সিরিয়ায় ইসরায়েলি হামলা, তবুও তুরস্ক নীরব কেন?

সিরিয়ায় ইসরায়েলি হামলা, তবুও তুরস্ক নীরব কেন?

ফাইল ছবি।

সম্প্রতি সিরিয়ার ইসরায়েলের সামরিক হামলার প্রেক্ষাপটে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে একধরনের কূটনৈতিক ও কৌশলী সংযম বজায় রাখছে তুরস্ক।আঙ্কারার লক্ষ্য হলো আগামী অক্টোবরে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ইসরায়েলের সাধারণ নির্বাচন পর্যন্ত এই দৃশ্যমান নীরবতা ধরে রাখা। যাতে এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তার রাজনৈতিক সংকটে পড়ে যাওয়া নির্বাচনী প্রচারণায় কোনো সুবিধা নিতে না পারেন।

সম্প্রতি উত্তর সিরিয়ার আবু আল-দুহুর সামরিক বিমানঘাঁটিতে হামলা চালায় ইসরায়েলি বাহিনী, যা তুর্কি সীমান্ত থেকে মাত্র ৭০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।

ঘটনাটিকে উসকানিমূলক বলে মনে করা হলেও আঙ্কারার নীতিনির্ধারকদের কাছে এটি মোটেও অপ্রত্যাশিত ছিল না। হামলার সপক্ষে তেল আবিব দাবি করেছে, আঙ্কারা নাকি ওই ঘাঁটিতে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল।  

তবে এই দাবি পুরোপুরি ভিত্তিহীন হিসেবে দেখছেন তুর্কি কর্মকর্তারা। এ বিষয়ে এক তুর্কি কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ইসরায়েল এর আগেও সিরিয়ার অন্যান্য ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে।

এই নির্দিষ্ট ঘাঁটিতে হামলার বিশেষ কোনো গুরুত্ব নেই। তিনি আরও যুক্ত করেন, সরকারি বক্তব্যের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান ইতোমধ্যেই বিশ্বমঞ্চে পরিষ্কার করেছে তুরস্ক। আঙ্কারার মূল পর্যবেক্ষণ হলো, দেশের ভেতরে নেতানিয়াহু তীব্র রাজনৈতিক চাপে রয়েছেন এবং তুরস্কের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়িয়ে সেই সংকট থেকে বাঁচার পথ খুঁজছেন। ওই কর্মকর্তা নেতানিয়াহুর এই উসকানিমূলক আচরণকে উদ্দেশ্য করে মন্তব্য করেন, তিনি যে এটি করার চেষ্টা করছেন, সে দিক থেকে তিনি নিশ্চিতভাবেই একজন উন্মাদ ব্যক্তি।

আঙ্কারার প্রশাসনিক মহলে প্রবল আশাবাদী, আসন্ন নির্বাচনে সরকারের পতন ঘটবে এবং ক্ষমতা থেকে নেতানিয়াহুর বিদায়ের পর তুলনামূলকভাবে যুক্তিবাদী রাজনীতিবিদরা ইসরায়েলের নেতৃত্বে আসবেন। আঙ্কারার দায়িত্বশীল সূত্রগুলো ডেমোক্র্যাটস দলের চেয়ারম্যান ও সাবেক জেনারেল ইয়াইর গোলানের মতো রাজনীতিবিদের কথা উল্লেখ করছে, যিনি নেতানিয়াহুর ধারাবাহিক সামরিক উত্তেজনার কঠোর বিরোধিতা করেছেন।

এর বাইরে, সিরিয়ার বিমানঘাঁটিতে হামলার সময় দুই দেশের মধ্যকার হটলাইন ব্যবহার না করার ইসরায়েলি সিদ্ধান্তকে অত্যন্ত বিপজ্জনক বলে মনে করছেন তুর্কি বিশ্লেষকেরা। উপরন্তু, গত বছর বাকুতে অনুষ্ঠিত বৈঠকে তুর্কি ও ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের মধ্যে যে একটি পারস্পরিক বোঝাপড়া তৈরি হয়েছিল, এই হামলার মাধ্যমে তেল আবিব সেই চুক্তি লঙ্ঘন করেছে।

আঙ্কারা ও তেল আবিবের পরামর্শ প্রক্রিয়ার সঙ্গে পরিচিত এক আঞ্চলিক কর্মকর্তা এ বিষয়ে বিস্তর তথ্য প্রদান করেছেন।

তাঁর মতে, পালমিরা শহরের কাছে অবস্থিত টি-ফোর বিমানঘাঁটির উত্তরের এলাকাকে ইসরায়েল ও তুরস্কের নিজ নিজ নিরাপত্তা অঞ্চলের সীমান্ত লাইন বা বিভাজন রেখা হিসেবে মেনে নিতে উভয় পক্ষ সম্মত হয়েছিল।

উল্লেখ্য, এই টি-ফোর ঘাঁটিকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে মতবিরোধ চলছিল, কারণ আঙ্কারা এটিকে ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে অভিযানের জন্য একটি ড্রোন ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিল। তবে তুর্কি সামরিক বাহিনী সেখানে অবস্থান নেওয়ার আগেই ইসরায়েল সেই ঘাঁটিতে বোমা বর্ষণ করে, যার ফলশ্রুতিতে সংঘাত এড়াতে দুটি দেশ একটি সমঝোতা আলোচনা শুরু করে। মূল সমঝোতাটি গড়ে উঠেছিল মূলত ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধের পরিস্থিতিতে সিরিয়ার আকাশসীমায় একটি নিরাপদ বিমান করিডোর বজায় রাখার ইসরায়েলি অনুরোধকে কেন্দ্র করে।

সেই আঞ্চলিক কর্মকর্তা আরও জানান, উত্তর সিরিয়ায় তুরস্কের রাডার ও বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েনে ইসরায়েলের তীব্র আপত্তি থাকা সত্ত্বেও উভয় পক্ষের মধ্যকার আলোচনায় এ পর্যন্ত অগ্রগতি নিয়ে তারা তুলনামূলক সন্তুষ্ট ছিল। কিন্তু গত সপ্তাহের সামরিক পদক্ষেপের মাধ্যমে এটিই স্পষ্ট হয়েছে যে, তুর্কি সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় তুরস্কের সাহায্যে চালিত বা তুর্কি সমর্থিত যেকোনো বিমানঘাঁটির অস্তিত্বকে ইসরায়েল শক্ত হাতে দমন করতে চায়।

আঙ্কারার পাশাপাশি সিরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীন পর্যবেক্ষণ থেকেও এটি নিশ্চিত করা হয়েছে যে, আবু আল-দুহুর বিমানঘাঁটিতে তুর্কি সেনা বা সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েনের কোনো উদ্যোগই নেওয়া হয়নি। অতএব, এই হামলাকে পূর্ববর্তী সমঝোতার সরাসরি লঙ্ঘন হিসেবে দেখছে তুরস্ক।

সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে তুরস্কের শীর্ষ নীতিনির্ধারকেরা এখন আর ইসরায়েলের বর্তমান সরকারকে কোনো যুক্তিযুক্ত বা স্বাভাবিক রাজনৈতিক পক্ষ হিসেবে গণ্য করছেন না। তুর্কি কর্মকর্তাদের স্পষ্ট মত, প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান যে অত্যন্ত ধীরস্থির ও দায়িত্বশীল আচরণের মাধ্যমে আঞ্চলিক শান্তি বজায় রাখছেন, তা গোটা বিশ্ব আজ প্রত্যক্ষ করছে। ধারাবাহিক ইসরায়েলি উসকানি ও নেতানিয়াহুর তীব্র বক্তব্য সত্ত্বেও এরদোগান তাঁর গ্রীষ্মকালীন ছুটি সংক্ষিপ্ত করেননি।

ছুটি কাটানোর সময় মারমারিসের স্থানীয় রাজনীতিবিদদের সঙ্গে হালকা মেজাজে আলাপকালে তাঁকেই দেখা গেছে। ছুটি শেষে মঙ্গলবার এক রাজনৈতিক বক্তব্যে সরাসরি ইসরায়েল বা নেতানিয়াহুর নাম উচ্চারণ না করে এরদোয়ান বলেন, তিনি রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠা “হত্যাকারী চক্রের” উসকানিতে সাড়া দিয়ে তাদের গুরুত্ব বাড়াতে চান না।

তবে তিনি দৃঢ় কণ্ঠে জানান যে, মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে আঙ্কারার নিজস্ব একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে এবং কোনো পরিস্থিতিতেই তুরস্ক তার ঘনিষ্ঠ মিত্রদের একা ছেড়ে দেবে না। একই সঙ্গে তিনি পুনরুল্লেখ করেন, তুরস্কের কোনো গোপন উদ্দেশ্য নেই এবং তারা কেবল আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠাতেই কাজ করছে।

তুর্কি প্রশাসনের এই সতর্ক ও সংযমী অবস্থানের নেপথ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নেতানিয়াহুর সম্পর্কের অবনতিও বড় ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে গত এক বছরে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে নেতানিয়াহুর মতপার্থক্য প্রকাশ্যে এসেছে, যার মূলে রয়েছে ইরান, লেবানন ও গাজা সংক্রান্ত ইসরায়েলের একঘেয়ে ও চরমপন্থী দাবিগুলো। সরাসরি সংঘাতের পথ এড়িয়ে তুরস্ক পুরো বিষয়টি ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক কৌশলের ওপর ছেড়ে দিয়েছে।

এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত থমাস বারাকের সঙ্গে আঙ্কারার তৈরি হওয়া অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ট্রাম্প ও এরদোগানের পারস্পরিক সদ্ব্যবহারের সুযোগ নিয়ে চলতি সপ্তাহে সিরিয়া সম্পর্কিত বেশ কয়েকটি ইস্যুতে ইসরায়েলের জোর আপত্তি অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছে তুরস্ক।

এর ধারাবাহিকতায় প্রথম সাফল্য হিসেবে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর দীর্ঘ ৪৭ বছর পর সিরিয়াকে সন্ত্রাসবাদের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষক তালিকার বাইরে নিয়ে এসেছে। ইসরায়েলি নেতৃত্ব সিরিয়ার অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারাকে একজন চরমপন্থী ও মিলিশিয়া নেতা হিসেবে প্রচার করলেও ওয়াশিংটন সেই অবস্থান প্রত্যাখ্যান করেছে।

একই সঙ্গে আহমেদ আল-শারার সাবেক সংগঠন আল-নুসরা ফ্রন্ট তথা হায়াত তাহরির আল-শামকে যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক সন্ত্রাসী তালিকার বিশেষ ক্যাটাগরি থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয়ত, সিরিয়াকে একটি দুর্বল ও বিভিন্ন খণ্ডে বিভক্ত রাষ্ট্রে পরিণত করার ইসরায়েলি প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিয়ে এক ঐতিহাসিক অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে।

কুর্দি নেতৃত্বাধীন সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেসের প্রধান সেনাপতি মাজলুম আবদি তার সমস্ত বাহিনীকে দামেস্ক সরকারের অধীনে পূর্ণাঙ্গ একীভূতকরণ এবং তাদের স্বঘোষিত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল বিলুপ্তির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছেন, যা আঙ্কারার জন্য একটি বিশাল ভূ-রাজনৈতিক বিজয়।

সমগ্র বাস্তবতার নিরিখে তুরস্কের দূরদর্শী ভূমিকার কথা ব্যাখ্যা করে দ্বিতীয় এক তুর্কি কর্মকর্তা বলেন, তুরস্ক সিরিয়াকে কেন্দ্র করে দীর্ঘমেয়াদি খেলা খেলছে।

ইসরায়েলি পদক্ষেপের সঙ্গে নিজেদের পার্থক্যের কথা তুলে ধরে তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, ইসরায়েলিদের মতো হঠকারী সিদ্ধান্ত না নিয়ে আমরা একটি সার্বভৌম, স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ সিরিয়া গঠনে অগ্রাধিকার দিচ্ছি; যা গোটা অঞ্চলে প্রকৃত নিরাপত্তা ও দীর্ঘস্থায়ী শান্তি সুপ্রতিষ্ঠিত করবে