প্রকৃতি রক্ষায় বন্যপ্রাণীর ব্যাপারে ইসলামের নির্দেশনা

প্রকৃতি রক্ষায় বন্যপ্রাণীর ব্যাপারে ইসলামের নির্দেশনা

ফাইল ছবি

বনভূমির নীরবতা ভেঙে পাখির ডাক, নদীর পাড়ে হরিণের ছুটে চলা কিংবা আকাশে পাখির সারি—এসব শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য নয়; এগুলো আল্লাহর সৃষ্টির বৈচিত্র্য ও নিখুঁত ব্যবস্থাপনার নিদর্শন। কিন্তু মানুষের নির্বিচার শিকার, বন উজাড়, আবাসস্থল ধ্বংস ও পরিবেশদূষণের কারণে পৃথিবীর অসংখ্য প্রাণী আজ অস্তিত্বের সংকটে।

বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও তাদের সুরক্ষার বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে ৪ সেপ্টেম্বর জাতীয় বন্যপ্রাণী দিবস পালিত হচ্ছে। 

বন্যপ্রাণী রক্ষার বিষয়টি আধুনিক পরিবেশচেতনার অংশ হলেও এর মূল নীতিগুলো ইসলামের শিক্ষায় বহু আগেই সুস্পষ্টভাবে পাওয়া যায়। কোরআন ও হাদিস মানুষকে শুধু মানুষের প্রতি দয়া করতে বলেনি; বরং আল্লাহর সব সৃষ্টির প্রতি দায়িত্বশীল ও দয়াশীল হওয়ার শিক্ষা দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘পৃথিবীতে বিচরণশীল এমন কোনো প্রাণী নেই এবং নিজ ডানা দিয়ে উড়ে এমন কোনো পাখিও নেই, যারা তোমাদের মতো একেকটি সম্প্রদায় নয়।

’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ৩৮)

এই আয়াত আমাদের সামনে প্রাণিজগতের একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য তুলে ধরে। প্রতিটি প্রাণীর নিজস্ব জীবন, প্রয়োজন ও পরিবেশ রয়েছে। তারা নিছক মানুষের ভোগের বস্তু নয়। আল্লাহ তাদেরও একটি নির্দিষ্ট ব্যবস্থার অধীনে সৃষ্টি করেছেন।

তাই কোনো প্রাণীকে অকারণে হত্যা করা, তার আবাসস্থল ধ্বংস করা কিংবা বিনোদনের জন্য শিকার করা ইসলামের দয়ার শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাই বন্যপ্রাণী হত্যা করে পৃথিবীতে ভারসাম্য নষ্ট করা যাবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর আকাশকে তিনি সমুন্নত করেছেন এবং স্থাপন করেছেন তুলাদণ্ড, যাতে তোমরা সীমালঙ্ঘন না কর ভারসাম্যের ক্ষেত্রে।’ (সুরা : আর-রহমান, আয়াত : ৭–৮)

প্রকৃতির প্রতিটি উপাদানের মধ্যে একটি ভারসাম্য রয়েছে। বন, নদী, পাহাড়, মাটি, পাখি, কীটপতঙ্গ, মাছ ও অন্যান্য প্রাণী—সবই পরিবেশের সামগ্রিক ব্যবস্থার অংশ।

একটি বন ধ্বংস হলে শুধু গাছই হারায় না; সেখানে বসবাসকারী অসংখ্য প্রাণীর আবাসস্থলও নষ্ট হয়। একটি প্রজাতি বিলুপ্ত হলে পরিবেশের খাদ্যশৃঙ্খল ও প্রাকৃতিক ভারসাম্যেও প্রভাব পড়ে। তাই বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ মূলত আল্লাহর সৃষ্টি করা ভারসাম্য রক্ষারই একটি অংশ।

প্রাণীর প্রতি দয়া আল্লাহর রহমত লাভের মাধ্যম 

রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রাণীর প্রতি দয়া করার ব্যাপারে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছেন। এক হাদিসে এসেছে, এক ব্যক্তি তৃষ্ণার্ত কুকুরকে পানি পান করানোর কারণে আল্লাহর ক্ষমা লাভ করেছিলেন। সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, প্রাণীদের ব্যাপারেও কি আমাদের জন্য সওয়াব রয়েছে? রাসুলুল্লাহ (সা.) জানালেন, প্রত্যেক জীবন্ত প্রাণীর সেবায় সওয়াব রয়েছে। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৩৬৩)

এ হাদিসের শিক্ষা অত্যন্ত ব্যাপক। একটি প্রাণীকে পানি দেওয়া, ক্ষুধার্ত প্রাণীকে খাবার দেওয়া কিংবা অসহায় কোনো প্রাণীকে বিপদ থেকে রক্ষা করাও আল্লাহর কাছে মূল্যবান আমল হতে পারে।

প্রাণী শিকারে ইসলামের নীতিমালা

ইসলাম বৈধভাবে প্রাণী শিকারকে সব অবস্থায় নিষিদ্ধ করেনি। মানুষের খাদ্য ও প্রয়োজনের জন্য বৈধ শিকারের অনুমতি রয়েছে। কিন্তু প্রয়োজন ছাড়া প্রাণী হত্যা, নিছক বিনোদনের জন্য শিকার কিংবা প্রাণীকে কষ্ট দিয়ে হত্যা করা ইসলামের দয়ার নীতির পরিপন্থী। একজন মুসলমানের কাছে শিকারও হতে হবে দায়িত্বশীল ও সংযত। কারণ আল্লাহ মানুষকে পৃথিবীতে দায়িত্বশীল হিসেবে পাঠিয়েছেন; ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর অনুমতি দেননি। কেননা মানুষ পৃথিবীর মালিক নয়, দায়িত্বশীল অভিভাবক। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তিনি তোমাদের পৃথিবীতে প্রতিনিধি করেছেন...।’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ১৬৫)

বন্যপ্রাণী দিবস আমাদের শুধু পশুপাখির কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার একটি দিন নয়; এটি নিজেদের দায়িত্বের কথাও মনে করিয়ে দেয়। যে পৃথিবীতে মানুষ বসবাস করে, সেই পৃথিবী অসংখ্য প্রাণীরও আবাসস্থল। তাদের অস্তিত্ব রক্ষা করা মানে আল্লাহর সৃষ্টি করা প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে দয়া করে না, তার প্রতি দয়া করা হয় না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬০১৩)

অতএব, বন্যপ্রাণী রক্ষা করা আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি দায়িত্বশীলতারও প্রকাশ। তাই আসুন, বন-পাহাড়-নদী ও বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাস নিশ্চিত করি। আমাদের হাতে যেন কোনো প্রাণীর ধ্বংস না হয়; বরং আমাদের হাতই হোক আল্লাহর সৃষ্টির নিরাপত্তা ও কল্যাণের মাধ্যম।