কেন বারেসিকে মনে রাখবে ফুটবলবিশ্ব
ছবি: সংগৃহীত
১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালের কথা মনে আছে? ক্যালিফোর্নিয়ার প্রচণ্ড গরমে পেনাল্টি মিস করে মাটিতে বসে অঝোরে কাঁদছেন ইতালির এক কিংবদন্তি ডিফেন্ডার। ফুটবল ইতিহাসের অত্যন্ত আবেগময় একটি মুহূর্ত এটি। অনেকেই হয়তো এই কান্নার দৃশ্য দিয়ে তাকে বিচার করবেন। কিন্তু এর পেছনের গল্পটা শুনলে চমকে যেতে হয়। ফাইনালের মাত্র ২৫ দিন আগে তার হাঁটুতে বড়সড় অস্ত্রোপচার হয়েছিল।
যেখানে ডাক্তারদের মতে সুস্থ হতে মাসের পর মাস লাগার কথা, সেখানে তিনি এক মাসেরও কম সময়ে মাঠে ফিরেছিলেন! শুধু ফেরেননি, পুরো ১২০ মিনিট মাঠে রাজত্ব করে ব্রাজিলের ভয়ংকর সব স্ট্রাইকারদের আটকে রেখেছিলেন। সেদিন তিনি ব্যর্থ হননি, বরং মানুষের সহ্যক্ষমতার নতুন এক ইতিহাস লিখেছিলেন। তিনি আর কেউ নন, বিশ্বফুটবলের সর্বকালের অন্যতম সেরা ডিফেন্ডার ফ্রাঙ্কো বারেসি।
এসি মিলানের কিংবদন্তি অধিনায়ক এবং বিশ্বকাপজয়ী ফুটবলার ফ্রাঙ্কো বারেসি আর নেই। ৬৬ বছর বয়সে শুক্রবার (৩১ জুলাই) মারা গেছেন ইতালির সর্বকালের অন্যতম সেরা এই রক্ষণভাগের খেলোয়াড়।
জীবনের শুরুটা বারেসির জন্য মোটেও সহজ ছিল না। খুব অল্প বয়সেই বাবা-মাকে হারান। বড় ভাই জিউসেপ্পের সঙ্গে মিলে ফুটবলকেই জীবনের ধ্যানজ্ঞান বানিয়ে নেন তিনি। ভাগ্য বদলের আশায় দুই ভাই ইন্টার মিলানে ট্রায়াল দিতে যান। শারীরিক গঠন রুগ্ন হওয়ার কারণে ইন্টার বারেসিকে ফিরিয়ে দেয়, কিন্তু তার ভাইকে দলে টেনে নেয়।
তবে এই প্রত্যাখ্যান তাকে দমাতে পারেনি। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী এসি মিলান ঠিকই বারেসির মেধা চিনতে পারে। এরপর থেকে টানা দুই দশক এসি মিলানই হয়ে ওঠে তার আসল ঠিকানা। অন্যদিকে তার ভাই জিউসেপ্পে ইন্টার মিলানের কিংবদন্তি হয়ে ওঠেন। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে মিলান ডার্বি মানেই যেন ছিল দুই ভাইয়ের এক রোমাঞ্চকর পারিবারিক লড়াই।
সত্তরের দশকে ইতালির ফুটবল মানেই ছিল চরম রক্ষণাত্মক কৌশল, যেখানে ডিফেন্ডারদের মূল কাজ ছিল কেবল বল ক্লিয়ার করা। কিন্তু আটের দশকে কোচ আরিগো সাচ্চির হাত ধরে বারেসি এই ধারণাই পালটে দেন। তিনি হয়ে ওঠেন আধুনিক ফুটবলের এক আক্রমণাত্মক 'লিবেরো' বা সুইপার। বারেসি শুধু পেছনে দাঁড়িয়ে থাকতেন না, বরং সামনে এগিয়ে এসে প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলতেন।
বিপক্ষ দলের খেলোয়াড়রা থ্রু-পাস দেওয়ার আগেই তিনি অফসাইডের ফাঁদ তৈরি করতে হাত তুলে ফেলতেন। তার এই নিখুঁত ভঙ্গি দেখে অনেক সময় লাইন্সম্যানরাও চোখ বন্ধ করে অফসাইডের পতাকা তুলে দিতেন! পাওলো মালদিনি, আলেসান্দ্রো কোস্তাকুর্তা আর মাউরো তাসোত্তিকে নিয়ে বারেসি এমন এক দুর্ভেদ্য ব্যাকলাইন তৈরি করেছিলেন, যা আজও ফুটবল ইতিহাসে অমর হয়ে আছে।
মাঠে বারেসির নেতৃত্ব ছিল একদম ভিন্ন ঘরানার। তিনি কখনো সতীর্থদের ওপর রাগ দেখিয়ে চিৎকার করতেন না। তার নীরবতা, মনোযোগ আর নিখুঁত পজিশনিং দেখেই পুরো দল অনুপ্রাণিত হতো। নিজের ক্যারিয়ারে ৭১৯টি ম্যাচ খেলা এই তারকা এসি মিলানের সবচেয়ে খারাপ সময়েও দল ছেড়ে যাননি। তার প্রতি সম্মান জানিয়ে ১৯৯৭ সালে অবসরের পর ক্লাবটি চিরতরে ৬ নম্বর জার্সিটি তুলে রাখে।
তার অর্জনের ঝুলিও বেশ অদ্ভুত আর সমৃদ্ধ। এক মিনিটের জন্যও মাঠে না নেমে ১৯৮২ সালে বিশ্বকাপ জিতেছিলেন, আবার ১৯৯০ ও ১৯৯৪ সালে যথাক্রমে ব্রোঞ্জ ও রুপা পান। এমনকি ১৯৮৯ সালের ব্যালন ডি'অর পুরস্কারে একজন ডিফেন্ডার হয়েও সেরা আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দের পেছনে ফেলে তিনি দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছিলেন, যা রীতিমতো অবিশ্বাস্য।
ফ্রাঙ্কো বারেসি বিশ্বফুটবলকে শিখিয়েছিলেন যে, ডিফেন্ডিং শুধু পেশিশক্তির ব্যবহার বা গায়ের জোরের বিষয় নয়; এটিও এক নিখুঁত এবং সৃজনশীল শিল্প। আধুনিক যুগের বড় বড় ডিফেন্ডাররা আজও তার সেই দেখানো পথেই হেঁটে চলেছেন। ট্রফি আর পরিসংখ্যান দিয়ে এই নীরব সেনাপতির বিশালত্ব হয়তো কখনোই পুরোপুরি মাপা সম্ভব নয়।