কর্মক্ষেত্রে মানসিক শান্তি ও নিরাপত্তা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
ফাইল ছবি
ভালো বেতন, আধুনিক অফিস বা আকর্ষণীয় সুযোগ-সুবিধা থাকলেই কর্মীরা ভালো থাকবেন—এমন ধারণা এখন আর পুরোপুরি সত্য নয়। একজন কর্মী যদি অফিসে নিজের মতামত প্রকাশ করতে ভয় পান, ভুল করলে অপমানিত হওয়ার আশঙ্কায় থাকেন বা মানসিক চাপের কথা বলতে সংকোচ বোধ করেন, তাহলে তার কর্মদক্ষতা কমে যেতে পারে।
তাই বিশ্বজুড়ে এখন কর্মক্ষেত্রে মানসিক শান্তি ও মানসিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মানসিক নিরাপত্তা এমন একটি পরিবেশ, যেখানে কর্মীরা ভয় বা লজ্জা ছাড়াই নিজের মতামত দিতে পারেন, প্রশ্ন করতে পারেন, ভুল স্বীকার করতে পারেন এবং প্রয়োজন হলে সহায়তা চাইতে পারেন। এতে কর্মীরা যেমন স্বস্তি নিয়ে কাজ করতে পারেন, তেমনি প্রতিষ্ঠানও লাভবান হয়।
করোনা-পরবর্তী সময়ে কেন বাড়ল গুরুত্ব?
করোনা মহামারির পর অনেক মানুষের জীবনযাত্রা বদলে গেছে।
দীর্ঘ সময়ের অনিশ্চয়তা, একাকিত্ব, চাকরির চাপ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যে বড় প্রভাব ফেলেছে। তাই বর্তমানে প্রতিষ্ঠানগুলো কর্মীদের শুধু শারীরিক নিরাপত্তা নয়, মানসিক সুস্থতার বিষয়েও বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, মানসিকভাবে সুস্থ কর্মীরা বেশি উৎপাদনশীল হন, কর্মক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করেন এবং প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। অন্যদিকে অতিরিক্ত মানসিক চাপ ও উদ্বেগ কর্মক্ষমতা কমিয়ে দেয় এবং দীর্ঘমেয়াদে শারীরিক স্বাস্থ্যেও প্রভাব ফেলে
গুগলের বিখ্যাত ‘প্রজেক্ট অ্যারিস্টটল’ গবেষণায় দেখা গেছে, একটি সফল দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো মানসিক নিরাপত্তা। অর্থাৎ, যেসব দলে কর্মীরা নির্ভয়ে কথা বলতে পারেন এবং ভুল করার জন্য অপমানিত হওয়ার ভয় থাকে না, সেসব দল অন্যদের তুলনায় বেশি সফল হয়।
গবেষণায় আরও দেখা যায়, এমন পরিবেশে কর্মীরা নতুন ধারণা দিতে আগ্রহী হন, সমস্যা দ্রুত সমাধান করেন এবং একে অপরের ওপর বেশি আস্থা রাখেন।
হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলের অধ্যাপক অ্যামি এডমন্ডসন, যিনি ‘মানসিক নিরাপত্তা’ ধারণাটিকে জনপ্রিয় করেন, তার গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব প্রতিষ্ঠানে কর্মীরা নির্ভয়ে মতামত দিতে পারেন, সেখানে ভুল দ্রুত ধরা পড়ে এবং সেগুলো থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। ফলে প্রতিষ্ঠানের কর্মক্ষমতা ও উদ্ভাবনী শক্তি বাড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভুল লুকানোর সংস্কৃতির চেয়ে ভুল থেকে শেখার সংস্কৃতি একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য অনেক বেশি কার্যকর।
কীভাবে গড়ে উঠবে মানসিকভাবে নিরাপদ কর্মপরিবেশ?
প্রতিষ্ঠানগুলো চাইলে কয়েকটি সহজ উদ্যোগের মাধ্যমে কর্মীদের জন্য আরও ভালো পরিবেশ তৈরি করতে পারে।
কর্মীদের মতামত গুরুত্ব দিয়ে শোনা।
সম্মানজনক আচরণ নিশ্চিত করা।
ভুলকে শেখার সুযোগ হিসেবে দেখা।
মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক কর্মশালা ও কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা।
প্রয়োজন হলে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তাকারী বা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মী রাখা।
কাজ ও ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে উৎসাহ দেওয়া।
সহকর্মীদের ভূমিকাও কম নয়
একজন সহকর্মীর আন্তরিক আচরণ বা মন দিয়ে কথা শোনাও অনেক সময় একজন মানুষের মানসিক চাপ কমিয়ে দিতে পারে। তাই অনেক প্রতিষ্ঠান দলীয় আড্ডা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, পারিবারিক আয়োজন বা স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রমের মাধ্যমে কর্মীদের মধ্যে সম্পর্ক আরও দৃঢ় করার চেষ্টা করছে।
বার্নআউটের ঝুঁকি বাড়ছে
বর্তমানে অনেক কর্মী অফিস শেষ হওয়ার পরও ই-মেইল, ফোন বা অনলাইন মিটিংয়ের মাধ্যমে কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকেন। এতে বিশ্রামের সময় কমে যায় এবং বার্নআউট বা অতিরিক্ত মানসিক ক্লান্তির ঝুঁকি বাড়ে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, নিয়মিত বিরতি নেওয়া, পর্যাপ্ত ঘুম, শরীরচর্চা, পরিবারকে সময় দেওয়া এবং প্রয়োজনে পেশাদার মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সহায়তা নেওয়া উচিত।
লাভবান হয় কর্মী ও প্রতিষ্ঠান—দুজনই
মানসিকভাবে সুস্থ কর্মীরা সাধারণত বেশি আত্মবিশ্বাসী, দায়িত্বশীল এবং সৃজনশীল হন। এতে কর্মী বদলের হার কমে, অনুপস্থিতি হ্রাস পায় এবং প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনশীলতা বাড়ে। একই সঙ্গে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে কর্মীদের পরিবার ও সামাজিক জীবনেও।
উল্লেখ্য বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক কর্মজীবনে শুধু দক্ষতা বা অভিজ্ঞতা যথেষ্ট নয়। কর্মীদের মানসিক শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও একটি প্রতিষ্ঠানের বড় দায়িত্ব। কারণ একজন কর্মী যখন সম্মান, আস্থা ও সহযোগিতার পরিবেশে কাজ করেন, তখন তিনি শুধু ভালো কাজই করেন না, বরং নিজেও ভালো থাকেন। আর কর্মীদের এই ভালো থাকাই একটি সফল ও টেকসই প্রতিষ্ঠানের অন্যতম ভিত্তি।