বগুড়া থেকে আগাম সবজির চারা যাচ্ছে সারা দেশে
সংগৃহীত ছবি
ভোর হলেই ব্যস্ততা শুরু হয়। কেউ বীজ বুনছেন, কেউ ছোট চারার পরিচর্যা করছেন, আবার কেউ দূর-দূরান্ত থেকে আসা কৃষকদের হাতে তুলে দিচ্ছেন পছন্দের চারা। বগুড়ার শাজাহানপুরের শাহনগর ও বড়পাথারসহ কয়েকটি গ্রামে চলছে এই কর্মযজ্ঞ। এসব নার্সারির চারা যাচ্ছে দেশের ৪৫ থেকে ৫০টি জেলায়।
শীতকালীন আগাম সবজির মৌসুম সামনে রেখে জমজমাট হয়ে উঠেছে দেশের অন্যতম বৃহৎ এই সবজি নার্সারি পল্লী। প্রায় ৩০০টি ছোট-বড় নার্সারিতে ৪০ থেকে ৫০ হেক্টর জমিতে উৎপাদন হচ্ছে মরিচ, ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো, বেগুন, পেঁপেসহ বিভিন্ন জাতের সবজির চারা। কৃষকদের আশা, চলতি রবি মৌসুমে এসব নার্সারি থেকে প্রায় ৬০ কোটি টাকার আগাম জাতের সবজির চারা বিক্রি হবে।
বগুড়া কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮৫ সালের দিকে শাহনগর ও বড়পাথার এলাকায় স্বল্প পরিসরে সবজির চারা উৎপাদন শুরু হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই উদ্যোগ ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের বিভিন্ন গ্রামে। বর্তমানে শাহনগর, বড়পাথার, কামারপাড়া, মোস্তাইল, চুপিনগর, দুরুলিয়াসহ কয়েকটি এলাকায় গড়ে উঠেছে প্রায় ৩০০টিরও বেশি ছোট-বড় নার্সারি।
সরেজমিনে দেখা যায়, নার্সারি পল্লীর বিভিন্ন জমিতে বৃষ্টির পানি থেকে আগাম শীতকালীন সবজির বীজতলা রক্ষায় বাঁশের তৈরি ‘বেতি’ রিংয়ের মতো বসিয়ে তার ওপর সাদা ও কালো পলিথিন দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। জমির মাঝ বরাবর নির্দিষ্ট দূরত্বে ছোট ছোট আইল ও পানি নিষ্কাশনের নালা তৈরি করে বীজ বপন করা হচ্ছে। বীজ বপনের পর ঝুরঝুরে মাটি ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে চারার সুষ্ঠু বৃদ্ধির জন্য।
এসব নার্সারিতে ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো, বেগুন, পেঁপে ও বিভিন্ন জাতের মরিচের চারা উৎপাদন করা হয়। তবে এই নার্সারি পল্লীর সবচেয়ে বেশি চাহিদার চারা হলো মরিচের। হাইব্রিডসহ একাধিক জাতের মরিচের চারা এখান থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়। চারা উৎপাদন ও বিপণনকে কেন্দ্র করে এ অঞ্চলে নারী-পুরুষসহ বিভিন্ন বয়সি মানুষের কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হয়েছে। বীজতলা তৈরি, বীজ বপন, আগাছা পরিষ্কার, সেচ, সার ও কীটনাশক প্রয়োগ, চারা উত্তোলন, বাছাই ও বাজারজাতকরণ প্রতিটি কাজেই যুক্ত রয়েছেন স্থানীয় শ্রমিকেরা।
এখানকার চারা উন্নতমানের হওয়ায় প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন প্রান্তের কৃষকরা আগাম চারা সংগ্রহ করতে শাহনগর ও বড়পাথারে ছুটে আসেন। বিশেষ করে জামালপুর ও ময়মনসিংহের কৃষকদের উপস্থিতি বেশি। এছাড়া গাইবান্ধা, রংপুর, নাটোর, নওগাঁ, পাবনা, টাঙ্গাইল, ঢাকা, সিরাজগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলার কৃষকেরাও এখান থেকে চারা কিনে নিয়ে যান।
নার্সারি মালিকরা জানান, রবি মৌসুমে এই নার্সারি পল্লী থেকে প্রতিদিন প্রায় ৪ থেকে ৫ লাখ চারা বিক্রি হয়। নার্সারির মালিক আমজাদ হোসেন বলেন, প্রায় ৩০ বছর আগে এ এলাকায় অল্প পরিসরে সবজির চারা উৎপাদন শুরু হয়েছিল। ধীরে ধীরে কৃষকদের আগ্রহ বাড়তে থাকে।
তিনি বলেন, এক বিঘা জমিতে চারা উৎপাদনে প্রায় ২ থেকে আড়াই লাখ টাকা খরচ হয়। ভালো ফলন ও অনুকূল আবহাওয়া থাকলে ওই চারা ৪ থেকে সাড়ে ৪ লাখ টাকায় বিক্রি করা সম্ভব। তবে অতিবৃষ্টি, রোগবালাই বা প্রতিকূল আবহাওয়া হলে লোকসানের আশঙ্কাও থাকে। সেজন্য চারার পরিচর্যায় সেচ, সার ও কীটনাশক ব্যবহারে বাড়তি নজর দিতে হয়।
গাইবান্ধা থেকে চারা কিনতে আসা কৃষক মনসুর আলী বলেন, ‘শাহনগরের চারার মান ভালো। এখানকার চারা দিয়ে আবাদ করলে ফলনও ভালো হয়। গত বছর ২৫ শতক জমিতে হাইব্রিড মরিচের আবাদ করেছিলাম। এতে প্রায় ৪৫ হাজার টাকা খরচ করে ৩ লাখ টাকার মরিচ বিক্রি করেছি। ভালো ফলন পাওয়ায় এবারও কিনতে এসেছি।’
স্থানীয় কৃষকদের মতে, মানসম্মত চারা উৎপাদনের কারণেই দিন দিন এই নার্সারি পল্লীর পরিচিতি বাড়ছে। আগে যেখানে আশপাশের কয়েকটি উপজেলার কৃষকই এখান থেকে চারা নিতেন, এখন দেশের বিভিন্ন জেলার কৃষকরা সরাসরি নার্সারিতে এসে চারা সংগ্রহ করছেন। এতে একদিকে নার্সারি মালিকদের আয় বাড়ছে, অন্যদিকে চারা উৎপাদন ও বিপণনকে ঘিরে তৈরি হচ্ছে নতুন কর্মসংস্থান।
বগুড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা ফরিদুর রহমান ফরিদ বলেন, শাহনগরের সবজির চারার সুনাম দেশের বিভিন্ন এলাকায় রয়েছে। কৃষকেরা চারা উৎপাদনের মাধ্যমে বগুড়াকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে নার্সারি মালিকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।