এবার চীনের রাস্তায় ট্রাফিক সামলাচ্ছে ‘রোবোকপ’
ছবিঃ রয়টার্স
চীনের পূর্বাঞ্চলীয় শহর হাংঝৌতে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে নতুন ধরনের রোবট ব্যবহার করা হচ্ছে।দেখতে অনেকটা ‘রোবোকপ’-এর মতো হলেও এর সঙ্গে ১৯৮৭ সালের জনপ্রিয় সিনেমার রোবোকপের পুরোপুরি মিল নেই।
এতে কোনো বন্দুক নেই, কাউকে গ্রেপ্তার করার ক্ষমতাও নেই। সিনেমার রোবোকপের মতো দুই পায়ে হাঁটেও না। বরং চার চাকার ওপর চলাচল করে এটি।
তবে রোবটটি রাস্তায় ট্রাফিক আইন ভাঙার ঘটনা শনাক্ত করতে পারে।
যেমন—হেলমেট ছাড়া ই-বাইক চালানো, ই-বাইকে অতিরিক্ত যাত্রী বহন করা, গাড়ি নির্ধারিত দাগের বাইরে থামানো এবং ট্রাফিক সিগন্যাল না মেনে পথচারীদের রাস্তা পার হওয়ার মতো ঘটনা এটি শনাক্ত করতে পারে। হাংঝৌর একটি ব্যস্ত মোড়ে ১ দশমিক ৮৮ মিটার বা প্রায় ৬ ফুট ২ ইঞ্চি উচ্চতার এই রোবটকে দেখা যাচ্ছে। কেউ হেলমেট ছাড়া ই-বাইক চালালে রোবটটি তাকে শনাক্ত করে ভদ্রভাবে সতর্ক করে। ট্রাফিক সিগন্যালের সঙ্গে মিল রেখে যান্ত্রিক হাত নেড়ে সংকেতও দিতে পারে।
টি-২ নামের রোবটটির ওজন ৯৮ কেজি। এটি এখন একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্পের অংশ হিসেবে কাজ করছে। প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য হলো ট্রাফিক পুলিশের নিয়মিত ও বারবার করতে হয় এমন কিছু কাজ প্রযুক্তির মাধ্যমে করানো। সুপকনের বুদ্ধিমান স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা উদ্ভাবনকেন্দ্রের প্রধান চাও হুই বলেন, রোবটটি ক্যামেরা, রাডার ও নিজস্ব কম্পিউটার ব্যবহার করে ট্রাফিক আইন ভাঙার ঘটনা শনাক্ত করে।স্থানীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান সুপকন ইনফরমেশন এই রোবট তৈরি করেছে।
মে মাস থেকে হাংঝৌ শহরে ১৫টি রোবট মোতায়েন করেছে সুপকন। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এসব রোবট এখন পর্যন্ত ১ লাখ ৭০ হাজারের বেশি সতর্কবার্তা দিয়েছে। সুপকনের দাবি, রোবট ব্যবহারের পর হেলমেট ছাড়া বাইক চালানো এবং নির্ধারিত থামার দাগ অতিক্রম করার মতো ঘটনার সংখ্যা মাসে ৪০ শতাংশের বেশি কমেছে। তবে হাংঝৌ ট্রাফিক পুলিশ এ বিষয়ে মন্তব্য করেনি। রোবটগুলো শুধু আইন ভাঙা শনাক্ত বা সতর্ক করার কাজই করে না।
রোবটের সাত জোড়া চলনশীল হাত রয়েছে। চাও হুই জানান, ট্রাফিক সিগন্যালের সঙ্গে মিল রেখে এসব হাতের সাহায্যে পুলিশ সদস্যদের প্রচলিত বিভিন্ন সংকেত দেখাতে পারে রোবটটি।
চাও হুই বলেন, পর্যটন এলাকা, স্কুল এলাকা, ব্যবসায়িক এলাকা, ব্যস্ত সময়ে যানজট এবং খারাপ আবহাওয়ার মধ্যেও কয়েক হাজার ঘণ্টা ধরে এসব রোবটের পরীক্ষা চালানো হয়েছে। তবে প্রযুক্তিটির কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। তীব্র রোদ, বৃষ্টি এবং অতিরিক্ত গরম বা ঠাণ্ডায় রোবটের ক্যামেরা ও রাডার ঠিকভাবে কাজ করতে সমস্যা হতে পারে। সুপকনের দাবি, ট্রাফিক আইন ভাঙার ঘটনা শনাক্ত করতে রোবটগুলোর নির্ভুলতার হার ৯৫ শতাংশের বেশি।
পথনির্দেশ, পার্কিং এবং ট্রাফিক আইন নিয়ে সাধারণ মানুষের প্রশ্নের উত্তরও দিতে পারে। জরুরি প্রয়োজনে এগুলোর মাধ্যমে স্থানীয় পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব।এ সময় রিমোট কন্ট্রোল ছাড়াই নির্ধারিত এলাকার মধ্যে চলাচল করে তারা। একটি কেন্দ্রীয় প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ট্রাফিক পুলিশ রোবটগুলোর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করতে পারে। প্রয়োজন অনুযায়ী কোন রোবটকে কোথায় পাঠানো হবে, সেটিও সেখান থেকে ঠিক করা যায়। সুপকনের দাবি, চীনের তিনটি প্রদেশের প্রায় আটটি শহরে এখন প্রায় ৫০টি এ ধরনের রোবট কাজ করছে। চলতি বছরের শেষ নাগাদ এই সংখ্যা প্রায় ২০০-তে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।
চাও হুই বলেন, আইন ভাঙার পর মানুষকে শাস্তি দেওয়ার বদলে আগে থেকেই সতর্ক করাই এই ব্যবস্থার অন্যতম লক্ষ্য। এতে কোনো ভুল আচরণ নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হওয়ার আগেই মানুষকে সতর্ক করা সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, রোবটগুলোর একটি বড় সুবিধা হলো এগুলো ক্লান্ত হয় না এবং দীর্ঘ সময় ধরে একই ধরনের কাজ করতে পারে। সুপকনের তৈরি রোবটগুলো সকাল ৭টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত নিজে থেকেই কাজ করতে পারে
বিশেষ করে যেসব এলাকায় ট্রাফিক পুলিশকে দীর্ঘ সময় ধরে কঠিন আবহাওয়ার মধ্যে রাস্তায় কাজ করতে হয়, সেখানে এসব রোবট কাজে আসতে পারে বলে মনে করছে প্রতিষ্ঠানটি। আইমোগা মধ্যপ্রাচ্যের তীব্র গরম এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দীর্ঘ বর্ষাকালের উদাহরণ দিয়েছে। এসব পরিস্থিতিতে রোবট ব্যবহার করলে পুলিশ সদস্যদের ওপর কাজের চাপ কমানো সম্ভব হতে পারে।
চীনের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এখন রোবটকে শুধু প্রদর্শনীতে কসরত দেখানো বা শোরুমে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের কাজে সীমাবদ্ধ রাখতে চাইছে না। বাস্তব জীবনের বিভিন্ন কাজে রোবট ব্যবহারের চেষ্টা বাড়ছে। ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণও এর একটি বড় ক্ষেত্র। চেরি সমর্থিত রোবট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান আইমোগা বিদেশের বাজারেও পুলিশ রোবট ব্যবহারের সম্ভাবনা দেখছে।
তবে বিদেশে পুলিশ রোবট মোতায়েন করা সহজ হবে না বলে মনে করছেন আইমোগার নির্বাহী কর্মকর্তা ঝাং গুইবিং। তিনি বলেন, গাড়ি রপ্তানির তুলনায় পুলিশ রোবট বিদেশে পাঠানো অনেক বেশি জটিল। কারণ রোবটগুলোকে সংশ্লিষ্ট দেশের স্থানীয় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় অনুমোদন নিতে হবে। তথ্য সুরক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এসব রোবট ক্যামেরা ও বিভিন্ন সেন্সরের মাধ্যমে আশপাশের মানুষের ছবি, যানবাহন ও পরিবেশসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। ফলে বিদেশে ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্থানীয় তথ্য সুরক্ষা ও গোপনিয়তার নিয়ম মেনে চলতে হবে। চীনে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে এই রোবটগুলোর ব্যবহার এখনো পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে। তবে সুপকনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এ বছরের শেষ নাগাদ রোবটের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।