তেলের দামের উল্টো আচরণ কেন?
ফাইল ছবি
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান সংঘাতের মধ্যে হঠাৎ করেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বড় ধরনের পতনের মুখে পড়েছে। গত সোমবার তেলের দাম প্রায় আট শতাংশ কমে যায়, যা গত মে মাসের পর একদিনে সবচেয়ে বড় দরপতন। মার্কিন প্রশাসন সংঘাত বাড়ানোর পরিকল্পনা সাময়িকভাবে স্থগিত করায় এবং সপ্তাহান্তে বড় ধরনের কোনো সংঘর্ষের খবর না আসায় তেল ব্যবসায়ীদের মধ্যে কূটনৈতিক সমাধানের নতুন আশা তৈরি হয়েছে। এই সামান্য ইতিবাচক লক্ষণেই তেলের বাজার যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে শুরু করেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, তেলের বাজারের এই প্রতিক্রিয়া মূলত সংঘাতের শুরুর পর থেকেই লক্ষণীয় 'শান্তিপ্রবণতা'র ফল। এর আগেও চলতি বছরের এপ্রিল মাসে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা এবং জুনে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বল্পস্থায়ী একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছিল। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় এবং বিশ্ববাজারে প্রতিদিন প্রায় এক কোটি ৩০ লাখ ব্যারেল তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার পরেও বিশ্ব অর্থনীতি ধীরে ধীরে এর সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে, যা বাজারে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়ক হয়েছে।
তবে তেলের সরবরাহ সংকটের এই তীব্রতা সামাল দিতে চীন ও আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর কৌশলগত ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সংকটের শুরু থেকেই চীন তার বিশাল সংরক্ষিত তেল ব্যবহার করে আমদানি উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে দেয়। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থার দেশগুলো, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, তাদের কৌশলগত পেট্রোলিয়াম মজুদ থেকে নিয়মিত লাখ লাখ ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়তে থাকে। ফলে হরমুজ প্রণালী সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য পুনরায় উন্মুক্ত হওয়ার পর বিপুল পরিমাণ তেল বের হয়ে আসায় বাজারে সাময়িকভাবে অতিরিক্ত সরবরাহের সৃষ্টি হয়।
বাস্তব পরিস্থিতি কিন্তু এখনো সম্পূর্ণ স্বাভাবিক নয় এবং হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে জটিলতা কাটেনি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সূত্র এবং গোয়েন্দা তথ্যে জানা গেছে, ইরান এখনো প্রণালীটিতে নিজেদের কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার চেষ্টা করছে এবং বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচলের ওপর অনানুষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ আরোপ করছে। এর ফলে অনেক জাহাজই এই জলপথ ব্যবহার করতে ভয় পাচ্ছে এবং প্রণালীতে চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে আছে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানকে টোল পরিশোধ করা নিয়ে আইনি জটিলতা তৈরি হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করেছে।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের কারণে, যারা সম্প্রতি লোহিত সাগরের বাব আল-মান্দেব প্রণালীতে সৌদি আরবের তেল ট্যাংকারে হামলা চালিয়ে অবরোধ ঘোষণা করেছে। হরমুজ প্রণালীর পাশাপাশি এই গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য রুটেও বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় বাজারের অনিশ্চয়তা কাটেনি।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন, এই সাময়িক বিরতি অত্যন্ত ভঙ্গুর এবং ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার একটু এদিক-সেদিক হলেই তেলের বাজার আবারও বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়তে পারে।
সূত্র: সিএনএন