে নিজের কর্তব্য পালন করবেন, এরপর ধৈর্য, উত্তম আচরণ, সঠিক শিক্ষা, সুন্দর পরিবেশ ও আন্তরিক দোয়ার মাধ্যমে সন্তানের সংশোধনের চেষ্টা চালিয়ে যাবেন। হেদায়াতের মালিক একমাত্র আল্লাহ। মানুষের দায়িত্ব হলো যথাসাধ্য চেষ্টা করা এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা।

তথ্যসূত্র: আল-কোরআন; সহিহ বুখারি; সহিহ মুসলিম