পরিবেশের সুরক্ষায় মহানবীর (সা.) ৫ শিক্ষা

পরিবেশের সুরক্ষায় মহানবীর (সা.) ৫ শিক্ষা

ফাইল ছবি

পরিবেশের বর্তমান অবস্থা, জলবায়ু সংকট এবং মানুষের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড কীভাবে প্রকৃতির ওপর প্রভাব ফেলছে, তা নিয়ে প্রায়ই নানা গবেষণা ও সংবাদ প্রকাশিত হয়। এসব খবর আমাদের সজাগ করে তোলে এবং পরিবেশের জন্য কল্যাণকর সিদ্ধান্ত নিতে উদ্বুদ্ধ করে।

আজকের পৃথিবীতে পরিবেশ রক্ষায় সচেতনতার যে বার্তা দেওয়া হচ্ছে, তা আজ থেকে ১৪ শতকেরও বেশি সময় আগে বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) তার কাজ ও শিক্ষার মাধ্যমে স্পষ্ট করে গেছেন। তার জীবনধারা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এই পৃথিবীকে সুন্দর ও বাসযোগ্য রাখা মানুষের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব।

হজরত আবু সাঈদ আল-খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেছেন, নিশ্চয়ই পৃথিবী মনোরম ও সবুজ। আল্লাহ তোমাদের সেখানে প্রতিনিধি বা খলিফা হিসেবে নিযুক্ত করেছেন যাতে তিনি দেখতে পারেন তোমরা কীভাবে কাজ করো। (সহিহ মুসলিম)।

এই হাদিস থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়, পরিবেশের সুরক্ষায় রাসুল (সা.) কতটা গভীর মনোযোগ দিতেন। তিনি আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, মহান আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে আমাদের কাধে যে দায়িত্ব রয়েছে, তা সঠিকভাবে পালন করতে হবে।

পরিবেশ রক্ষায় মহানবীর (সা.) অনুকরণীয় ৫টি প্রধান শিক্ষা নিচে আলোচনা করা হলো:

১. সম্পদের অপচয় রোধ

সম্পদ সংরক্ষণের মূল উদ্দেশ্য হলো প্রাকৃতিক উপাদানগুলোকে দীর্ঘ মেয়াদে মানবকল্যাণে টিকিয়ে রাখা। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহার বাড়ছে, ফলে তা রক্ষা করা এখন সময়ের দাবি। সম্পদ সাশ্রয়ের ফলে যেমন পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা পায়, তেমনি বন্যপ্রাণীর আবাসস্থলও সুরক্ষিত থাকে।

সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে মহানবী (সা.) কতটা মিতব্যয়ী ছিলেন, তা একটি হাদিসের মাধ্যমে জানা যায়। হজরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) মাত্র এক মুদ্দ (প্রায় দেড় লিটার) পানি দিয়ে অজু করতেন এবং এক সা থেকে পাঁচ মুদ্দ (প্রায় দুই থেকে আড়াই লিটার) পানি দিয়ে গোসল সম্পন্ন করতেন (মুত্তাফাকুন আলাইহি)।

ইবাদতের মতো পবিত্র কাজেও তিনি পানি ব্যবহারে সচেতন হতে বলেছেন। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত অন্য একটি হাদিসে এসেছে, একবার রাসুল (সা.) সাআদ (রা.)-এর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, যখন তিনি অজু করছিলেন। রাসুল (সা.) বললেন, এই অপচয় কেন? সাআদ (রা.) জিজ্ঞেস করলেন, অজুর মধ্যেও কি অপচয় হতে পারে? তিনি বললেন, হ্যাঁ, এমনকি তুমি যদি প্রবহমান নদীর তীরেও বসে থাকো, তবুও অপচয় করা যাবে না (মুসনাদে আহমাদ)।

দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে অপচয় রোধ করা কার্বন নিঃসরণ হ্রাস এবং বৈশ্বিক উষ্ণায়ন রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

২. টেকসই ব্যবহারের অভ্যাস

বর্তমান যুগে বহুল ব্যবহৃত থ্রিআর নীতি—কম ব্যবহার (রিডিউস), পুনরায় ব্যবহার (রিইউজ) এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ (রিসাইকেল)-এর স্পষ্ট প্রয়োগ দেখা যায় মহানবীর (সা.) জীবনে।

জুতো কিংবা পোশাক সামান্য ছিঁড়ে গেলে ফেলে না দিয়ে তিনি তা মেরামত করে ব্যবহার করতেন। হজরত আয়েশা (রা.)-কে যখন জিজ্ঞেস করা হয়, রাসুল (সা.) ঘরে কী করতেন? তিনি জবাবে বলেন, তিনি সাধারণ মানুষের মতোই নিজের জুতো সেলাই করতেন, কাপড়ে তালি দিতেন এবং জামাকাপড় সেলাই করতেন (আল-আদাবুল মুফরাদ)।

এই হাদিস আমাদের শেখায় যে, অপ্রয়োজনীয় ভোগবাদ পরিহার করে টেকসই জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত হতে হবে। ব্যবহার্য জিনিসপত্রের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার একটি অন্যতম উপায়।

৩. বৃক্ষরোপণকে সদকা বা পুণ্য হিসেবে গ্রহণ

গাছপালা বায়ুমণ্ডলের দূষিত উপাদান শোষণ করে, অক্সিজেন ত্যাগ করে এবং ছায়া প্রদান করে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বৃক্ষরোপণ শুধু পরিবেশকেই সুন্দর করে না, বরং পুরো ইকোসিস্টেম বা বাস্তুতন্ত্রকে সচল রাখে।

হজরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, কোনো মুসলিম যদি একটি বৃক্ষরোপণ করে অথবা কোনো শস্য বীজ বপন করে, আর তা থেকে কোনো পাখি, মানুষ বা পশু আহার করে, তবে তা তার জন্য দান বা সদকা হিসেবে গণ্য হবে (সহিহ বুখারি)।

গাছ লাগানোর মতো একটি ছোট কাজ দীর্ঘমেয়াদে পুরো পৃথিবীর জন্য আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়ায়। এটা একদিকে যেমন প্রত্যক্ষভাবে প্রাণীকূলকে খাদ্য ও আশ্রয় দেয়, অন্যদিকে পরোক্ষভাবে পৃথিবীর জলবায়ুকে স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করে।

৪. প্রাণী ও অন্যান্য সৃষ্টির প্রতি দয়া

পরিবেশের স্থিতিশীলতা রক্ষায় প্রাণীদের ভূমিকা অপরিসীম। তারা প্রকৃতির খাদ্যশৃঙ্খল ও ভারসাম্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। মানুষ হিসেবে প্রকৃতির এই উপাদানগুলোকে রক্ষা করা আমাদের অন্যতম দায়িত্ব।

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, একবার সাহাবিগণ রাসুল (সা.)-কে প্রাণীদের সেবা করার সওয়াব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, যেকোনো জীবন্ত প্রাণীর সেবা করার মধ্যেই সওয়াব রয়েছে (সহিহ বুখারি)।

সৃষ্টজীবের যত্ন নেওয়া মানেই প্রকৃতির যত্ন নেওয়া। প্রতিটি প্রাণীর সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবন নিশ্চিত করা গেলে তা পরিবেশের সার্বিক উন্নতিতে সরাসরি ভূমিকা রাখে।

৫. চারপাশ পরিষ্কার ও নিরাপদ রাখা

পরিবেশগত পরিচ্ছন্নতা সংক্রামক ব্যাধি রোধ করে এবং মানুষের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, এক ব্যক্তি রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় পথে একটি কাঁটাময় ডাল দেখতে পেয়ে তা সরিয়ে দিল। আল্লাহ তার এই কাজে সন্তুষ্ট হলেন এবং তাকে ক্ষমা করে দিলেন (সহিহ বুখারি)।

পথঘাট পরিষ্কার রাখা বা অন্যের ক্ষতির কারণ হতে পারে এমন কিছু অপসারণ করা ঈমানের অঙ্গ। ছোট ছোট উদ্যোগের মাধ্যমে চারপাশ পরিষ্কার ও বাসযোগ্য রাখা আমাদের সবার নাগরিক ও নৈতিক দায়িত্ব।

প্রশান্ত মহাসাগরের আবর্জনার স্তূপ আজ বিশ্বজুড়ে পরিবেশবাদীদের ভাবিয়ে তুলেছে। সেই তুলনায় একা একজন মানুষের উদ্যোগ হয়তো খুব সামান্য মনে হতে পারে, কিন্তু ছোট ছোট প্রতিটি পদক্ষেপই বড় পরিবর্তনের সূচনা করে।

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, মনে রাখবে, তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেকেই নিজ নিজ দায়িত্বের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে (মুত্তাফাকুন আলাইহি)।

পরিবেশ রক্ষা করা আমাদের ওপর অর্পিত এক মহান আমানত। রাসুল (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসরণ করে প্রকৃতির পরিচর্যা করলে যেমন পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা পাবে, তেমনি মহান আল্লাহর সন্তুষ্টিও অর্জন করা সম্ভব হবে।