সিগারেটের বদলে ভ্যাপ করছেন? নতুন গবেষণায় সতর্কতা
ফাইল ছবি
সিগারেট স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর—এ কথা আমরা কমবেশি সবাই জানি। ধূমপান ফুসফুসের ক্যানসারসহ নানা রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।দীর্ঘদিন ধূমপান করলে হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকিও বাড়ে।
কিন্তু এখন অনেকেই মনে করেন, সিগারেটের বদলে ভ্যাপ, ই-সিগারেট বা নিকোটিন পাউচ ব্যবহার করলে হয়তো ক্ষতি অনেকটাই কমে যাবে। বিশেষ করে যেহেতু এসব পণ্যে প্রচলিত সিগারেটের মতো ধোঁয়া বা তামাক পোড়ানোর প্রক্রিয়া নেই।
নতুন একটি বড় বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনা বলছে, বিষয়টি এতটা সহজ নয়।
গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে ন্যাচার রিভউস কার্ডিওলজি-তে। গবেষকদের মতে, সিগারেট সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর হলেও ভ্যাপ, হিটেড-টোব্যাকো এবং মুখে ব্যবহৃত নিকোটিনজাত পণ্যকেও হৃদ্যন্ত্র ও রক্তনালির জন্য নিরাপদ বলা যায় না।
আসল সমস্যা শুধু ধোঁয়া নয়, নিকোটিনও
সিগারেটের ক্ষতির বড় একটি কারণ হলো তামাক পোড়ানোর সময় তৈরি হওয়া হাজারো রাসায়নিক পদার্থ। এ কারণেই সাধারণ সিগারেটকে নিকোটিন গ্রহণের সবচেয়ে ক্ষতিকর মাধ্যম হিসেবে ধরা হয়।
তবে গবেষকদের বক্তব্য হলো, ধোঁয়া না থাকলেই ঝুঁকি শূন্য হয়ে যায় না।
নিকোটিন নিজেও শরীরের হৃদ্যন্ত্র ও রক্তনালির ওপর প্রভাব ফেলে। নতুন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, নিকোটিন রক্তনালির কোষে এমন কিছু পরিবর্তন ঘটাতে পারে, যার ফলে রক্তনালি স্বাভাবিকভাবে শিথিল ও প্রসারিত থাকার ক্ষমতা হারায়।
এর সঙ্গে প্রদাহ, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস এবং রক্ত জমাট বাঁধার মতো প্রক্রিয়াও যুক্ত হতে পারে। এসব পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদে হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের
মতো গুরুতর সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত।
তাহলে ভ্যাপ কি সিগারেটের মতোই ক্ষতিকর?
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বুঝতে হবে।
গবেষণাটি বলছে না যে সিগারেট, ভ্যাপ ও নিকোটিন পাউচ—সবকিছু সমান ক্ষতিকর।
বরং ক্ষতির মাত্রায় পার্থক্য রয়েছে।
তামাক পোড়ানো হয় এমন পণ্য—বিশেষ করে সিগারেট ও হুকা/শিশা—সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর। এরপর রয়েছে হিটেড-টোব্যাকো পণ্য। তার পর ই-সিগারেট বা ভ্যাপজাতীয় অ্যারোসল পণ্য। আর মুখে ব্যবহৃত নিকোটিনজাত পণ্য যেমন নিকোটিন পাউচ ও কিছু ধরনের চিবানোর তামাক তুলনামূলকভাবে নিচের দিকে রয়েছে।
অর্থাৎ, সিগারেটের তুলনায় কিছু বিকল্প পণ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিকের সংস্পর্শ কম হতে পারে, কিন্তু সেগুলোকে হৃদ্যন্ত্রের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ বলা যাবে না।
নিকোটিন কীভাবে হৃদ্যন্ত্রের ওপর চাপ তৈরি করে?
নিকোটিন শরীরে প্রবেশ করার পর স্নায়ুতন্ত্রকে উত্তেজিত করতে পারে। এর ফলে হৃদ্স্পন্দন ও রক্তচাপ বাড়তে পারে এবং রক্তনালি সংকুচিত হতে পারে।
নতুন গবেষণায় আরো যে বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে, তা হলো রক্তনালির ভেতরের আবরণ-এর স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়া।
এই আবরণটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। এটি রক্তপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে, রক্তচাপের ভারসাম্য বজায় রাখে এবং রক্ত জমাট বাঁধা ও প্রদাহ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে।
এই ব্যবস্থায় সমস্যা হলে ধীরে ধীরে রক্তনালির স্বাস্থ্য খারাপ হতে পারে। গবেষকদের মতে, নিকোটিনের কারণে তৈরি হওয়া প্রদাহ, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস ও ধমনির শক্ত হয়ে যাওয়ার মতো পরিবর্তন হৃদ্যন্ত্রের জন্য উদ্বেগের কারণ।
নিকোটিন পাউচ কি নিরাপদ?
বাংলাদেশে ভ্যাপ ও ই-সিগারেট নিয়ে আলোচনা বেশি হলেও বিশ্বজুড়ে নিকোটিন পাউচও জনপ্রিয় হচ্ছে।
এগুলো সাধারণত ঠোঁট ও মাড়ির মাঝখানে রাখা হয়। এতে ধোঁয়া নেই, তামাক পোড়ানো হয় না, এমনকি অনেক পণ্যে তামাকপাতাও থাকে না।
তবে এর মাধ্যমে শরীরে নিকোটিন প্রবেশ করে।
তাই ধোঁয়া না থাকলেও নিকোটিনের কারণে হৃদ্স্পন্দন, রক্তচাপ এবং রক্তনালির ওপর প্রভাব পড়তে পারে। গবেষকদের মতে, নিকোটিনযুক্ত কোনো পণ্যকেই হৃদ্যন্ত্রের জন্য পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত বলা ঠিক হবে না।
বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বাংলাদেশে ধূমপানের পাশাপাশি জর্দা, গুল, সাদাপাতা ও অন্যান্য ধোঁয়াবিহীন তামাক ব্যবহারের প্রবণতাও রয়েছে। একই সঙ্গে তরুণদের মধ্যে ভ্যাপ ও ই-সিগারেট নিয়েও আগ্রহ দেখা যাচ্ছে।
ফলে ‘সিগারেট না, তাই নিরাপদ’—এমন ধারণা বিপজ্জনক হতে পারে।
বিশেষ করে যারা আগে কোনো নিকোটিনজাত পণ্য ব্যবহার করতেন না, তাদের জন্য ভ্যাপ বা নিকোটিন পাউচ শুরু করার কোনো স্বাস্থ্যগত সুবিধা নেই। কারণ এতে নিকোটিনের প্রতি নির্ভরতা বা আসক্তি তৈরি হতে পারে।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি
এই গবেষণার ফলাফলকে এমনভাবে বোঝা উচিত নয় যে একজন নিয়মিত সিগারেট খাওয়া ব্যক্তি সিগারেট ছেড়ে ভ্যাপ বা অন্য নিকোটিন পণ্যে গেলে কোনো লাভ নেই।
সিগারেটের ধোঁয়ায় থাকা অসংখ্য বিষাক্ত পদার্থের কারণে দহনযুক্ত তামাক সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর। তাই ধূমপান পুরোপুরি বন্ধ করা সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত।
তবে সিগারেটের বিকল্পকে ‘পুরোপুরি নিরাপদ’ মনে করাও ভুল।
গবেষকদের মূল বক্তব্য হলো—দহন বা ধোঁয়া বাদ দিলে ক্ষতি কমতে পারে, কিন্তু নিকোটিনজনিত হৃদ্যন্ত্রের ঝুঁকি পুরোপুরি দূর হয় না।
গবেষকদের শেষ কথা
গবেষকদের মতে, নিকোটিন গ্রহণের সবচেয়ে নিরাপদ পথ হলো নিকোটিন থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা।
বিশেষ করে যারা ধূমপান করেন না, তাদের ভ্যাপ, ই-সিগারেট বা নিকোটিন পাউচকে ‘নিরাপদ বিকল্প’ হিসেবে শুরু করা উচিত নয়।
আর যারা নিয়মিত ধূমপান করেন, তাদের জন্য সবচেয়ে ভালো লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু সিগারেট বদলে অন্য নিকোটিন পণ্যে যাওয়া নয়—বরং শেষ পর্যন্ত নিকোটিনের ব্যবহারই বন্ধ করা।