তিন শতাধিক কলেজে একাদশে শিক্ষার্থী নেই

তিন শতাধিক কলেজে একাদশে শিক্ষার্থী নেই

প্রতীকী ছবি

শিক্ষার্থীর জন্য যেন হাহাকার চলছে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, তিন শতাধিক কলেজের একদশ শ্রেণিতে ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে ন্যূনতম একজন শিক্ষার্থীও নেই। এই তালিকায় রাজধানীর কয়েকটি কলেজও রয়েছে। বছরের পর বছর শিক্ষার্থী না পাওয়ায় নতুন শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থী ভর্তির জন্য মরিয়া এসব কলেজ। এদের কারো কারো বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের অজান্তে আবেদন করিয়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন শিক্ষার্থী পাশ করেছে। এর বিপরীতে একাদশ শ্রেণিতে কলেজ ও মাদ্রাসা মিলিয়ে আসন রয়েছে প্রায় ২৫ লাখ ৬৩ হাজার ৬৩টি। ফলে সব পাশ করা শিক্ষার্থী একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হলেও ১৪ লাখের বেশি আসন খালি থাকবে। শিক্ষাবিদরা বলছেন, প্রতি বছর এসএসসিতে অংশগ্রহণ এবং পাশের সংখ্যা দুটোই কমছে। আর শিক্ষার্থীর তুলনায় কলেজের সংখ্যা অনেক বেশি হয়ে গেছে।

এদিকে, সারা দেশের ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষের কলেজ ভর্তির নীতিমালা প্রকাশ করা হয়েছে। নীতিমালা অনুযায়ী, আগামী ২ সেপ্টেম্বর এই ভর্তির আবেদন গ্রহণ শুরু হবে। চলবে ১০ সেপ্টেম্বর রাত ৮টা পর্যন্ত। ক্লাস শুরু হবে ২৩ সেপ্টেম্বর। এদিকে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির আসনের ৭ শতাংশ কোটায় রাখা হয়েছে। কলেজগুলোর মোট আসনের বাকি ৯৩ শতাংশ সবার জন্য মেধার ভিত্তিতে উন্মুক্ত থাকবে। এসব আসনে এসএসসি ও সমমানের ফলের ভিত্তিতে মেধাক্রম তৈরি করে শিক্ষার্থী নির্বাচন করা হবে। অবশিষ্ট ৭ শতাংশ আসনের মধ্যে ৫ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা ও শহিদ মুক্তিযোদ্ধাদের পুত্র-কন্যাদের জন্য এবং ২ শতাংশ শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও এর অধীন দপ্তর-সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সন্তানদের জন্য সংরক্ষণ থাকবে। তবে এই কোটা পদ্ধতি শুধু ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য প্রযোজ্য হবে।

জিপিএ সমান হলে যেভাবে মেধাক্রম : সমান জিপিএ প্রাপ্তদের ক্ষেত্রে সর্বমোট প্রাপ্ত নম্বরের ভিত্তিতে মেধাক্রম নির্ধারণ করা হবে। বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড, কারিগরি শিক্ষা বোর্ড ও বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় এর ক্ষেত্রে গ্রেড পয়েন্ট ও প্রাপ্ত নম্বর সমতুল্য করে হিসাব করতে হবে। তাছাড়া বিভিন্ন সালের গ্রেড পয়েন্ট ও প্রাপ্ত নম্বর সমতুল্য করে হিসাব করতে হবে। প্রথম দফায় নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের ফল ১৭ সেপ্টেম্বর রাত ৮টায় প্রকাশ করা হবে। নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের ভর্তি কার্যক্রম চলবে ২০ থেকে ২২ সেপ্টেম্বর। ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে নিয়মিত ক্লাস শুরু হবে।

শিক্ষার্থী সংকটে যেসব কলেজ : রাজধানীর মগবাজার এলাকার ন্যাশনাল ব্যাংক পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ বেশ কয়েক বছর ধরে তীব্র শিক্ষার্থী সংকটে ভুগছে। ১৯৮৯ সালে ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেড কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত এই এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানটি একসময় নামকরা হলেও বর্তমানে পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী আকর্ষণ করতে পারছে না। একাদশ শ্রেণিতে শূন্য শিক্ষার্থী থাকা কলেজগুলোর মধ্যে আছে খিলগাঁও এলাকার প্রাইম সিটি ইন্টারন্যাশনাল কলেজ, মোহাম্মদপুরে ট্রিনিটি কলেজ, মতিঝিলের ওয়েস্টার্ন কলেজ, উত্তরার স্টামফোর্ড কলেজ, পদ্মকানন রোডের সেন্ট্রাল আইডিয়াল কলেজ, উত্তরার হলি চাইল্ড কলেজ, সাতমসজিদ রোডের ঢাকা পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, গ্রীন রোডের আনোয়ার আইডিয়াল কলেজ, কেরানীগঞ্জের লাইসাম কলেজ, টঙ্গীর পূবাইল কমার্স কলেজ, ঢাকার নবাবগঞ্জের উপজেলার নবাবগঞ্জ পাইলট হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মিরপুর এলাকার খান ইন্টারন্যাশনাল কলেজ, মোহাম্মদপুরের সানওয়ে স্কুল অ্যান্ড কলেজ, নর্দান ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি কলেজ, মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার বালিয়াটি কলেজ, মিরপুরের সরোজ ইন্টারন্যাশনাল কলেজ, নিকুঞ্জ এলাকার রেসিডেন্সিয়াল ল্যাবরেটরি কলেজ, পাকুন্দিয়া উপজেলার চরটেকী গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার মেদিনীমন্ডল গার্লস কলেজ, মানিকগঞ্জের ডা. আব্দুর রহমান খান মহিলা কলেজ এবং রাজবাড়ীর জঙ্গল সম্মিলনী আদর্শ হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ।  এর বাইরে রাজধানী এবং মফস্সল এলাকায় আরো অনেক কলেজে একাদশে নেই শিক্ষার্থী।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) কলেজ শাখা সূত্রে জানা গেছে, সাধারণত দেখা যায় প্রতি বছর এসএসসি পাশ করা শিক্ষার্থীর মধ্যে অন্তত ১০ শতাংশ একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হয় না। এ বছরও যদি সেটা হয়, তাহলে খালি আসনের সংখ্যা আরো বাড়বে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের একজন অধ্যাপক গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, একাদশ শ্রেণিতে বিপুলসংখ্যক আসন খালি থাকার অর্থ হলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বিদ্যমান সক্ষমতার বড় একটি অংশ অব্যবহূত থাকছে। এ অবস্থায় নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, নতুন বিভাগ বা অতিরিক্ত আসন তৈরির পরিবর্তে বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা, শিক্ষার মান ও বিষয়ভিত্তিক চাহিদা পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজন।

উচ্চশিক্ষায় প্রভাব পড়তে পারে : শিক্ষার্থীসংখ্যা কমার প্রবণতা অব্যাহত থাকলে উচ্চশিক্ষায় এর বহুমাত্রিক প্রভাব পড়তে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে আসন খালি থাকার পাশাপাশি শিক্ষক, অবকাঠামো ও অর্থায়নের ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। বিশেষ করে বেসরকারি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষার্থী ধরে রাখতে আরো বেশি প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে পারে। অন্যদিকে শিক্ষার্থী কমে যাওয়াকে শিক্ষার মান উন্নয়নের সুযোগ হিসেবেও দেখছেন কেউ কেউ। শিক্ষার্থীর চাপ কমলে প্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত উন্নত করা, গবেষণা বাড়ানো এবং দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা জোরদার করার সুযোগ পেতে পারে। তবে এর জন্য এখন থেকেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।