তিন শতাধিক অপরাধীর কবজায় দেশের সাইবার জগৎ

তিন শতাধিক অপরাধীর কবজায় দেশের সাইবার জগৎ

প্রতীকী ছবি

দেশে ক্রমে বাড়ছে সাইবার অপরাধ। গোয়েন্দা পুলিশ শনাক্ত করেছে, এই অপরাধে জড়িত দেশি-বিদেশি একাধিক চক্রের শীর্ষ পর্যায়ের তিন শতাধিক সদস্য।

অর্থপাচারের সঙ্গেও এরা যুক্ত। সম্প্রতি মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ছবি ব্যবহার করে এরা ভুয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ও পেজ থেকে বিভ্রান্তিকর তথ্য ও কনটেন্ট ছড়িয়ে দেয়। এমনকি বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে চিঠিও পাঠায় তারা। চিঠিতে মালদ্বীপে জনশক্তি রপ্তানির জন্য একটি ভুয়া কোম্পানিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

এর জন্য তারা বিভিন্ন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্যসহ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সিল, সই এবং অফিশিয়াল লেটারহেড জালিয়াতি করে ব্যবহার করছে।

পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র বলছে, এই সাইবার অপরাধীদের অনেকে বিদেশি নাগরিক। প্রতারণার মাধ্যমে প্রতিনিয়ত এরা বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। এই সাইবার অপরাধীদের বিষয়ে সতর্ক থাকার আহবান জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।

এই অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে তৎপর ঢাকা মহানগর পুলিশের সাইবার অপরাধ বিভাগসহ অন্যান্য ইউনিট।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পুলিশ এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সম্পর্কে অপপ্রচারের বিরুদ্ধে সতর্ক থাকার আহবান জানিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। গতকাল শুক্রবার পুলিশ সূত্র জানায়, সম্প্রতি গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করা যাচ্ছে, ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ

মাধ্যমে বাংলাদেশ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে নিয়ে একটি কুচক্রী মহল পরিকল্পিতভাবে মিথ্যা, বানোয়াট, বিভ্রান্তিকর, উসকানিমূলক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ পুলিশ এ ধরনের অপপ্রচারের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছে। বাংলাদেশ পুলিশ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারিত বিভ্রান্তিকর ও উসকানিমূলক কোনো বক্তব্য বিশ্বাস, শেয়ার বা প্রচার করা থেকে বিরত থাকার জন্য জনগণের প্রতি আহবান জানাচ্ছে।

দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গুজব ও অপপ্রচার প্রতিরোধে সবাইকে সচেতন ভূমিকা পালনেরও অনুরোধ জানানো হচ্ছে।
প্রযুক্তি ব্যবহার করে সাইবার অপরাধীরা অর্থ আত্মসাৎ করেছে জানিয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা আরো জানান, মোবাইল আর্থিক সেবার দ্রুত সম্প্রসারণ তথ্য, ইন্টারনেট ব্যাংকিং ও যোগাযোগ, অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের নিয়ে পর্নোগ্রাফিক কনটেন্ট ছড়ানো, অনলাইন বুলিং, ওয়েবসাইট হ্যাক করে তথ্য চুরি, হুমকি দেওয়া এবং মানহানিকর মিথ্যা তথ্য প্রচার করে এরা বড় ধরনের সাইবার অপরাধ করছে।

সম্প্রতি দেশের অনেক ব্যবসায়ীর পাশাপাশি সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়েও সাইবার অপরাধীরা নানা ধরনের অপপ্রচার চালিয়েছে বলে জানায় ডিবি-সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগ সূত্র। রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ছবি ব্যবহার করে ভুয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ও পেজ থেকে বিভ্রান্তিকর তথ্য ও কনটেন্ট ছড়াচ্ছে সাইবার অপরাধীরা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও ডিজিটাল আর্থিক সেবাকে কেন্দ্র করে অপরাধীদের নতুন নতুন কৌশল সাধারণ মানুষকে প্রতিনিয়ত ঝুঁকিতে ফেলছে।

সম্প্রতি মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করা যাচ্ছে, মন্ত্রীদের নাম-পরিচয় ও ছবি ব্যবহার করে একাধিক ভুয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ও পেজ পরিচালনা করা হচ্ছে। এসব ভুয়া অ্যাকাউন্ট ও পেজ থেকে মন্ত্রীর অনুমোদনহীন বক্তব্য, বিভ্রান্তিকর তথ্য ও কনটেন্ট প্রচার করা হচ্ছে। এটি সম্পূর্ণ বেআইনি ও নীতিহীন। এ পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে এসব ভুয়া পেজ ও অ্যাকাউন্ট থেকে প্রচারিত কোনো কনটেন্ট আমলে না নেওয়ার অনুরোধ জানানো হচ্ছে।

সাইবার অপরাধীদের বড় একটি অংশ অনলাইন প্রতারণায় সক্রিয়। এ সংক্রান্ত মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এদের জুয়ার ওয়েবসাইটগুলোর এমএফএস অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে প্রতিদিন হাজার কোটি টাকার বেশি লেনদেন হয়। এর বেশির ভাগ আন্তর্জাতিক চক্রের মাধ্যমে বিদেশে পাচার হয়ে যায়। এরই মধ্যে এই চক্রের সদস্যরা বিপুল অর্থ পাচার করেছে।

সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও মোকাবেলায় পুলিশ সদর দপ্তরের পাশাপাশি তদন্ত কার্যক্রম জোরদার করেছে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ও গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। তবে তথ্য সংগ্রহ, আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা এবং প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।

সাইবার অপরাধ ও গুজব বর্তমানে সামাজিক বড় সংকট জানিয়ে মহাপুলিশ পরিদর্শক (আইজি) আলী হোসেন ফকির বলেন, ‘সাইবার অপরাধ, অনলাইন জুয়া, ফিশিং ও সোশ্যাল মিডিয়ায় গুজব ছড়ানোর মতো অপরাধ এখন বড় সামাজিক সংকট। ফলে অপরাধ মোকাবেলায় দক্ষতার বিকল্প নেই। নতুন প্রযুক্তিতে দক্ষতা বাড়াতে হবে, প্রতিনিয়ত আপডেট হতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল ফরেনসিকের মতো জ্ঞানার্জন করতে হবে। সব ধরনের ভয়ভীতি, অনুরাগ-অনুকম্পা ও প্রলোভনের ঊর্ধ্বে থেকে মামলা তদন্ত, সব শ্রেণি-পেশার নাগরিকদের নিরাপত্তা বিধান এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হবে।’

ডিবি-সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগ সূত্র জানায়, মন্ত্রীদের সিল-সই জাল করা সাইবার অপরাধীচক্রের পাঁচ সদস্য ফারুক হোসেন, সাকিব খান, মাসুম মুনশী, মীর তৌহিদুল ইসলাম ও মো. বকুল মণ্ডলকে গ্রেপ্তার করে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁদের কাছ থেকে সাইবার অপরাধে ব্যবহৃত আটটি মোবাইল ফোন, দুটি কম্পিউটার এবং একটি ল্যাপটপ জব্দ করা হয়। এ ছাড়া মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নামে তৈরি করা ৪১টি জাল সিল জব্দ করা হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন সংসদ সদস্য ও মন্ত্রণালয়ের সচিবদের অফিশিয়াল লেটারহেডের ছয়টি বান্ডেল উদ্ধার করা হয়েছে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (গোয়েন্দা) মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘গ্রেপ্তাররা সংঘবদ্ধ সাইবার অপরাধীচক্রের সদস্য। এরা মন্ত্রীদের ছবি ব্যবহার করে ভুয়া হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট খুলে সাইবার অপরাধে যুক্ত ছিল। এদের বিরুদ্ধে নানা কৌশলে মালদ্বীপের মলদোভায় জনশক্তি রপ্তানিসংক্রান্ত একটি জাল সুপারিশপত্রও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপনের তথ্য পাওয়া গেছে। দীর্ঘদিন ধরে চক্রটি বিভিন্ন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্য, সচিব ও সরকারি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নাম-পরিচয় ব্যবহার করে জাল সিল, স্বাক্ষর ও অফিশিয়াল লেটারহেড তৈরি করে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতারণা করছে।’

ডিবি-সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম (দক্ষিণ) বিভাগ সূত্র জানায়, সম্প্রতি প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী এ বিষয়ে কিছু নথিপত্র উপস্থাপন করে তদন্তের অনুরোধ জানান। এ ঘটনায় তদন্তে নেমে সাইবার অপরাধীচক্রের সন্ধান মেলে।

পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে, পাশাপাশি সাইবার অপরাধের বড় শিকার হচ্ছেন নারীরা। তরুণী ও কিশোরীরা তাদের বড় টার্গেট। তবে সামাজিক কারণে দেশে অন্তত ৮৯ শতাংশ ভুক্তভোগী অভিযোগ করেন না। আর যাঁরা অভিযোগ করেন, তাঁদের মধ্যেও অন্তত ৭২ শতাংশের অভিযোগ পর্যাপ্ত প্রমাণের অভাবে খারিজ হয়ে যায়।

পুলিশের গত পাঁচ বছরের তথ্যানুযায়ী, তথ্য ও পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১২, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন-২০০৬ এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮-এর অধীনে মোট চার হাজার ৭৯৪টি মামলা দায়ের হয়েছে। কিন্তু পৃথক সাইবার অপরাধ ইউনিট না থাকায় এসব মামলার সঠিক তদন্ত ও নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ করা হয়েছে।

সিআইডি সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, বর্তমানে সিআইডি সাইবার পুলিশ সেন্টারে ২৫৮টি মামলা তদন্তাধীন রয়েছে। এর মধ্যে ৬৫১টি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) এবং ৭২০টির বেশি অভিযোগ নিয়ে তদন্ত চলছে।

সিআইডির সাইবার ইউনিটের তথ্য বলছে, বর্তমানে ফিশিং (ভুয়া ইমেইল, এসএমএস বা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে পাসওয়ার্ড, ব্যাংক তথ্য বা ওটিপি সংগ্রহ করা), ভুয়া অনলাইন কেনাবেচা, সোশ্যাল মিডিয়া প্রতারণা, বিনিয়োগ প্রতারণা, লটারি বা পুরস্কারের প্রতারণা ও রোমান্স স্ক্যামসহ অন্যান্য অনলাইন প্রতারণা বাড়ছে। এ ধরনের অভিযোগের মধ্যে ৪৫.৫২ শতাংশই অনলাইন প্রতারণা। এর বাইরে অনলাইন হয়রানির হার ২৯.১৪ শতাংশ। এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অ্যাকাউন্ট হ্যাকিংয়ের অভিযোগ ৬.১৪ শতাংশ।

গতকাল ডিবির সাইবার সাপোর্ট ভিকটিম সেন্টারে দায়িত্বপ্রাপ্তদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতিদিন সরাসরি এসে অন্তত ৪৫ জনের বেশি ভুক্তভোগী অভিযোগ দিচ্ছেন। এ ছাড়া ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম (উত্তর ও দক্ষিণ) আলাদা করে বিভিন্ন থানা থেকে জিডি ও মামলা তদন্তের দায়িত্ব পাচ্ছে। সব মিলিয়ে দুই ইউনিট ছয় শতাধিক জিডি, অভিযোগ ও মামলা পাচ্ছে।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের সাইবার (উত্তর) বিভাগের তথ্য বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত মামলা দায়ের হয়েছে ৭৩টি। মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে ৪৪টি। সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হয়েছে এক হাজার ৯৪টি। নিষ্পত্তি হয়েছে ৫৫০টি। একের পর এক হ্যাক হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সরকারের অতি গুরুত্বপূর্ণ পোর্টাল এবং ওয়েবসাইট।

গত ১১ মে ডিজিটাল অপরাধের ক্রমবর্ধমান প্রবণতা মোকাবেলায় পৃথক ‘সাইবার পুলিশ ইউনিট’ গঠনের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে সরকার। বাংলাদেশ পুলিশ এসংক্রান্ত একটি প্রস্তাব জমা দেওয়ার পর এ ঘোষণা আসে।

এ বিষয়ে সরকারের কঠোর অবস্থানের কথা জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচার ও সাইবার অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে অপরাধীদের শনাক্ত করে সঠিক বিচার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।’

টাঙ্গাইলের মাওলানা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. উমর ফারুক বলেন, ‘সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণে শুধু আইন প্রয়োগ নয়, জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। ডিজিটাল নিরাপত্তা ব্যবস্থায় গুরুত্ব দিতে হবে। সেই সঙ্গে মামলার দ্রুত তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে।’