টাকা দিয়ে কি সদকাতুল ফিতর আদায় করা যাবে?

টাকা দিয়ে কি সদকাতুল ফিতর আদায় করা যাবে?

টাকা দিয়ে কি সদকাতুল ফিতর আদায় করা যাবে?

ঈদুল ফিতরের অন্যতম আমল হলো- সদকাতুল ফিতর। নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস বাদ দিয়ে ঈদের দিন যারাই নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হবে, তাদের ওপর সদকাতুল ফিতর ওয়াজিব হয়ে যাবে।

সদকাতুল ফিতর সংক্রান্ত হাদিস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, পাঁচ ধরনের খাদ্যদ্রব্য দিয়ে সদকাতুল ফিতর আদায় করা হতো। সেগুলো হলো- খেজুর, কিসমিস, পনির, জব ও গম।

খেজুর, পনির, জব ও কিসমিস দিয়ে প্রদান করলে এক ‘সা’ তথা তিন কেজি ৩০০ গ্রাম প্রদান করতে হবে। আর গম দিয়ে প্রদান করলে আধা ‘সা’ তথা দেড় কেজি দেড় শ’ গ্রাম প্রদান করতে হবে।

আবু সাঈদ খুদরী রা: বলেন, আমরা সদকাতুল ফিতর আদায় করতাম এক ‘সা’ খাদ্য দ্বারা অথবা এক ‘সা’ যব অথবা এক ‘সা’ খেজুর, কিংবা এক ‘সা’ পনির বা এক ‘সা’ কিসমিস দ্বারা। আর এক ‘সা’র ওজন ছিল নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ‘সা’ অনুযায়ী। (মুয়াত্তা মালেক, পৃষ্ঠা: ১২৪, আল ইসতিযকার, হাদিস : ৫৮৯, ৯/৩৪৮)

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবায়ে কেরামের যুগে কোন বস্তু দ্বারা প্রদান করা হতো, সেটার একটা তালিকা আমরা এ হাদিস থেকে জানতে পারলাম।

এখন প্রশ্ন হলো- যদি আমরা খাদ্য না দিয়ে মূল্য প্রদান করি, তাহলে সদকাতুল ফিতর আদায় হবে কিনা? অবশ্যই হবে। কারণ, সাহাবায়ে কেরাম যেমন খাদ্যদ্রব্য দিয়ে সদকাতুল ফিতর আদায় করেছেন, তেমনভাবে মূল্য দিয়েও আদায় করেছেন।

ইমাম বুখারি রহ: হজরত মুয়ায রা:-এর বক্তব্য উল্লেখ করেছেন বুখারি শরিফে। তিনি ইয়ামেনবাসীকে বলেন, তোমরা তোমাদের সদকার মধ্যে কাপড় নিয়ে এসো খাদ্য দ্রব্যাদির স্থলে। সেটা তোমাদের জন্য অধিকতর সহজ এবং মদিনার সাহাবিদের জন্য অধিক উপযোগী। (বুখারী, হাদীস : ১১৪৭; শায়খ যুহাইর বিন নাসের তাকিককৃত)

এ হাদিস একটু ভালভাবে খেয়াল করুন। সদকার ক্ষেত্রে ইয়ামানবাসীকে খাদ্যদ্রব্যের জায়গায় কাপড় আনার নির্দেশ দিয়েছেন মুয়াজ বিন জাবাল রা:। কারণ, তখন সাহাবায়ে কেরামের খাদ্যের চেয়ে কাপড়ের প্রয়োজন ছিল বেশি। ইমাম আবু হানিফা রহ: এটাই বলেছেন। ইয়ামেনবাসীর জন্য কাপড় ছিলো অধিকতর সহজ এবং উপযোগী, এজন্য তিনি সেটার নির্দেশ দিয়েছেন। আর বর্তমান যুগে টাকা অধিকতর সহজ এবং উপযোগী, এজন্য ফিকহে হানাফি অনুসারে টাকা দ্বারা সদকায়ে ফিতর প্রদান করা উত্তম।

আতা রহ: হজরত ওমর রা: থেকে বর্ণনা করেন, ওমর রা: সদকার ক্ষেত্রে টাকা ইত্যাদি গ্রহণ করতেন। (মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, হাদিস : ১০৫৩৯; শায়খ মুহাম্মাদ আওয়ামা দা: বা: তাহকিককৃত)

যুহাইর বলেন, আমি আবু ইসহাককে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, আমি সাহাবায়ে কেরামকে পেয়েছি, তারা রমজানের সদকাতে খাদ্যের মূল্য পরিমাণ দিরহাম আদায় করেছেন। (মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, হাদিস : ১০৪৭২; শায়খ মুহাম্মাদ আওয়ামা দা.বা. তাকিককৃত)

উক্ত হাদিসের বর্ণনাকারী আবু ইসহাক সাবিয়ি রা: হলেন প্রসিদ্ধ তাবেয়ী। তিনি স্পষ্ট বর্ণনা করছেন যে, সাহাবায়ে কেরাম টাকা দ্বারা সদকাতুল ফিতর আদায় করেছেন।

প্রসিদ্ধ তাবেয়ি হাসান বসরি রহ:-এর ফতোয়া দেখুন, তিনি বলেন, সদকায়ে ফিতর দিরহাম দ্বারা প্রদান করতে কোনো সমস্যা নেই। (মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, ১০৪৭১)

কুররা রহ: বলেন, আমাদের কাছে ওমর বিন আব্দুল আজীজ রহ:-এর চিঠি এসেছে যে, সদকাতুল ফিতরের ক্ষেত্রে প্রত্যেক মানুষ থেকে নিসফে ‘সা’ খাবার অথবা অর্ধেক দিরহামের মূল্য গ্রহণ করা হবে। (মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, ১০৪৭০)

ইমাম বুখারি রাহ:-এর অন্যতম শিক্ষক হলেন- ইমাম আবু বকর ইবনে আবি শায়বা। তিনি তার জগদ্বিখ্যাত হাদিসের বই ‘মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বাহ’র জাকাত অধ্যায়ে সদকাতুল ফিতর টাকা দ্বারা আদায় করা সংক্রান্ত একটি পরিচ্ছেদ প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং পাঁচটি হাদিস এনে প্রমাণ করেছেন যে, সাহাবায়ে কেরাম টাকা দ্বারা সদকাতুল ফিতর আদায় করেছেন।

বর্তমান যুগে মানুষের সবচেয়ে বেশি চাহিদা হলো টাকা। এজন্য টাকা দিয়ে সদকাতুল ফিতর আদায় করলে মানুষ তার যে কোন প্রয়োজন পূর্ণ করতে পারবে। আসুন, টাকা দ্বারা সদকাতুল ফিতর আদায় করি।

লেখক : প্রধান মুফতি-জামেয়া মাহমুদিয়া, যাত্রাবাড়ি ঢাকা